তাই—তাই হোক।
মরেই দেখিয়ে দেব, আটকে রাখবে বললেই আটকে রাখা যায় না!
কিন্তু শুধু কি এইসব কথাই লিখেছে সুবর্ণ তার স্মৃতিকথায়?
সুবৰ্ণ যেন ছাপাখানায় পাঠিয়ে দেওয়া খাতাখানার পাতাগুলোর মধ্যে ড়ুবে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে।…
সুবৰ্ণ দেখতে পাচ্ছে, সিঁড়ির ঘুলঘুলি থেকে বেরিয়ে আসছে একটা বই, তার সঙ্গে মিষ্টি একটু কথা। মানুষটাকে দেখা যায় না, শোনা যায় শুধু কথা। হাসি-হাসি গলার ঝঙ্কার।
এই নে, বইটা আর তোকে ফেরত দিতে হবে না! তুই পদ্য পড়তে ভালবাসিস শুনে তোর ভাসুর তো মোহিত। বলেছে, এটা তুমি উপহার দিও বন্ধুকে।
পৃথিবীতে এই মানুষও আছে ভগবান!
তবে তোমার উপর রাগ করে কি করবো?
আমার ভাগ্য! এ ছাড়া বলার কিছু নেই।
কিন্তু কী বই দিল জয়াদি?
এ কী জিনিস!
মানুষ এমন লিখতে পারে?
এ যে চেঁচিয়ে পড়বার, লোককে ডেকে শোনাবার!
এ কি সেই কবির কথা? না আমার কথা?
এ যে আমি মনে মনে পড়ে মনের মধ্যে ধরে রাখতে পারছি না গো–
আজি এ প্ৰভাতে রবির কর,
কেমনে পশিল প্ৰাণের ’পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে
প্রভাত-পাখীর গান।
না জানি কেমনে এতদিন পরে
জাগিয়া উঠিল প্ৰাণ।
এর কোন লাইনটাকে বেশি ভাল বলবো। আমি, কোন লাইনটাকে নয়?
জাগিয়া উঠিছে প্ৰাণ,
ওরে উথলি উঠিছে বারি।
প্ৰাণের বাসনা প্ৰাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।
থর থর করি কাঁপিছে ভুধর—
এ পদ্য আমি সবটা মুখস্থ করবো।
আমি ওদের সংসারের জ্বালায় আর কষ্টবোধ করবো না। ওরা যা চায়। তাই করে দিয়ে নিজের মনে এই বই নিয়ে বসবো। আরো যে সব পদ্য আছে, সব শিখে ফেলবো।
জয়াদি দেবী, তাই এই স্বর্গের স্বাদ এনে দিল আমায়। জয়াদির স্বামী দেবতা, তাই তাঁর মনে পড়েছে। আমি পদ্য ভালবাসি। ভগবান, ওঁদের বাঁচিয়ে রাখো, সুখে রাখো।
আজি এ প্ৰভাতে রবির কর,
কেমনে পশিল প্ৰাণের ’পর—
এর সব কথা আমার, সব কথা আমার জন্যে লেখা!
কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন
চারিদিকে তাঁর বাঁধন কেন?
ভাঙা রে হৃদয় ভাঙা রে বাঁধন…
সাধ রে আজিকে প্ৰাণের সাধন—
উঃ, কী চমৎকার, কী অপূর্ব! আমি কি করবো!
স্বৰ্গ বলে কি সত্যিই কোন রাজ্যপাট আছে? সত্যিই মাটি থেকে অনেক উঁচু তে মেঘেরও ওপরে সেই জগৎ, সেখানে দুঃখ নেই, শোক নেই, অভাব নেই, নিরাশ নেই, খলতা-কপটতা নেই, এক কথায় বলতে গেলে এই পৃথিবীর ধুলো-ময়লার কোন কিছুই নেই!
নাকি ওটা শুধুই কবিকল্পনা? আমাদের এই মনের মধ্যেই স্বৰ্গ, মর্ত্য, পাতাল! এই মনের অনুভব ই পৃথিবীর ধুলোমাটি থেকে অনেক উঁচু তে, মনের যত মেঘ তারও ওপরে উঠে গিয়ে স্বৰ্গরাজ্যে পৌঁছয়?
