আবার হয়তো বা একথাও বলে, তোমরা তো রোজই খেটে সারা হচ্ছে বৌমা, আমার অভ্যাস খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কি রান্না হবে বল, আমি রাঁধি।
বৌরা বলে, আপনার শরীর খারাপ—
সুবৰ্ণ মিষ্টি হাসি হাসে, খারাপ আবার কি বাপু? খাচ্ছি।–দাচ্ছি, ঘুরছি ফিরছি! তোমাদের শাশুড়ী চালাক মেয়ে, বুঝলে? কাজের বেলাতেই তার শরীর খারাপ!
ওরা অবাক হয়।
ওরা শাশুড়ীর এমন মধুর মূর্তি দেখে নি এসে পর্যন্ত। ওরা ভাবে ব্যাপারটা কি?
সুবৰ্ণ ওদের বিস্ময়টা ধরতে পারে না, সুবৰ্ণ আর এক জগৎ থেকে আহরণ করা আলোর কণিকা মুঠো মুঠো ছড়ায়।
ভানু মাছের মুড়ো দিয়ে ছোলার ডাল ভালবাসে, তাই বরং হোক আজ। কানুটা বড়া দিয়ে মোচার ঘণ্টর ভক্ত, হয় নি। অনেকদিন, দুটো ডাল ভিজোও তো মেজবৌমা! … ওগো আজ মোচা এনো তো।
বাজার করার তারা প্ৰবোধের।
এই মহান কর্মভার অবশ্য সে স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছে। ছেলেরা চক্ষুলজ্জার দায়ে কখনো কখনো বলে বটে, আমাদের বললেই পারেন! নিজে এত কষ্ট করার কি দরকার! তবে সে কথা গায়ে মাঝে না প্রবোধ।
কিন্তু সেই বাজার-বেলায় সুবৰ্ণলতা তাকে ডেকে হেঁকে বিশেষ কোনো জিনিস আনতে হুকুম দিয়েছে, এ ঘটনা প্রায় অভূতপূর্ব অন্তত বহুকালের মধ্যে মনে পড়ে না।
বোধ করি ছেলেমেয়েরা যখন ছোট ছোট, তখন তাদের প্রয়োজনে বিস্কুট কি লজেন্স, বার্লি কি মুলু যুদ্ধ ইত্যাদির অর্ডার দিতে এসেছে বেরোবার মুখে। কিন্তু মুখের রেখায় এই যে আহ্লাদের জ্যোতি।
এ বস্তু কি দেখা গিয়েছে কোনোদিন?
দেখা যেত—ওই আলোর আভা দেখা যেত কখনো কখনো সুবর্ণর মুখে, কিন্তু সে আভা আগুন হয়ে প্ৰবোধের গাত্ৰদাহ ঘটাতো।
স্বদেশী হুজুগের সময় যখনই কোনো বিদঘুটে খবর বেরোতো, তখনই সুবর্ণর মুখে আলো জুলতো। আলো জুলতো যখন নতুন কোনো বই হাতে পেত—আলো জুলতো যখন বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে একত্রে বসিয়ে পাঠশালা পাঠশালা খেলা ফেঁদে তার স্বরে তাদের দিয়ে পদ্য মুখস্থ করাতো—আলো জুলতো যদি কেউ কোনখান থেকে বেড়িয়ে বা তীৰ্থ করে এসে গল্প জুড়তো।
তা ছাড়া আর এক ধরনের আলো আর আবেগ ফুটে উঠেছিল সুবৰ্ণলতার মুখে, ইংরেজ-জার্মান যুদ্ধের সময়। সে এক ধরন। যেন সুবৰ্ণলতারই জীবনমরণ নিয়ে যুদ্ধ হচ্ছে! দেশের রাজা বৃটিশ, অথচ সুবৰ্ণর ইচ্ছে জার্মানরা জিতুক। তাই তর্ক, উত্তেজনা, রাগোরাগি। মেয়েমানুষ, তাও রোজ খবরের কাগজ না হলে ভাত হজম হবে না!
