আর ভয় তো করেই, আমাকে নয়, আমার আচরণকে। ওরা হয়তো আমাকে বুঝতে চেষ্টা করলে বুঝতে পারতো। কিন্তু তা করে নি।
ওরা অনেক দূরের।
তবু ওরা যে ওদের দাদা-দিদির মতন নয়, সেইটুকু আমার সান্ত্বনা আমার সুখ।
পারুর মুখে আমি মাঝে মাঝেই আর এক জগতের আলো দেখছি, পারু লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখে এ আমি বুঝতে পারতাম। কিন্তু পারুর জন্যে আমার দুঃখ হয়, পারুর জন্য আমার ভাবনা হয়। বড় বেশি অভিমানী ও। ওর ওই অভিমানের মূল্য কি এই সংসার দেবে? বুঝবে ওর স্বাৰ্থবুদ্ধিহীন কবিমনের মূল্য?
হয়তো আমার মতই যন্ত্রণা পাবে ও! অভিমানের জ্বালাতেই আমি জীর্ণ হলাম!
তবু আমি চিরদিনই প্রতিবাদ করেছি, চেঁচামেচি করেছি, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি।
ও তা করবে না।
ও ওর মায়ের মত অসভ্য হবে না, রূঢ় হবে না, সকলের অপ্রিয় হবে না! কারণ ও শান্ত, ও মৃদু, ও সভ্য। ও শুধু অভিমানীই নয়, আত্মাভিমানী। ও ওর প্রাপ্য পাওনা না পেলে নীরবে সে দাবি ত্যাগ করবে, ও অন্যায় দেখলে নিঃশব্দে নিজেকে নির্লিপ্ত করে নেবে। ও অপরকে ভালো করে তোলবার বৃথা চেষ্টা করবে না।
জানি না পারুকে যার হাতে তুলে দিয়েছি, সে পারুকে বুঝতে চেষ্টা করছে কিনা। ওকে বোঝা শক্ত; নিজের সম্পর্কে ওর ধারণা খুব উঁচু। ও আমার এই শেষদিকের অবহেলার মেয়ে। চাঁপাচন্ননের মত অত রূপও নেই, বিদুষী হবার সুযোগও পায় নি, তবু নিজেকে ও তুচ্ছ ভাবতে পারে না। ওর এই মনের দায় কে পোহাবে? হয়তো সেই দায় ওকে নিজেকেই পোহাতে হবে। আর সেই ভার পোহাতে পোহাতেই ওর সব সুখ-শান্তি যাবে। নিজেকে বইবার কষ্ট যে কী, সে তো আমি জানি! পারুকে আমরা রীতিমত সুপাত্রের হাতে দিতে পেরেছি।–এই আমার স্বামীর গর্ব। আরও দু জামাইয়ের থেকে অনেক বিদ্বান আর রোজগারী পারুর বির।
বিদ্বান আর রোজগারী, কুলীন আর বনেদী ঘর, এই তো সুপাত্রের হিসেব, এই দেখেই তো বিয়ে দেওয়া। কে কবে দেখতে যায়, তার রুচি কি, চিন্তা কি, জীবনের লক্ষ্য কি?
দেখতে যায় না বলেই এত অমিল!
তলায় তলায় এত কান্না!
শুধু যে মেয়েমানুষই কাঁদে তাও তো নয়। পুরুষেও কাঁদে বৈকি। তার অন্তরাত্মা কাঁদে।
সবাই তো সমান নয়, কেউ হয়তো ছোট সুখ, ছোট স্বস্তি, ছোট গণ্ডি—এইতেই গরম সন্তুষ্ট, কারো না অনেক আশা নিয়ে ছুটোছুটি।
দোষ কাউকেই দেওয়া যায় না।
শুধু ভাগ্যদেবী যখন দুটো দু প্ৰকৃতির মানুষকে এক ঘানিতে জুড়ে দিয়ে মজা দেখেন তখনই অশেষ কষ্ট।
আমার স্বামীকে স্বামী পেয়ে সুখী হবার মত মেয়েই কি জগতে ছিল না!
