গোড়ার দিকের পাতাগুলো তবু ভরাট ভরাট, তারপর সবই যেন খাপছাড়া ভাঙাচোরা।
হঠাৎ লিখে রেখেছে, মানুষের ওপর শ্রদ্ধা হারাবো কেন? জগু বট্ঠাকুরকে তো দেখেছি, দেখেছি বড় ননদাইকে, দেখলাম অম্বিকা ঠাকুরপোকে। আবার তার পরের পাতায় এ কোন জনের কথা?
বাবাকে… অপমান করে চলে এলাম।… বাবার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। কিন্তু কি করবো? এ ছাড়া আর কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। আমার।…
নিকটজনদের দুঃখের কারণ হবো, —এই হয়তো আমার বিধিলিপি।
আমার নিষ্ঠুরতাই দেখতে পাবে সবাই, আমার ফেটে যাওয়া বুকটা কেউ দেখবে না! শুধু জানবে সুবর্ণ কঠোর, সুবৰ্ণ কঠিন।
জানুক। তাই জানুক।…
ভেবেছিলাম। এই অপমানিত জীবনটার শেষ করে দিয়ে এ জন্মের দেনা শোধ করে চলে যাব।
হল না।
ভগবানও আমাকে অপমান করে মজা দেখলেন, যমও আমাকে ঠাট্টা করে গেল। দেখি তবে এর শেষ কোথায়? নিজের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে তাকিয়ে দেখছি চারদিকে, দেখতে পাচ্ছি। শুধু আমি একা নয়, সমস্ত মেয়েমানুষ জাতটাই একটা অপমানের পঙ্ককুণ্ডে পড়ে ছটফটাচ্ছে। কেউ টের পাচ্ছে, কেউ টের পাচ্ছে না।
কারণ?
কারণ তারা রোজগার করে না, অপরের ভাত খায়। হ্যাঁ, এই একমাত্র কারণ।
আর স্বার্থপর পুরুষজাত সেই অবস্থাকেই কায়েমী রাখতে মেয়েমানুষকে র সুযোগ দেয়। না, চোখ-কান ফুটতে দেয় না। দেবে কেন? বিনিমাইনের এমন একটা দিনরাতের চাকরানী পাওয়া যাচ্ছে এমন সুযোগ ছাড়ে কখনো?
পা বেঁধে রেখে বলবো, ছি ছি, হাঁটতে পারে না! চোখ বেঁধে রেখে বলবো, রাম রাম, দেখতে পায় না! আর সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে বলবো, ঠুঁটো ঠুঁটো! এ কী কম মজা?
চিরদিন এইরকমই তো করে আসছে। পুরুষসমাজ আর সমাজপতিরা।
মেয়েমানুষ পরচর্চা করে, মেয়েমানুষ কোঁদক করে, আর মেয়েমানুষ ভাত সেদ্ধ করে এই হল তোমাদের ভাষায় মেয়েমানুষের বিবরণ। ভেবে দেখ না, আর কোন মহৎ কাজ করতে দিয়েছ তোমরা মেয়েমানুষকে?
দেবে না, দিতে পারবে না।
দুবেলা দুমুঠো ভাতের বদলে আস্ত একটা মানুষকে নিয়ে যা খুশি করতে পারার অধিকার, এ কি সোজা সুখ? ওই দুমুঠোর বিনিময়ে সেই মানুষটার দেহ থেকে, মন থেকে, আত্মা থেকে, সব কিছু থেকে খাজনা আদায় করা যাচ্ছে—তার ওপর উপরি পাওনা নিজের নীচতা আর ক্ষুদ্রতা বিস্তার করবার একটা অবারিত ক্ষেত্ৰ।
মেয়েমানুষ যে পুরুষের পায়ের বেড়ি গলগ্রহ পিঠের বোঝা, উঠতে বসতে এসব কথা শোনাবার সুখ কোথায় পাবে পুরুষ, মেয়েমানুষ যদি লেখাপড়া শিখে ফেলে নিজের অন্নসংস্থান করতে সক্ষম হয়?
