তবে দাও তোমাদের নবাবী পান একটা, দেখি খেয়ে বেগম বনে যাই কি না—, বলে হেসে একটা পান নিয়েছিল সুবর্ণ। তার পরই কেমন ভাল লেগে গেল, পর পর খেয়ে নিল অনেকগুলো। তারপর ঝাঁক ঝাঁক লেমনেড। তার স্বাদটা কি লেগে আছে গলায়?
থিয়েটারের সেই ঝিটার ভাঙা কাঁসরের মত গলার স্বরটা যেন হঠাৎ সেই দূর অতীত থেকে বডি আছড়ে পড়ল—দর্জিপাড়ার সুবোধবাবুর বাড়ি গো –দর্জিপাজার সুবোধবাবুর পেবোবাবুর বাড়ি গো!
অভ্যাসবশত প্ৰথমে দাদার নামটা বলে ফেলে শেষে আবার নিজের নামটাও গুঁজে দিতে সাধ হয়েছিল প্ৰবোধের।
… … …
থিয়েটার দেখা হলো, খাওয়া-দাওয়া হলো, শেষ অবধি আবার ঘোড়ার গাড়িতে উঠে ও হাতে হাতে একটা অবাক জলপানের খিলি গুঁজে দিয়ে গাড়ির মাথায় উঠে গাড়োয়ানের পাশে গিয়ে বসলা প্ৰবোধ, নেহাৎই উমাশশী গাড়িতে আসীন বলে। তবু রিরাজ যখন বলে উঠলো, যাই বল বা, মেজদার সঙ্গে বেরিয়ে সুখ আছে, তখন বড়ভাজের উপস্থিতি ভুলে বলেই ফেলল প্ৰবোধ, সুখ না দিয়ে রক্ষে আছে? মহারাণীর মেজাজ তা হলে সপ্তমে উঠবে না?
থিয়েটার কি আর কখনো দেখে নি তারপর সুবৰ্ণ?
দেখেছে বৈকি। দেখে নি বললে পাতক। কিন্তু সে আস্বাদ আর আসে নি, দেখেছে মানে দেখিয়েছে। যখন ননদরা এসেছে, গেছে, অথবা কাউকে আদর জানানোর প্রয়োজন পড়েছে, থিয়েটার দেখানো হয়েছে। আর কে সেই দায় নেবে সুবর্ণ ছাড়া?
অতএব মাঝে মাঝে নিজেকেও যেতে হয়েছে তাদের সঙ্গে।
একবার তো প্রহ্লাদ চরিত দেখাতে মুক্তকেশী এবং তস্য সখী হেমাঙ্গিনীকে নিয়েও যেতে হয়েছিল। আর সঙ্গে ছিল সুশীলা। এবং প্ৰবোধ।
মা, মাসী, দিদির সঙ্গে বৌকে নিয়েছিল প্ৰবোধ। এ বেহায়াপনাটুকু করেছিল সে। সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে অতিক্ষণের জন্যে রেখে যেতে যেন মন সায় দেয় না। তাস খেলতে খেলতে তবু একআধবার ছুতো করে উঠে এসে দেখে যাওয়া যায়, এতে তো সে উপায়ও নেই। অতএব চক্ষুলজ্জার দায়মুক্ত হওয়াই শ্রেয়।
পাঁচজনকে অবশ্য শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে হয়েছে, মা তো জানেই না কোথায় বসতে হয়, কখন উঠে আসতে হয়। মেজবৌ তবুওতে পোক্ত।
সুবৰ্ণ অবশ্য এই একা সুযোগ নেওয়ার পক্ষপাতী নয়, কিন্তু ইদানীং সেজবাবু ছোটবাবু তাদের বৌদের হ্যাংলার মত অপরের পয়সায় থিয়েটার দেখতে যাওয়ায় মানের হানি বোধ করছিলেন, তাই নানা অজুহাত দেখিয়েছেন তারা। আর উমাশশীর তো সংসারের অসুবিধে ভাবলেই মাথায় আকাশ ভাঙে।
তাই ইদানীং যা যাওয়া হয়েছে, যেন কর্তব্য করতে। সেই প্রথম দিনের উচ্ছল। আনন্দ অনুপস্থিত থেকেছে। সেদিনটি আছে সোনার অক্ষরে লেখা।.