অথচ তারা হয়তো উদার, হৃদয়বান, পণ্ডিত স্বামীর হাতে পড়ে সে স্বামীকে অতিষ্ঠা করে মারছে।
বিরাজের কথাই ধরি না।
বিরাজ তো তার ভাইদের মতই স্বার্থপর, সঙ্কীর্ণচিত্ত, পরশ্ৰীকান্তর আর সন্দেহবাতিকগ্ৰস্ত, অথচ তার স্বামী কত ভাল, কত উদার, কত ভদ্র!
বিরাজ মৃত্যুবৎসা।
ডাক্তারে বলেছে এটা বিরাজেরই দেহের ত্রুটি, তবু বিরাজ স্বামীকেই দোষ দেয়, স্বামীর চরিত্রে সন্দেহ করে। বিরাজকে নিয়ে ঠাকুরজামাই চিরদিন দগ্ধাচ্ছে।
প্রকৃতির পার্থক্য! এর বাড়া দুঃখ নেই।
তাই মনে হয়, হয়তো পারুর কপালেও দুঃখ আছে।
কিন্তু বকুল?
বকুল একেবারে ভিন্ন প্রকৃতির।
বকুল নিজের তুচ্ছতার লজ্জাতেই সদা কুণ্ঠিত। ছেলেবেলা থেকেই দেখেছি ও যেন নিজের জন্মানোর অপরাধেই মরমে মরে আছে। ও যে ওর মায়ের বুড়ো বয়সের মেয়ে, ও যে অনাকাজ্যিক্ষত, ও অবহেলার, ও যে অবান্তর, এই দুঃখময় সত্যটি বুঝে ফেলে সংসারের কাছে ওর না আছে দাবি, না আছে। আশা! তাই এতটুকু পেলেই যেন বর্তে যায়। পারুর ঠিক উল্টো।
পারু ও মুখ ফুটে কোনদিনই কিছু চায় না, কিন্তু পারুর মুখের ভাবে ফুটে ওঠে, ওর প্রাপ্য ছিল অনেক, খেলোমি করার রুচি নেই বলেই ও তা নিয়ে কথা বলে না।
আশ্চর্য! একই রক্তমাংসে তৈরি হয়ে, একই ঘরে মানুষ হয়ে, এমন সম্পূর্ণ বিপরীত প্রকৃতি কি করে হয়?
কোথা থেকে আসে নিজস্ব চিন্তা ভাব ইচ্ছে পছন্দ?
অথচ দুই বোনে মতান্তরও নেই। কখনো। বেচারী বকুলের যা কিছু কথা সবই তো তার সেজাদির সঙ্গে। আবার পারুলের যা কিছু স্নেহ-মমতা, তা বকুলের ওপর।
মা-বাপের কাছে কোনদিন আশ্রয় পায় নি। ওরা, বড় ভাইবোনের কাছে পায় নি। প্রশ্রয়, তাই ওরা যেন নিজেদের একটা কেটর তৈরি করে নিয়ে তার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল।
সে কোটর থেকে চলে যেতে হয়েছে পারুকে, বকুল একাই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে তার মধ্যে।
তবে পারুর মত নিজের মধ্যেই নিজে মগ্ন নয় বকুল, সকলের সুখবিধানের জন্যে যেন সদা তৎপর।
সংসার জায়গাটা যে নিষ্ঠুর, তা জেনে-বুঝেও ও যেন সংসারের ওপর মমতাময়ী। ওর মধ্যে বিধাতা একটি হৃদয় ভরে দিয়েছেন, ছোটবেলা থেকে তার প্রকাশ বোঝা গেছে। ভীতু-ভীতু নীরব প্ৰকাশ।
ওকে কাছে ডেকে গায়ে হাত বুলোতে ইচ্ছে হয় আমার। কিন্তু চিরদিনের অনভ্যাসের লজ্জায় পারি না। যদি ও অবাক হয়, যদি ও আড়ষ্ট হয়?
আর সুবল?
সুবলকে ঘিরে পাথরের পাঁচিল!
সুবলের মধ্যে বস্তু আছে, সুবলের মধ্যে হৃদয় আছে, কিন্তু সুবল যেন সেই থাকাটুকু। ধরা পড়ে যাবার ভয়ে একটা পাথরের দুর্গ গড়ে তার মধ্যে আত্মগোপন করে থাকতে চায়।
হয়তো—
এদের বাড়িতে হৃদয় জিনিসটার চাষ নেই বলেই সেটাকে নিয়ে এত সঙ্কোচ আমার ছোট ছেলের।
