তা মামীমাই কি ঠিক জানেন?
মেজবৌমা ডাকটাতেই তো অভ্যস্ত।
হঠাৎ নিজ মনে হেসে ওঠে সুবৰ্ণলতা।
কী আশ্চর্য! খাতাটার প্রথম পৃষ্ঠাতেই তো তার নাম রয়েছে। যে হাতের লেখার প্রশংসা করেছেন জগু-বটুঠাকুর, সেই হাতের লেখাঁটিকে আরো সুছোদ সুন্দর করে ধরে ধরে নামটি লেখে নি। একবার সুবৰ্ণ?
হ্যাঁ, পরম যত্নে পরম সোহাগে কলমটিকে ধরে ধরে লিখে রেখেছিল সুবর্ণ—শ্ৰীমতী সুবৰ্ণলতা
সেই লেখা চোখ এড়িয়ে যাবে?
এড়িয়ে যাবে না।
চোখ এড়িয়ে যাবে না।
নামতা মুখস্থ করার মত বার বার মনে মনে এই কথা উচ্চারণ করতে থাকে সুবর্ণ, চোখ এড়িয়ে যাবে না। বইয়ের উপর লেখা থাকবে শ্ৰীমতী সুবৰ্ণলতা দেবী!
সুবৰ্ণলতার মা জেনে গেল না এ খবর!
এত আনন্দের মধ্যেও সেই বিষণ্ণ বিষাদের সুর যেন একটা অস্পষ্ট মূৰ্ছনায় আচ্ছন্ন করে রাখে।
মা থাকতে এই পরম আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটলে, মাকে অন্তত একখণ্ড বই পার্শেল করে পাঠিয়ে দুড় মুকু বাড়ির কাউকে দিয়ে অবশ্য, মামীমাকে দিয়ে এই জণ্ড বইঠাকুরকে বলেই করিয়ে দিতো কাজটা।
মা প্রথমটায় পার্শেল পেয়ে হকচাকিয়ে যেত, ভাবতো, কী এ? তারপর বাঁধন খুলে দেখতো। দেখতো! দেখতো বইয়ের লেখিকা শ্ৰীমতী সুবৰ্ণলতা দেবী!
তারপর?
তারপর কি মার চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তো না?
সুবৰ্ণলতার মনটা যেন ইহলোক পরলোকের প্রাচীর ভেঙে দিতে চায়। যেন তার সেই অদেখা বইটা সেই ভাঙা প্রাচীরের ওধারে নিয়ে গিয়ে ধরে দিতে চায়! সুবৰ্ণ দেখতে পায়, সুবর্ণর মা সুবর্ণর স্মৃতিকথা পড়ছেন।
পড়ার পর?
শুধুই কি সেই দু ফোঁটা আনন্দাশ্রুই ঝরে পড়ে শুকিয়ে যাবে? সেই শুকনো রেখার উপর দিয়ে ঝরণাধারার মত ঝড়ে পড়বে না। আরো অজস্র ফোঁটা? দেখতে পাচ্ছেন, কীভাবে কাটাবনের উপর দিয়ে রক্তাক্ত হতে হতে জীবনে এতটা পথ পার হয়ে এসেছে সুবর্ণ।
মা বুঝতে পারছেন সুবর্ণ অসার নয়।
কোন কোন অংশটা পড়তে পড়তে মা বিচলিত হতেন, আর কোন কোন অংশটা পড়ে বিগলিত, ভাবতে চেষ্টা করে সুবর্ণ।
নিজের হাতের সেই লেখাগুলো যেন দৃশ্য হয়ে ভেসে ওঠে।
পর পর নয়, এলোমেলো।
যেন দৃশ্যগুলো হুড়োহুড়ি করে সামনে আসতে চায়। যেন এক প্যাকেট তাসকে কে ছড়িয়ে দিয়েছে।
অনেক বয়সের অনেকগুলো সুবর্ণ ছড়িয়ে পড়ে সেই অসংখ্য র মধ্যে। মাথায় খাটো, পায়ে মল, একগালা-ঘোমটা বালিকা সুবৰ্ণ, হঠাৎ লম্বা হয়ে যাওয়া সদ্য রী সুবর্ণ, নতুন মা হয়ে ওঠা আবেশবিহ্বল সুবৰ্ণ, তারপর
আচ্ছা, ওই ঘোমটা দেওয়া ছোট মাপের সুবৰ্ণর ঘোমটাটা হঠাৎ খুলে গেল যে!
কি বলছে ও?
কী বলছে, সে কথা শুনতে পাচ্ছে সুবৰ্ণলতা!