তাই পাঁকের ভরা পূর্ণ আছে।
মুখ্যু মুখ্যু, বুঝবে না। ওই পাকে নিজেরাও ড়ুবছে।
তবু–
বুঝতে একদিন হবেই।
তীব্ৰদূষ্টি তীক্ষ্ণকণ্ঠ এক জ্বলন্তদৃষ্টি মেয়ে যেন আঙুল তুলে বলছে, এই মেয়েমানুষদের অভিসম্পাত একদিন লাগবে তোমাদের। সেদিন বুঝতে পারবে চিরদিন কারুর চোখ বেঁধে রাখা যায় না। পতি পরম গুরুর মন্তর চিরদিন আর চলবে না।
আরো কত কি যেন বলছে সেই মেয়ে, আগুনঝরা চোখে, রূঢ়কঠিন গলায়, প্রায়শ্চিত করতে হবে, এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। অত্যাচার অবিচার এর মাপ হয় না।
কিন্তু দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর হচ্ছে। সে অগ্নিমূর্তি মেয়ের এ আবার কোন রূপ!
উদাস বিহ্বল স্বপ্নাচ্ছন্ন!
কী বলছে ও?
অদ্ভুত অসম্ভব।
ও না তিন-তিনটে ছেলেমেয়ের মা?
ও কি ভুলে গেছে তাদের কথা? তাই ওর মেঘলা দুপুরে হাতের বইখানা মুড়ে রেখে স্বপ্নাচ্ছন্ন চোখে ভাবছে, প্ৰেম, প্ৰেম! কি জানি কেমন সেই জিনিস, কেমন স্বাদ? সে কি শুধুই নাটক-নভেলের জিনিস? মানুষের জীবনে তার ঠাঁই নেই? প্ৰেম-ভালবাসা সবই মিথ্যে, অসোর?
আমার ইচ্ছে হয় কেউ আমায় ভালবাসুক, আমি কাউকে ভালবাসি।
জানি এসব কথা খুব নিন্দের কথা, তবু চুপি চুপি না বলে পারছি না।–প্রেমে পড়তে ইচ্ছে হয় আমার।
যে প্রেমের মধ্যে কবিতা জগতের সমস্ত সৌন্দর্য দেখতে পান, যে প্রেমকে নিয়ে জগতের এত কাব্য গান নাটক…
একটা শিশুকে ধরে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলে, আর একটা বালিকাকে ধরে জোর করে মা করে দিলেই তার মনের সব দরজা বন্ধ হয়ে যাবে? যেতে বাধ্য?
২.১৮ বড় ইচ্ছে হচ্ছিল সুবর্ণর
বড় ইচ্ছে হচ্ছিল সুবর্ণর আর একবার জগু-বটুঠাকুরের বাড়িতে বেড়াতে যায়। নিজের চোখে একবার দেখে কেমন করে ছাপা হয়। কেমন করেই বা সেই ছাপা কাগজগুলো। মলাট বাধাই হয়ে বই আকারে বেরিয়ে আসে আঁট-সাঁট হয়ে।
বই বাঁধাইয়ের কাজও নাকি বাড়িতেই হয় ওঁর, বাড়িতে দপ্তরী বসিয়ে। ঘুটে-কয়লা রেখে নিচের তলায় যে ঘরখানাকে বাতিলের দরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, সেটাই জগুর দপ্তরীখানা।
সবই সেদিন মামীশাশুড়ীর কাছে শুনে এসেছে সুবৰ্ণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে। কোন কিছু খুঁটিয়ে তো দূরস্থান, জিজ্ঞেস করাই স্বভাব নয় সুবৰ্ণর, তাই আশ্চৰ্যই হয়েছিলেন বোধ হয় শ্যামাসুন্দরী, তবু বলেও ছিলেন। গুছিয়ে গুছিয়ে কোনখানে কী হয়!
সুবৰ্ণর প্রাণটা যেন সর্বদাই শতবাহু বাড়িয়ে ছুটে যেতে চায় সেই জায়গাগুলোয়। কি পরম বিস্ময়কর ঘটনাই ঘটছে এখন সেই চিরকালের পরিচিত জীর্ণ বাড়িখানার ভাঙা নোনাধরা বালিখসা দেওয়ালের অন্তরালে। টানবেই তো সেই অলৌকিক স্বৰ্গলোক সুবৰ্ণকে তার সহস্র আকর্ষণ দিয়ে।
তাছাড়া শুধুই যে কেবলমাত্র একবার দেখবার বাসনাতেই তাও ঠিক নয়, কেবলই ইচ্ছে হচ্ছে ওই স্মৃতিকথার খাঁজে খাজে আরও দু-চার পাতা কথা গুঁজে দিয়ে আসে।
