আচ্ছা, ইস্কুলের মেয়েরা যদি জিজ্ঞেস করে, এতদিন আসিস নি কেন? যদি সুবর্ণর মাথায় সিঁদুর দেখে হেসে উঠে বলে, এ মা, তোর বিয়ে হয়ে গেছে! কী উত্তর দেব?
বলব কি-আমার ঠাকুমা আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে? … নাঃ, সে কথা শুনলে ওরা আরো হাসবে!… তার চাইতে সিঁদুরটা আচ্ছা করে মুছে নেব রাস্তায় বেরিয়ে। রাস্তার কলে ধুয়ে ঘষে সাদা করে ফেলবো। ও-বাড়ির দিদি-জায়াবতীদিদি, ওকেই শুধু বলে যাব আমি চলে যাচ্ছি! ও আমায় যা ভালবাসে, ঠিক মুক্তারামবাবুর স্ত্রীটে গিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করবে! ওর শ্বশুরবাড়ি এমন বিচ্ছিরি নয়, ও কত বাপের বাড়ি যায়!
পালাবো পালাবো। এই ছিল ধ্যান-জ্ঞান।
কিন্তু পালাতে পারে নি। সুবর্ণ। জীবনভোর পারল না … দেখেছে পালানোটাকে যত সোজা ভেবেছিল তত কঠিন।
একাদণ্ডের জন্যে পাহারা সরায় না এরা।
ক্রমশই তাই বেথুন ইস্কুল, ঠনঠনে কালীতলা, মুক্তারামবাবু স্ত্রীট, আঠারোহাত কালীর মন্দির, সব কিছুই ঝাপূসা হয়ে যাচ্ছে… স্পষ্ট আর প্রখর হয়ে উঠছে সিঁথির ওই সিঁদুরটা। ওটাকে ঘষে ঘষে মুছে ফেলার কথা যেন অবাস্তব মনে হচ্ছে।… সেই তার নিজের জীবনে, সত্যিকার জীবনে যে আর ফিরে যাওয়া যাবে না, সেটা যেন স্থিরীকৃত হয়ে যাচ্ছে।
সুবৰ্ণর বই খাতা স্লেট পেন্সিল সব যে তাদের কুলুঙ্গিটার মধ্যে পড়ে রইল, সেকথা তো কেউ ভাবলো না? সামনেই যে সুবর্ণর হাফ-ইয়ারলি একজামিন, সে কথা মারও তো কই মনে পড়ল না?
সুবৰ্ণর সমস্ত প্ৰাণটা যেন ওই কুলুঙ্গিটার উপর আছড়ে পড়তে যায়।
এতদিন না পড়ে পড়ে সুবৰ্ণ যে সব ভুলে যাচ্ছে!
ভগবান, সুবর্ণ তোমার কাছে কি দোষ করেছিল যে এত কষ্ট দিচ্ছ তাকে? রোজসকালে ঘুম থেকে উঠে কি তোমাকে নমস্কার করে নি? রোজ ইস্কুলে গিয়ে প্রার্থনা করে নি… রাত্তিরে শুতে যাবার সময় কি বলে নি, ঠাকুর, বিদ্যে দিও, বুদ্ধি দিও, সুমতি দিও!
যা যা শিখিয়েছিল মা, সবই তো করেছে সুবর্ণ, তবে কেন এত শাস্তি দিচ্ছ সুবৰ্ণকে?
কেন? কেন? কেন?
ওই কেনর ঝড় থেকে বালিকা সুবৰ্ণ হারিয়ে যাচ্ছে, তার খোলস থেকে যুবতী জন্ম নিচ্ছে, তবু সেই কেনটাই ধূসর হয়ে যাচ্ছে না। সে যেন আরো তীব্র হয়ে উঠছে।
আমি কি এত পাজী হতে চাই?… আমি কি গুরুজনদের মুখের উপর চোপা করতে ভালবাসি? আমি কি বুঝতে পারি না, আমি চোপা করি বলেই আমার ওপর আক্রোশ করেই ওরা আমাকে আরো বেশি বেশি কষ্ট দেয়?
কিন্তু কি করবো?