তাড়িয়ে দিলে? তোমরা আমার বাবাকে তাড়িয়ে দিলে? আমাকে নিয়ে যেতে দিলে না? কেন? কেন? কী করেছি। আমি তোমাদের, তাই এত কষ্ট দেবে আমাকে. কে বলেছিল আমাকে তোমাদের বৌ করতে? শুধু শুধু ঠকিয়ে ঠকিয়ে বিয়ে দিয়ে…চলে যাব, আমি তোমাদের বাড়ি থেকে চলে যাব-তোমাদের মতন নিষ্ঠুরদের বাড়িতে থাকলে মরে যাব আমি।
সুবৰ্ণলতা অন্য আর এক গলার উচ্চ নিনাদও শুনতে পাচ্ছে, ওর নিজের কলমের অক্ষরগুলোই যেন সশব্দ হয়ে ফেটে পড়ছে, ওমা, আমি কোথায় যাব! এ কী কালকেউটের ছানা ঘরে আনলাম গো আমি! চলে যাবি? দেখা না একবার চলে গিয়ে! খুন্তি নেই আমার? পুড়িয়ে পুড়িয়ে ছ্যাকা দিতে জানি না?… বাপকে তাড়িয়ে দিলে! দেব না তো কি, ওই বাপের সঙ্গে নাচতে নাচতে যেতে দেব তোকে?…সইমা আমার পূর্বজন্মের শত্রু ছিল, তাই তোকে আমার গলায় গছিয়ে পরকাল খেয়েছে আমার। আর ওমুখো হতে দিচ্ছি না তোকে… ইহজীবনে কেমন আর বাপের বাড়ির নাম মুখে আনিস, দেখবো! বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক তোর যদি না ঘোচাই তো আমি মুক্তবামনী নই! বাপ চলে যাচ্ছে বলে ঘোমটা খুলে রাস্তায় ছুটে আসা বার করছি।
সেই ঘোমটা খোলা, বালিকা সুবৰ্ণকে টেনেহিঁচড়ে ঘরে এনে পুরে শেকল তুলে দিয়ে গেল ওরা, বলে গেল, মুখ থেকে আর টু শব্দ বার করবি না!
সুবৰ্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল।
এই অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতায় যেন নিথর হয়ে গেল।…তবু তখনো সত্যি বিশ্বাস হয় নি তার, সেই নিষ্ঠুরতার কারাগারেই চিরদিনের মত থাকতে হবে তাকে।… মনে করছিল, কোনমতে একবার এদের কবল থেকে পালিয়ে যেতে পারলেই সব সোজা হয়ে যাবে।
তাই পালাবার মতলবই ভেজেছিল বসে বসে!
রাস্তা চেনে না? তাতে কি? রাস্তায় বেরোলেই রাস্তা চেনা যায়। রাস্তায় লোককে জিজ্ঞেস করলেই হবে।… সুবৰ্ণদের বাড়িটা রাস্তার লোক যদি না চেনে তো সুবর্ণ তার ইস্কুলটার নাম করবে। ইস্কুলটাকে নিশ্চয়ই সবাই চেনে, বেথুন ইস্কুল তো নামকরা জায়গা।… হে ঠাকুর, একবার সুবৰ্ণকে সুযোগ দাও পালিয়ে যাবার!… সুবর্ণ রাস্তার লোককে জিজ্ঞেস করে করে একবার ইস্কুলে গিয়ে পৌঁছে যাক। তারপর আর বাড়ি চেনা আটকায় কে?… রোজ যেমন করে চলে যেতো তেমনি করেই চলে যাবে।
চলে গিয়ে?
চলে গিয়ে বাবাকে বলবে, দেখলে তো বাবা, তুমি আনতে পারলে না, আমি নিজে নিজেই চলে এলাম! আর মাকে বলবে, মা! মা কোথায়? এরা তো কেবলই বলে তার মা চলে গেছে! কোথায় চলে গেছে মা? এতদিনেও আসে নি? ঠিক আছে, সুবর্ণ গিয়ে পড়ে দেখবে কেমন না আসে মা? দাদার বিয়ে হবে, কত মজা, আর কত কাজ মার, কোথায় গিয়ে বসে থাকবে শুনি?…
ইস্ ভগবান, একবার এদের বাড়ির লোকগুলোর দৃষ্টি হরে নাও, সুবৰ্ণকে পালাতে দাও। কে জানে সুবর্ণর দাদার বিয়ের সময়েও হয়তো যেতে দেবে না। এরা সুবৰ্ণকে।