তা সে প্রকৃতিটা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে।
এই তো ইদানীং আবার যে স্বরাজ-স্বরাজ হুজুগ উঠেছে, তাতে তো কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। বরং যেন অগ্রাহ্য। বলে, অহিংসা করে শক্ৰ তাড়ানো যাবে এ আমার বিশ্বাস হয় না।… বলে, দেশসুদ্ধ লোক বসে বসে। চরকা কাটলে স্বরাজ আসবে? তাহলে আর পৃথিবীতে আদি-অন্তকাল এত অস্ত্রশস্ত্র তৈরি হতো না। উত্তেজিত হয়ে তর্কটা করে না, শুধু বলে।
শক্তি-সামৰ্থ্যটা কমে গেছে, ঝিমিয়ে গেছে।
তাই মুখের সেই ঔজ্জ্বল্যাটাও বিদায় নিয়েছিল। বিশেষ করে সেই অদেখা মায়ের, আর চকিতে দেখা বাপের মৃত্যুশোকের পর থেকে তো—
হঠাৎ যেন সেই ঝিমিয়ে পড়া ভাবটার খোলস ছেড়ে আবার নতুন হয়ে ওঠার মত দেখাচ্ছে সুবৰ্ণকে।
কেন?
মাথার দোষ-টোষ হচ্ছে না তো?
পাগলরাই তো কখনো হাসে কখনো কাঁদে।
তা যাক, এখন যখন হাসছে, তাতেই কৃতাৰ্থ হওয়া ভালো।
তাৰ্থই হয় প্ৰবোধ।
গলিত গলায় বলে, মোচা? মোচা আনা মানেই তোমার খাটুনি গো, ও কি আর বৌমারা বাগিয়ে কুটিতে-ফুটিতে পারবেন?
সুবৰ্ণ বলে, শোনো কথা! সব করছে ওরা। কিসে হারছে? তবে আমারই ইচ্ছে হয়েছে, রান্নাবান্না ভুলে যাব শেষটা?
কৃতাৰ্থমন্য প্ৰবোধ ভাবতে ভাবতে বাজার ছোটে, আহা, এমন দিনটি কি চিরদিন থাকে না?
এই জীবনটাই তো কাম্য!
গিনী ফাইফরমাস করবে, এটা আনো ওটা আনো বলবে, কর্তা সেইসব বরাতি বস্তু এনে সাতবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখাবে, বাহবা নেবে, গিন্নী গুছিয়ে-গাছিয়ে রাধবে বাড়বে, বেলা গড়িয়ে পরিপাটি করে খাওয়া-দাওয়া হবে, আর অবসরকালে কর্তা-গিনী পানের বাটা নিয়ে বসে ছেলে বৌ বেয়াই বেয়ানের নিন্দাবাদ করবে, এযুগের ফ্যাশান নিয়ে সমালোচনা করবে—এই তো এই বয়সের সংসারের ছবি!! প্ৰবোধের সমসাময়িক বন্ধুবান্ধবরা তো এই ধরনের সুখেই নিমগ্ন।
প্ৰবোধের ভাগ্যেই ব্যতিক্রম। এই সামান্য সাধারণ সুখটুকুও ইহজীবনে জুটলো না।
গিনী যেন সিংহবাহিনী।
তাসের আড্ডাটা যাই আছে প্ৰবোধের, তাই টিকে আছে বেচারা।
তা এতদিনে কি ভগবান মুখ তুলে চাইছেন?
পাগল-ছাগল হয়ে সহজ হয়ে যাচ্ছে সুবৰ্ণ?
নাকি এতদিনে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে?
তা সে যে কারণে যাই হোক, সুবৰ্ণ যে সহজ প্ৰসন্নমুখে ডেকে বলেছে, ওগো বাজার যোচ্ছ, মোচা এনো তো—এই পরম সুখের সাগরে ভাসতে ভাসতে বাজারে যায় প্ৰবোধ, আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাছ-তরকারি এনে জড়ো করে।
সুবৰ্ণ তখন হয়তো অনুমান করতে চেষ্টা করছে, তার ওই খাতাটা ছাপতে কতদিন লাগতে পারে, কতদিন লোগা সম্ভব! ধারণা অবশ্য নেই কিছুই, তবু কতই আর হবে? বড় জোর মাস দুই, কমও হতে পারে। তারপর
আচ্ছা, জগু-বটুঠাকুর আমার নামটা জানেন তো? কে জানে! কিন্তু জানবেই বা কোথা থেকে? কবে আর কে আমার নাম উচ্চারণ করেছে। ওঁর সামনে?
তাহলে?
বিনা নামেই বই ছাপা হবে?
নাকি মামীমার কাছ থেকে জেনে নেবেন। উনি?