এত নিষ্ঠুরতা আমি সহ্য করতে পারি না, সহ্য করতে পারি না। এত অসভ্যতা। আমার ওই বর, ও কেন এত বিচ্ছিরি! এর থেকে ও যদি খুব কালো আর কুচ্ছিত দেখতে হতো, তাও আমার ছিল ভালো। কিন্তু তা হয়নি। ওর বাইরের চেহারাটা দিব্যি সুন্দর, অথচ মনের ভেতরটা কালো কুচ্ছিত বিচ্ছিরি … ও মিছিমিছি। করে আমাকে বলেছিল, লুকিয়ে আমাকে আমার বাপের বাড়ি নিয়ে যাবে। সেই কথা বিশ্বাস করে ওকে ভালবেসেছিলাম আমি, ভক্তি করেছিলাম, ওর সব কথা রেখেছিলাম।–খারাপ বিচ্ছিরি সব কথা! —কিন্তু ওর কথা ও রাখে নি। রোজ ভুলিয়ে ভুলিয়ে শেষ অবধি একদিন হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হেসে বলেছিল, ও বাবা, একবার গিয়ে পড়লে কি আর তুমি আসতে চাইবে! নিৰ্ঘাত সেখানে থেকে যাবে। এমন পরীর মতন বৌটি আমি হারাতে চাই না বাবা!
কত দিব্যি গাললাম যে আবার ফিরে আসবো, তবু বিশ্বাস করল না।
ও আমায় বিশ্বাস করে না, আমিও ওকে বিশ্বাস করি না। ও নাকি আমায় ভালবাসে, বলে তো তাই সব সময়, কিন্তু ভগবান, আমার অপরাধ নিও না, আমি ওকে ভালবাসি না। ওকে ভালবাসা আমার পক্ষে অসম্ভব। ওর সঙ্গে একবিন্দু মিল নেই আমার।
তবু চিরদিন ওর সঙ্গে ঘর করতে হবে। আমায়?
…আজ আবার সেই হলো!
আজ আবার ওরা ছোড়দাকে তাড়িয়ে দিল।
আমার সঙ্গে দেখা করতে দিল না।
দাদার বিয়েতে নাকি ঘটা করে নি। বাবা, মা চলে গেল বলে। নমো নমো করে সেরেছে। দাদার মেয়ের মুখেভাতে। একটু ঘটা করবে। তাই ছোড়দা আমায় নিতে এসেছিল। বাবা নাকি অনেক মিনতি করে চিঠি লিখে দিয়েছিল ওর হাতে। ওরা সে চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছে, ছোড়দাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে দেয় নি।
বলেছে, ছেলের বিয়ে শুনলাম না, নাতনীর ভাত! এমন উনচুটে বাড়িতে আমাদের ঘরের বৌ যাবে না।
ছোড়দা নাকি ভয় করে নি, ছোড়দা নাকি এ বাড়ির সেজ ছেলের মুখের ওপর চোটপাট শুনিয়ে দিয়ে গেছে। নাকি বলেছে, আপনাদের মত লোকের জেল হওয়া উচিত।
এ বাড়ির সেজ ছেলে সেই অপমান সহ্য করবে?
উল্টো অপমান করবে না? করবে না। গালমন্দ?
তবু তো এ বাড়ির মেজ ছেলে তখন বাড়ি ছিল না, থাকলে ছোড়দার কপালে আরো কি ঘটতো কে জানে!
বাড়ি ফিরে শুনে তো অদৃশ্য লোকটাকেই এই মারে তো সেই মারে! বলে, কি, শুধু চলে যেতে বললি? ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বার করে দিতে পারলি না শালাকে?
আমি যখন রাগে ঘেন্নায় কথা বলি নি ওর সঙ্গে, তখন হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হেসে বললো, শালাকে শালা বলবো না তো বেয়াই বলবো? হ্যাঁ, আমি প্রশ্ন করেছিলাম, তোমার ভাইদের মান আছে, আমার ভাইদের মান নেই?
সেই শুনে এমনি হাসি হেসেছিল ও, আমি কাঠ হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর সবাইকে ডেকে বুলেছিল, আরে গুনছ, শলাকে নাকি সমান করা উচিত ছিল আমার! পাদ্য-অৰ্ঘ্য দেওয়া উচিত ছিল!
ঠিক আছে, ভগবান যখন আমাকে এই নিষ্ঠুর আর অসভ্যদের কাছেই রেখে দিয়েছে, তখন তাই থাকবো। আর যেতে চাইব না। এ বাড়ির বাইরে। ভুলে যাব আমারও মা ছিল, বাপ ছিল, ভাই ছিল, বাড়ি ছিল। ওদের বাড়ি থেকে বেরোবো একেবারে নিমতলাঘাটের উদ্দেশে।