কে জানে কি! আমার তো মনে হয়, শেষের কথাটাই বুঝি ঠিক। আর উঁচু দরের কবিরা পারেন। সেই অনুভবের উঁচু স্বর্গে নিয়ে যেতে। সেখানে গিয়ে পৌঁছলে মনেই পড়ে না পৃথিবীতে দুঃখ আছে, জ্বালা আছে, ধুলো-ময়লা আছে।
শুধু আনন্দ, শুধু আনন্দ!
চোখে জল এসে যাওয়া অন্য এক রকমের আনন্দ!
কিন্তু মানুষকে কেন নিয়ে যেতে পারেন না কবিরা? পারেন না বলেই না সেই আনন্দের দেশ থেকে হঠাৎ আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়তে হয়!
অন্তত সেদিনের সেই সংসারবুদ্ধিহীনা বালিকা সুবৰ্ণলতা তাই পড়েছিল। সেই আছাড় খাওয়ার দুঃখে তার বিশ্বাসের মূল যেন আলগা হয়ে গিয়েছিল। মানুষের ওপর বিশ্বাস, ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস, ভগবানের ওপর বিশ্বাস। সব বিশ্বাস বুঝি শিথিল হয়ে গেল।
সুবৰ্ণর স্বামী রূঢ় রুক্ষ, সুবৰ্ণ জানে সে কথা, কিন্তু সে যে এত বেশী নীরেট নির্বোধ, এত বেশি ক্রুর, সে কথা বুঝি জানতো না তখনো।
জানলো, আছাড় খেয়ে জানলো।
এই বহুদূরে এসে সেই সংসারবুদ্ধিহীন আবেগপ্রবণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে করুণা হয় সুবর্ণর, ওর আশাভঙ্গের আর বিশ্বাসভঙ্গের দুঃখে চোখে জল আসে। মেয়েটা যে একদার আমি, ভেবে ভেবেও মনে আনতে পারে না।
কিন্তু এই আমিটার মত এত ভয়ঙ্কর পরিবর্তনশীল আর কি আছে? আমিতে আমি-তে কী অমিল!
তবু তাকে আমরা আমিই বলি—
অবোধ সুবৰ্ণও ভেবেছিল, এই আনন্দের স্বাদ ওকেও বোঝাই। আমার স্বামীকে। তখনো তার ওপর আশা সুবর্ণর!
আশা করেছিল ওরও হয়তো মনের দরজা খুলে যাবে! তাই বলেছিল, তোমার খালি শুয়ে পড়া যাক, শুয়ে পড়া যাক। বোসো তো একটু, শোনো। কী চমৎকার!
হ্যাঁ, প্ৰদীপটা উস্কে দিয়েছিল, সুবর্ণ তার সামনে ঝুঁকে পড়ে পড়েছিল—
হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি,
জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি,
ধরায় আছে যত মানুষ শত শত,
আসিছে প্ৰাণে মম, হাসিছে গলাগলি।
ও সেই সুবৰ্ণকে থামিয়ে দিলো, বেজার গলায় বললো, জগৎসুদ্ধ সবাই এসে কোলাকুলি করছে? তাই এত ভাল লাগছে? বাঃ বাঃ, বেড়ে চিন্তাটি তো! শত শত মানুষ এসে প্ৰাণে পড়ছে? তোফা! এমন রসের কবিতাটি লিখেছেন কোন মহাজন?
সুবৰ্ণ বলল, আঃ, থামো না! শেষ অবধি শুনলে বুঝবে-
আবার পড়তে শুরু করে। পড়ছে, —হঠাৎ ও ফস করে বইটা কেড়ে নিল, বলে উঠলো, তোফা তোফা! এ যে দেখছি রসের সাগর! কি বললে, এসেছে সখাসখি, বসেছে চোখাচৌখি? আর যেন কি, দাঁড়িয়ে মুখোমুখি।? বলি এসব মাল আমদানি হচ্ছে কোথা থেকে?… ব্যঙ্গের সুর গেল, ধমক দিয়ে উঠলো, কোথা থেকে এল এ বই?
চোখে জল এসে গেল মেয়েটার, সেটা দেখতে দেবে না, তাই কথার উত্তর দেয় না।
ও বইটা নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখল। তারপর সাপের মত হিসহিসিয়ে বলে উঠলো, এই যে প্ৰমাণ-পত্তর তো হাতেই। প্ৰাণাধিক ভগিনী শ্ৰীমতী সুবৰ্ণলতা দেবীকে মেহোপহার—, বলি এই প্ৰাণাধিক ভ্ৰাতাটি কে? কোথা থেকে জোটানো হয়েছে। এটিকে?
