কিন্তু সুবল কি এই পৃথিবীর ঝড়-ঝাপটা সয়ে বেশিদিন টিকবে? দুর্বল স্বাস্থ্য ক্ষীণজীবী এই ছেলেটার দিকে তাকাই আর ভয়ে বুক কাপে আমার। কিন্তু প্ৰতিকারের চেষ্টা করবো সে উপায় আমার হাতে নেই।
যদি বলি, সুবল, তোর মুখটা লাল-লাল দেখাচ্ছে কেন, জ্বর হয় নি তো? দেখি—
সুবল মুখটা আরো লাল করে বলবে, আঃ, দেখবার কি আছে? শুধু শুধু জ্বর হতে যাবে কেন?
যদি বলি, বড্ড কাশছিস সুবল, গায়ে একটা মোটা জামা দে!
সুবল গায়ে পরা পাতলা কামিজটাও খুলে ফেলে শুধু গেঞ্জি পরে বসে থাকবে।
রোগা বলে সুবলের জন্যে একটু বেশি দুধের বরাদ্দ করেছিলাম, তদবধি দুধ একেবারে ত্যাগ করেছে সে। সেবার ভানুকে দিয়ে একবোতল টানিক আনিয়েছিলাম, বোতলটার মুখ পর্যন্ত না খুলে যেমনকে তেমন লেপের চালিতে তুলে রেখে দিল সুবল, বললো, থাক, দামী জিনিস উঁচু জায়গায় তোলা থাকা।
অদ্ভুত এই অকারণ অভিমানের সঙ্গে লড়াই করতে পারি, এমন অস্ত্র আমার হাতে নেই।
আমার বড়জা হলে পারতো হয়তো।
হাউ হাউ করে কাঁদতো, মাথার দিব্যি দিতো, নিজে না খেয়ে মরবো–বলে ভয় দেখাতো। সেই সহজ কৌশলের কাছে প্ৰতিপক্ষ হার মানতো।
কিন্তু আমি তো আমার বড় জায়ের মত হতে পারলাম না কোনদিন।
সহজ আর সস্তা।
তা যদি পারতাম, তাহলে জয়াদির ভালবাসার উপহার সেই বইটাকে চিরকালের জন্যে হারাতাম না। চেয়ে-চিন্তে, কেঁদে-কোট, যেভাবেই হোক আদায় করে নিতাম। কিন্তু আমি তা পারি নি। সেই যে ও কেড়ে নিল, কোথায় লুকিয়ে রাখলো, আমি আর তার কথা উচ্চারণও করলাম না। বুক ফেটে যেতে লাগলো, তবু শক্ত হয়ে থাকলাম। পাছে ও বুঝতে পারে ভয়ানক কষ্ট হচ্ছে আমার বইটার জন্যে, তাই সহজভাবে কথা কইতে লাগলাম। কাজেই ও বাঁচলো।
বইটাই চিরতরে গেল!
চিরটাদিন এই জেদেই অনেক কিছু হারিয়েছি। আমি। অনেক অসহ্য কষ্ট সহ্য করেছি। ও আমাকে কষ্ট দিয়েছে, আমি অগ্রাহ্য করেছি। অন্তত অগ্রাহ্যর ভাব দেখিয়েছি।
ভেবেছি গ্রাহ্য করলেই তো ওর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলো! আমাকে যন্ত্রণা দেওয়ার উদেশ্য। ও কি আমার মনোভাব বুঝতে পারে নি?
ভেবেছে, তাই আরো হিংস্র হয়েছে।
আশ্চর্য, আশ্চর্য!
দুই পরম শত্রু বছরের পুরু বছর একই ঘরে কাটিয়েছি, এক শয্যায় শুয়েছি, এক ডিবেয় পান খেয়েছি, কথা কয়েছি, গল্প করেছি, হেসেওছি।
ওর বেশি অসুখ করলে আমি না খেয়ে না ঘুমিয়ে সেবা করেছি, আমার কোনো অসুখ করলে ও ছটফটিয়ে বেড়িয়েছে, আর তারই ফাঁকে ফাঁকে ও আমাকে, আর আমি ওকে ছোবল দেবার চেষ্টা করে ফিরেছি।
অদ্ভুত এই সম্পর্ক, অদ্ভুত এই জীবন!
দর্জিপাড়ার সেই বাড়িতে আর তিন-তিন জোড়া স্বামী-স্ত্রী ছিল, জানি না। তাদের ভিতরের রহস্য কি?
