সেই দিনটির পুলক-স্বাদ নিয়ে খানিকটা লিখে ফেলে।
আর একবার মামীশাশুড়ীর বাড়ি যাবার সংকল্প স্থির করেছিলো সুবৰ্ণ, তবু হচ্ছেও না যেন। কারুরই কিছু মনে করবার কথা নয়, মা একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে বাড়ির ঝিয়ের সঙ্গে কথাও যাচ্ছে, এতে আর এখন অবাক হয় না। সুবৰ্ণর ছেলেমেয়েরা। মুক্তকেশীর মৃত্যু ও শ্রাদ্ধকার্যের ব্যাপারে ওটা হঠাৎ কেমন চালু হয়ে গেছে। কিন্তু সুবৰ্ণলতার কেন মনে হচ্ছে ওরা সপ্রশ্ন দৃষ্টি মেলে ভাববে, হঠাৎ মামীশাশুড়ীর ওপর এত ভক্তির হেতু? এই তো সেদিন গেলেন!
যাই যাই করেও তাই দিন গড়ায়।
২.১৯ সুবৰ্ণলতার স্মৃতির পৃষ্ঠায়
কিন্তু সুবৰ্ণলতার স্মৃতির পৃষ্ঠায় কবিতা লেখার দিনের স্মৃতি আর কই? তার পাতায় পাতায় খাঁচার পাখীর ডানা ঝটপটানির শব্দটাই তো প্রখর।
তবে তাকে তার সেই স্মৃতির জানলা থেকে-কবিতা পড়তে দেখতে পাওয়া যায়। কে জানে কোথা থেকে সংগ্রহ করে, আর কেমন করেই বা পায় ছাড়পত্র, তবু দেখা যায়, যে বাড়িতে ছেলেদের পাঠ্যপুস্তক আর নতুন পঞ্জিকা ছাড়া আর কোনো বই আসত না, সে বাড়িতে কোণের দিকের একটা ঘরে খাটের তলায়, দেয়াল-আলমারিতে, জানলা-দরজার মাথার তাকে তাকে থাকে-থাকে জমে ওঠে বই, কাগজ, পত্রপত্রিকা।
হয়তো ঘরের প্রকৃত মালিক শাসন করে করে এলে গিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে। নইলে কিশোরী সুবৰ্ণলতার স্মৃতির ইতিহাসে তার বই কেড়ে নিয়ে ফেলে দেওয়া, ছিঁড়ে ফেলা, পুড়িয়ে দেওয়া, সব কিছুর নজিরই তো আছে। শাসনকর্তা শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়েছে। অথবা হয়তো দেখেছে, এতেই পাখীটা ঝটপটায় কম।
আরও পাখী তো আছ। এ-বাড়ির খাঁচায়, কই তারা তো এমন করে না! বরং তারা আড়ালে বলাবলি করে, ধন্যি বেহায়া মেয়েমানুষ বাবা, এত অপমানের পরও আবার সেই কাজ। আমার হলে বোধ হয়। আর এ বস্তু আঙুলের আগা দিয়েও ছুতাম না। আর মেজবাবুরও হচ্ছে মুখেই মর্দানি! বজ্রআঁটনি ফস্কা গেরো!
সুবৰ্ণলতা তার আড়ালের কথা টের পায় না। সুবৰ্ণলতা তার আপনি আবেগ আর অনুভূতির পরমণ্ডলে বিরাজ করে। তাকে বেহায়া বল বেহায়া, অবোধ বল অবোধ।
তা হয়তো এক হিসেবে অবোধই।
নইলে উমাশশীদের কাছেও এক এক সময় ছুটে যায় সে এক-একটা নতুন অনুভূতির আবেগ নিয়ে। হয়তো শীতের দুপুরে উমাশশী রোদে বসে বড়ি দিচ্ছে, গিরিবালা পশমের রং মিলিয়ে খুঞ্চোপোষ বুনছে আর বিন্দু রোদেই একটু গড়িয়ে নেবে বলে মাদুর বিছোচ্ছে, সুবর্ণ সেখানে যেন আছড়ে এসে পড়ে। উত্তেজিত আরক্ত মুখ আরো লালচে করে বলে, দিদি, জীবনভোর শুধু বড়িই দিলে, জানলে না। এ জগতের কোথায় কি আছে! শোনো, শোনো একবার, পুরুষ কবি কেমন করে ফুটিয়ে তুলেছেন মেয়েমনের কষ্ট-দুঃখ! বলে, কিন্তু চেয়ে দেখে না, ওরা। জগতের কোথায় কি আছে জািনবার জন্যে উদ্গ্ৰীব হয়ে তাকাচ্ছে, না পরস্পর কৌতুকদৃষ্টির বিনিময় করছে। কৌতুক তো করেই তারা সুবৰ্ণকে নিয়ে। ওটি যে একদিকে যেমন তেজী অহঙ্কারী আসপদ্দাবাজ, আর একদিকে তেমনি বদ্ধ পাগল। হাসবে না। ওকে নিয়ে?
