লেখাটা যে মেয়েমানুষের হাতের, তা কি ও বুঝতে পারে নি। নিশ্চয় পেরেছিল। সত্যি বেটা ছেলে ভাবলে বইটাকে কি আস্ত রাখতো? কুচি কুচি করে ছিঁড়তো, পা দিয়ে মাড়াতো! এ শুধু সুবৰ্ণকে চারটি বিচ্ছিরি-বিচ্ছিরি কথা বলে নেবে বলেই ছল করে–
চোখ দিয়ে খুব জল আসছিল, তবু সুবৰ্ণ জোর করে চোখটা শুকনো রেখেছিল, শক্ত গলায় বলেছিল, দেখতে পাচ্ছে না মেয়েমানুষের হাতের লেখা? ও-বাড়ির জয়াদি দিয়েছেন!
ওর মুখটা শক্ত হয়ে উঠলো, ও-বাড়ির জয়াদি মানে? জয়াদিটি কে?
জানো না, তোমাদের নতুনদার বৌ! জয়াবতী দেবী।
বটে! নতুনদার বৌ! বলি তিনি কি আসা-যাওয়া করছেন নাকি? আশ্চর্য বেহায়া মানুষ তো! এদিকে জোর তলবে মামলা চলছে, আর ওদিকে তিনি প্ৰাণাধিক ভগিনীকে স্নেহ-উপহার ঘুষ দিতে আসছেন!
আমি সুবৰ্ণলতা দেবী রেগে গিয়েছিলাম।
আমি বলেছিলাম, মামলা ওরা করে নি, তোমরাই করেছি। জানতে বাকি নেই আমার! আর ভালবাসা জিনিসটা জানো না বলেই ঘুষ বলতে ইচ্ছে করছে তোমার!
ভালবাসা! ওঃ! বইখানা পাকিয়ে মোচড় দিতে দিতে বললো, তুমি যে জিনিসটা খুব জানো তা আর আমারও জানতে বাকি নেই। যারা আমাদের শক্ৰপক্ষ, উনি ঘর-জ্বালানে পর-ভোলানে মেয়ে যাচ্ছেন তাদের সঙ্গে ভালবাসা জমাতো মাকে বলে দিতে হচ্ছে, ও-বাড়ি থেকে লোকের আসা বন্ধ করছি!
বলে বইটা নিয়ে নিল ও।
বললো, যাক, আর কাব্যিতে দরকার নেই! এমনিতেই তো সংসারে মন নেই! এসো দিকি এখন–
বলে প্ৰদীপটা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে ঘরটাকে অন্ধকার করে দিল ও।
কিন্তু শুধু কি ঘরটাই অন্ধকার করে দিল?
ন বছর বয়সে এদেব বাড়িতে এসেছিলাম, আর এই তেরো বছর পার করতে চললাম, অনবরত শুনছি। সংসারে মন নেই। শাশুড়ী বলেন, তাঁর ছেলে বলেন। দ্যাওররাও তো বলতে ছাড়ে না। কি জানি সংসার মন কাকে বলে! কাজকৰ্ম্ম সবই তো করি। আমার গায়ে জোর বেশি বলে তো বেশি বেশিই করি। আর কি করতে হয়! আমার ওই বড়জায়ের মত—সব সময়ে রান্নাঘরে ভাড়ারঘরে থাকতে পারি না, এই দোষ। তার আর কি করবো!
ও আমার ভাল লাগে না।
কিন্তু দিদিরই কি সত্যি ভাল লাগে? ওর ইচ্ছে করে না, দোতলায় উঠে আসে, নিজের ঘরে এসে বসে, মেয়েকে দেখে?
করে ইচ্ছে। বুঝতে পারি।
তবু দিদি সুখ্যাতির আশায় ওইরকম রাতদিন নিচের তলায় পড়ে থাকে। কি না লোকে বলবে, কী লক্ষ্মী বৌ! সংসারে কী মন?
আচ্ছা, কী লাভ তাতে?
ওই সব স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর লোকেদের মুখের একটু সুখ্যাতি পেয়ে লাভ কি? আর চিরকালই কি ওরা সুখ্যাতি করে? দিনের পর দিন ভাল হয়ে হয়ে আর খেটে খেটে যে সুনামটুকু হয়, তা তো একাদণ্ডেই মুছে যায়। দেখিনি কি? এত কন্না করে দিদি, একদিন দ্বাদশীতে ভোরবেলা উঠে এসে শাশুড়ীকে তেল মাখিয়ে দিতে দেরী করে ফেলেছিল বলে কী লাঞ্ছনাই খেলো! দ্বাদশীতে নাকি নিজে হাতে তেল মাখতে নেই। জানি না, এইসব এই করতে নেই। আর ওই করতে নেই-এর মালা কে গোথেছিল বসে বসে!