বাইরের থেকে দেখে তো মনে হতো, ওদের স্ত্রীরা স্বামীদের একান্ত বশীভূত ক্রীতদাসের মত। স্বামীদের ভয়ে তটস্থ, তাদের কথার প্রতিবাদ করবার কথা ভাবতেও পারে না।
আমার ভাসুর অবশ্য এদের মত নয়, সরল মানুষ, মায়ামমতাওলা মানুষ, কিন্তু দিদির প্রকৃতিই যে ভয় করে মরা! ও জানে শ্বশুরবাড়ির বেড়াল কুকুরটাকে পর্যন্ত ভয় করে চলতে হয়। স্বামীকেও করবে, তাতে আর আশ্চর্য কি!
কিন্তু এদের? সেজ। আর ছোটর?
এদের মধ্যে সম্পর্ক যেন প্রভু-ভৃত্যের।
তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, বাইরে থেকে যা দেখতে পাওয়া যায়, সেটাই কি সত্যি? আমার স্বামীকেও তো বাইরে থেকে দেখে লোকে বলে স্ত্রীর দাসানুদাস, বলে কেনা গোলাম, বলে বশংবদ!
গিরিবালা সাবিত্রীব্ৰত উদযাপন করলো, গিরিবালা স্বামীর সঙ্গে একত্রে গুরুদীক্ষা নিয়ে তীর্থযাত্রায় বেরোলো। গিরিবালা সেই যাত্রাকালে মেজভাসুরের বাড়ি বেড়াতে এসে গল্প করে গোল কাশীতে কদিন থাকবে, কদিন বা বৃন্দাবনে, মথুরায়।
গিরিবালার মুখে সৌভাগ্যের গর্ব ঝলসাচ্ছিল।
আমি মূঢ়ের মত তাকিয়ে ছিলাম। সেই মুখের দিকে। ভেবে ঠিক করতে পারছিলাম না, এ কী করে সম্ভব! আমার সেজ দ্যাওরকে তো আমি জানি!
চরিত্রদোষের জন্যে খারাপ অসুখ হয়েছিল ওর। এ কথা লুকোছাপা করেও লুকোনো থাকে নি! তাছাড়াও মানুষের শরীর যত অসৎ বৃত্তি থাকা সম্ভব, যত নীচতা, যত ক্রুরতা, তার কোনটা নেই। ওর মধ্যে?
তবু গিরিবালা আহ্লাদে ডগমগ করছে, লোককে দেখিয়ে দেখিয়ে সৌভাগ্যকে ভোগ করছে।
একে কি সত্যি বলবো?
না। এ শুধু মনকে চোখ ঠারা?
কে জানে মন-ঠকানো, না লোক-ঠকানো!
বিন্দু আবার আর এক ধরনের।
ওর রাতদিন কেবল হা-হুতাশ আর আক্ষেপ। ও প্রতিপন্ন করতে চায়, জগতের সেরা দুঃখী ও।… যেমন করতে চায় আমার বড়মেয়ে আর মেজমেয়ে চাপা আর চন্নন!
কিন্তু সত্যিই কি ওরা আমার মেয়ে?
ওই চাপা আর চন্নন?
আমার বিশ্বাস হয় না। মনে হয় নিতান্তই দৈব-দুর্ঘটনায় ওরা পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হবার আগে দিনের জন্যে আমার গর্ভে আশ্রয় নিয়েছিল। ওদের থেকে বুঝি আমার ননদরা আমার অনেক বেশি নিকট।
কিন্তু তার জন্যে আর আক্ষেপ নেই আমার, আক্ষেপ শুধু এই পোড়া বাংলা দেশের হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মেয়ের জন্যে। আজও যারা চোখে ঠুলি এঁটে অন্ধ নিয়মের দাসত্ব করে চলেছে।
আজও যারা জানে, তারা শুধু মানুষ নয়, মেয়েমানুষ।
কিন্তু সুবৰ্ণলতার স্মৃতিকথায় স্থানকালের ধারাবাহিকতা নেই কেন? অতীতে আর বর্তমানে এমন ঘেঁষাঘেষি কেন?
অনেক সুবৰ্ণলতা একসঙ্গে মুখর হয়ে উঠতে চেয়েছে বলে? যে যখন পারছে কথা কয়ে উঠছে?… তাই সূত্র নেই?