কারণ-কারণ সে সন্ধ্যার রাত্রিটাও হয়েছিল বড় সুন্দর। সুরাজ বলেছিল, আজ রাতটা আমরা ননন্দ-ভাজে গল্প করে কাটাবো ঠিক করেছি। মেজদা, তোমার ঘরেই আমাদের স্থিতি। তুমি বাপু কেটে পড়। শুয়ে পড়গে ও-ঘরে।
আর আশ্চর্যের ব্যাপার, প্ৰবোধ জ্বলে ওঠে নি, কটু কিছু বলে ওঠে নি এবং কলে-কৌশলে শেষ অবশি সুবৰ্ণকে কবলিত করবার চেষ্টা করে নি। এবং একটা হাই তুলে বলেছিল, গল্প করে রাত জাগবি কি বল? এতক্ষণ থিয়েটার দেখে এসে? আমার তো ঘুমে শরীর ভেঙে আসছে!
আর তারপর হঠাৎ একটু হেসে উঠে বলেছিল, আর যা নাটক দেখে এলাম। বাবা, মনে হচ্ছে স্ত্রী-পুত্রের ওপর এতটা আসক্তি না রেখে ভগবান-টগবানের কথাই ভাবা উচিত।
ওরে বাস, একেপারে কা। তব কান্তা কস্তে পুত্র! অনুচ্চ হাসি হেসে বলে উঠেছিল সুবর্ণ, আর প্ৰবোধ অলক্ষ্যে তার পাঠে একটা চিমটি কেটে সত্যই চলে গিয়েছিল শয়নকক্ষের দুরন্ত আকর্ষণ ত্যাগ করে। …
কী মুক্তি!
কী মুক্তির আস্বাদ!
সুবৰ্ণর বিবাহিত জীবনের মধ্যে সে মুক্তির স্বাদ আর কবে এসেছে তার আগে অথবা পরে?
কবে এমন স্বেচ্ছায় দাবি ত্যাগ করে ঘুমোতে চলে গেছে প্ৰবোধ? কাজের বাড়িটাড়িতে অসুবিধের পড়ে ঘরের অকুলান হলে গজরেছে, ছুতো করে এসে আগে-ভাগে শুয়ে থেকেছে।
যারা গল্প করে রাত কাটাবে বলে আহ্লাদ জানিয়েছিল, তারা তো তখুনি গড়াগড়ি। সুবৰ্ণ ঘুমোয় নি। সে রাতে। এই মধুর অবকাশটুকু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছিল। আর অদ্ভুত একটা কাজ করে বসেছিল। সে সেই রাতে।
সেই প্ৰথম।
হ্যাঁ, সেই প্রথম একটা পদ্য লিখে ফেলেছিল সুবর্ণ।
এখন অবশ্য সে পদ্য ভাবলে হাসি পায়, তবু সেই তো প্ৰথম। পুরনো পচা একখানা খাতার হলদে হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠায় আজও আছে সেটা। ছিঁড়ে ফেলে দিতে মায়া হয়েছে…
এবং আশ্চৰ্য, আজও মুখস্থ আছে সেটা!
কালটা তো আগের, ভাষাও অতএব তদ্রপ। কিন্তু সেদিন সেই কবিতা লিখে ফেলে কী অপূর্ব পুলক স্বাদে ভরে গিয়েছিল মন! মনে হয়েছিল কবিদের মতই তো হয়েছে ঠিক! ওঁরাও কি এই রকমেই লেখেন না!
অনন্ত নক্ষত্রপুঞ্জ আকাশেতে থাকি,
পৃথিবীর পানে কি গো মেলে থাকে আঁখি?
দেখিলে দেখিতে পাবে তারই দিকে চেয়ে
জাগিয়া কাটায় এক পৃথিবীর মেয়ে।
পিঞ্জরের পাখীসম বন্দী তার প্রাণ,
ঊর্ধ্ব আকাশেতে যেন কি করে সন্ধান!
কিন্তু হায় কাটে সুর, ভেঙে যায় মন,
রুদ্ধ করি দিতে হয় মুক্ত বাতায়ন।
থর সব স্বপ্ন করে দেয় চুর।
জেগে ওঠে শত চক্ষু, আসে দুঃখ গ্লানি,
নীরবে ঘোরাতে হয়। নিত্যকার ঘানি।
তা এই সেকেলে ভাষার পদ্যকে আর একালের খাতায় স্থান দেবার বাসনা নেই, কিন্তু সেই দিনটাকে ঠাঁই দিতে ইচ্ছে করে।
জীবনের প্রথম পদ্য লেখার দিন।