মাও বলতেন বটে করতে নেই।
সে আর কি বেলা অবধি ঘুমোতে নেই, ইস্কুলের মেয়েদের সঙ্গে ঝগড়া করতে নেই, বড়দের সামনে বেশি কথা বলতে নেই, গরীব মানুষকে তুচ্ছ করতে নেই, ভিখিরিদের তাড়িয়ে দিতে নেই— এইসবু! মিষ্টি করে বুঝিয়ে দিতেন মা সেসব।
তার তো তবু মানে আছে।
আর এদের বাড়িতে?
এদের বাড়িতে যে কী অনাছিষ্টি সব কথা! মানে নেই! শুধু করতে নেই সেটাই জানা!
আর বৌ-মানুষদের যে কত-ই নেই!
বৌ-মানুষের তেষ্টা পেতে নেই, খিদে পেতে নেই, ঘুম পেতে নেই, আবার হাসিও পেতে নেই! লক্ষ্মী বৌ নাম নিতে হলে কথাও বলতে নেই! এত সাধনার শেষ মূল্য অথচ শেষ পর্যন্ত ওর। একদিন একটু দোষ করে ফেললেই সেই ছুতোয় চিরদিনের সব নম্বর কাটা।
কী লাভ তবে ওই বৃথা কষ্টে?
আর ওই ভাল হওয়াটা তো মিথ্যে বানানো, বলতে গেলে একরকম ছলনা। হ্যাঁ, ছলনাই। আমি যত ভাল নই, ততটা ভাল দেখানো মানেই তো ছলনা। তবে তা দেখাবো কেন আমাকে?
ওসব মিথ্যে আমার ভাল লাগে না।
দিদি অবিশ্যি সত্যিই ভাল মেয়ে। তবু আরো দেখাতে চেষ্টা করে। তাই সেদিন শাশুড়ীর পায়ে ধরে আবার তেল মাখাবার অধিকার অর্জন করে নিয়েছিল।
ওই তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে এত ঘটা দেখলে আমার হাসি পায়। দিদি কেঁদে মরছে দেখে হোসে মরছিলাম আমি। কিন্তু সেদিন!
যেদিন সেই স্বৰ্গ থেকে আছাড় খেয়ে পড়েছিলাম?
যেদিন নিশ্চিত জেনেছিলাম, আমার স্বামীর সঙ্গে কোনোদিনই মনের মিল হবে না। আমার? সেদিন কি হাসতে পেরেছিলাম? ওর বোকামি দেখে, ওর নীরোটত্ব দেখে? পারি নি। রাত্তিরে লুকিয়ে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছিলাম।
অবশ্য জীবনের এই দীর্ঘ পথ পার হয়ে এসে জেনেছি, মনের মিল শব্দটা একটা হাস্যকর অর্থহীন শব্দ।
ও হয় না।
মনের মিল হয় না, মনের মত হয় না!
নিজের রক্তে-মাংসে গড়া, নিজের আপ্রাণ চেষ্টায় গড়া সন্তান-তাই কি মনের মত হয়?
হয় না, হয় নি। আমার ছেলেমেয়েরা?
ওরা আমার অচেনা।
শুধু আমার শেষের দিকের তিনটে ছেলেমেয়ে, পারুল, বকুল আর সুবল, যাদের দিকে আমি কোনদিন ভাল করে তাকাই নি, যাদের গড়বার জন্যে বৃথা চেষ্টা করতে যাই নি, তারাই যেন মাঝে মাঝে আশার আলো দেখায়। মনে হয়। ওই দর্জিপাড়ার গলিতে বোধ হয়। ওদের শেকড় বসে নি, ওরা স্বতন্ত্র। ওরা নিজের মনে ভাবতে জানে।
তবু ওদের সঙ্গেই কি আমার পরিচয় আছে?
ওরা কি আমার অন্তরঙ্গ?
নাঃ, বরং মনে হয়, ওরা আমাকে এড়ায়, হয়তো বা—হয়তো বা আমাকে ঘেন্না করে।