ওরা সুবর্ণর ওই ছেলেদের পড়া মুখস্থর মতন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পদ্য পড়া দেখলে হাসে। বদ্ধ পাগলটা অবশ্য ততক্ষণে শুরু করে দিয়েছে
বেলা যে পড়ে এল জলকে চল।
পুরনো সেই সুরে কে যেন ডাকে দূরে—
আবেগে থরথর করে গলা, চোখ দিয়ে অসতর্কে কখন জল গড়িয়ে পড়ে। আর ভাবে, পদ্য না বুকুক প্ৰাণ-নিংড়ানো ওই মর্মকথাটুকু তো ওদের মর্মে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে।… বেচারীরা চোখ বুঝে দিন কাটাচ্ছে, হঠাৎ হয়তো এতেই চোখ ফুটে যাবে। বুঝতে পারবে এই প্ৰাণপাত করে সংসার করা, ওই ভয়ে সশঙ্কিত হয়ে থাকার সব বৃথা, এখানে আমাদের কেউ আপন ভাবে না। এখানে সবাই আমরা—
ফুলের মালাগাছি বিকোতে আসিয়াছি
পরখ করে সবে করে না স্নেহ।
আর এও বুঝুক, জগতে এমন হৃদয়বান মহৎ পুরুষও আছেন, যিনি নিরুপায় মেয়েমানুষের এই যন্ত্রণা অনুভব করেন, তাকে ব্যক্ত করবার ভাষা যোগান। আশ্চর্য, আশ্চর্য! কি করে জানলেন রবি ঠাকুর–
এখানে মিছে কাঁদা
দেওয়ালে পেয়ে বাধা,
কান্দন ফিরে আসে আপনি কাছে।
কি করে টের পেলেন—
সবার মাঝে আমি
ফিরি একেলা,
কেমন করে কাটে
সারাটি বেলা,
ইঁটের পরে ইঁট,
মাঝে মানুষ-কীট্,
নাহিক ভালবাসা
নাহিক খেলা।
এমন স্পষ্ট করে বলাও বুঝতে পারবে না চিরবন্দিনী উমাশশী? বুঝতে পেরে ভাববে নাআমাদের এই যে অবস্থা, তা তো কই আগে জানতাম না! কি অন্ধই ছিলাম!
ওদের চোখ খুলতে বসে সুবর্ণ, আর হঠাৎ একসময় নিজেরই চোখ খুলে যায় ওর! গিরিবালা সহসা শশব্যাস্তে বলে ওঠে, গলাটাকে একটু খাটো করো মেজদি, নিচে যেন কার চটির শব্দ পেলাম, ছোটুঠাকুরপো এলেন বোধ হয়।
আর সেই বলে ওঠার ঢ়িল খেয়ে চমকে তাকিয়ে উঠে দেখে সুবর্ণ, উমাশশীর ইত্যবসরে দুকুলো বড়ি দেওয়া হয়ে গেছে, আর বিন্দু ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছে।
মর, চাটির শব্দে কান খাঁড়া করেই মর তোমরা। জেলখানাই সুখের সাগর তোমাদের–বলে রাগ করে উঠে যায় সুবর্ণ, আর নিজের ঘরে বসে বইটা মুড়ে রেখে মৃদু আবেগে বলে, কোথায় আছিস তুই কোথায় মাগো, কেমনে ভুলিয়া আছিস হাঁ গো—
ফোঁটা ফোঁটা করে জল গড়িয়ে পড়ে বড় বড় চোখ দুটো দিয়ে।
এমন ঘটনা কতদিনই ঘটে।
প্ৰবোধ প্ৰায়ই ভারী। থমথমে অন্য জগতে হারিয়ে-যাওয়া-মন স্ত্রীকে কাছে পায়।
কাজেই দোষ দেওয়া যায় না। তাকে যদি সে বলে, এই এক রবি ঠাকুর হয়েছেন দেশের মাথাটা খাবার জন্যে! মেয়েমানুষগুলো যাবে এবার উচ্ছনে। সেই যে বলে না–
