শুনে তখন সহসা ভূমিকম্পের মতো প্রবল একটা বাম্পোচ্ছাসে সুবৰ্ণলতার সমস্ত শরীর দুলে উঠেছিল। জীবনের তিন ভাগ কাটিয়ে এসে সুবৰ্ণলতা এই প্রথম শুনলো সে গুণবতী! শুনলো তার কোনো গুণ নিয়ে কেউ গৌরব করতে পারে!
অথচ এই গুণাই–
হ্যাঁ, এই গুণই দোষ হয়েছে চিরকাল!
আজীবনই তো একটু-আধটু লেখার সাধ ছিল। কিন্তু সে সাধ মেটাতে অনেক দাম দিতে হয়েছে। কত সঙ্গোপনে, কত সাবধানে, হয়তো রাত্রে যখন ওদিকে তাসের আড্ডা জমজমাট, অথচ এদিকে ছেলেরা ঘুমিয়েছে, তখন বসেছে একটু খাতা-কলম নিয়ে, প্ৰবোধ কোনো কারণে ঘরে এসে পড়ে দেখে ফেললো, ব্যস, শুরু হলো ব্যঙ্গ তিরস্কার।
আর তার জের চলতে লাগলো বেশ কিছুকাল। যে সংসারে মেয়েমানুষ বিদ্যোবতী হয়ে উঠে কলম নাড়ে, তাদের যে লক্ষ্মী ছেড়ে যাওয়া অনিবাৰ্য এ কথাও ওঠে। তাছাড়া কলম ধরা হাত যে আর হাতবেড়ি ধরতে চাইবে না, তাতে আর সন্দেহ কি!
অনেক সময় অনেক কটুক্তি হজম করেছে। সুবৰ্ণলতা তার খাতা নিয়ে। আর এখনই কি হয় না? কটূক্তি না হোক বক্রোক্তি!
কানে আসে বৈকি।
আর সে উক্তি আজকাল অনেক সময়ই আসে ছেলেদের ঘর থেকে। সুবৰ্ণলতার রক্তেমাংসে গঠিত ছেলেদের!
ব্যাপারটা কি? কোনো থিসিসৃটিসিস লেখা হচ্ছে নাকি?… মা কি রান্নাঘরটা একদম ছেড়ে দিলেন নাকি রে বকুল? দেখতেই পাওয়া যায় না!–সুবল, তুই তো অনেক জানিস, মহাভারত লিখতে বেদব্যাসের কতদিন লেগেছিল জানিস সে খবর?
অথবা প্ৰবোধের আক্ষেপ-উক্তি শোনা যায়, কী রান্না-বান্না হচ্ছে আজকাল? বকুল, এ মাছের তরকারি রোধেছে। কে? তুই বুঝি? মুখে করা যাচ্ছে না যে—
জানে বকুল নয়, ছেলের বৌরা রোধেছে। তন্ত্ৰাচী ওইভাবেই বলে। বোধ করি সেই চিরাচরিত মেয়েলী প্ৰথাটাই বজায় রাখে। বিকে মেলে বেঁকে শেখায়।
আবার এ আক্ষেপও করে ওঠে, হবেই তো! বাড়ির গিন্নী যদি সংসার ভাসিয়ে দিয়ে খাতাকলম নিয়ে পড়ে থাকে, হবেই নষ্ট-অপচয়, অবিলি, বে-বন্দোবস্ত!
সুবৰ্ণর কানে আসে।
কিন্তু সুবৰ্ণ কানে নেয় না। সব কিছু কানে নেওয়া থেকে বিরত হয়েছে সুবর্ণ, অভিমানশূন্য হবার সাধনা করছে।
অতএব জবাব দেয় না।
সুবৰ্ণলতার তার সংসারের সব প্রশ্নের জবাব তৈরি করছে বসে শেষ আদালতে পেশ করার জন্যে। হয়তো সেই জবাবী বিবৃতির মধ্য থেকে সেই সংসার সুবৰ্ণলতাকে বুঝতে পারবে।
আর সেই বোঝা বুঝতে পারলেই বুঝতে পারবে নিজের ভুল, নিজের বোকামি, নিজের নির্লজতা।
সুবৰ্ণলতার স্মৃতিকথা সুবৰ্ণলতার জবানবন্দী।
সেই মুক্তি দিতে পারছে সুবৰ্ণলতা, মুক্তি দিতে পারছে খাতার কারাগার থেকে আলোভিরা রাজরাস্তায়।
ঈশ্বরের করুণা নেমে এসেছে মানুষের মধ্য দিয়ে।
আজীবনের কল্পনা সফল হতে চললো এবার, আজীবনের স্বপ্ন সফল। এ যেন একটা অলৌকিক কাহিনী। যে কাহিনীতে মন্ত্রবলের মহিমা কীর্তিত হয়। নইলে চিরকালের বাউণ্ডুলে জগু-বটুঠাকুরের হঠাৎ ছাপাখানা খোলার শখ হবে কেন?
ভগবানই সুবৰ্ণলতার জন্যে–
পৃথিবীটাকে হঠাৎ ভারি সুন্দর লাগে সুবর্ণর, ভারি উজ্জ্বল। খুশি-ঝলমলে সকালের আলোয় এই বিবর্ণ হয়ে আসা গোলাপি-রঙা বাড়িটা যেন সোনালী হয়ে ওঠে। নিজের সংসারটাকেও যেন হঠাৎ ভাল লেগে যায়।
এই তো, এই সমস্তই তো সুবৰ্ণলতার নিজের সৃষ্টি, এদের উপর কি বীতশ্রদ্ধ হওয়া যায়? এদের উপর বিরূপ হওয়া সাজে?
এরা যে সুবৰ্ণলতাকে ভালবাসে না, সে ধারণাটা ভুল ধারণা সুবৰ্ণলতার। বাসে বৈকি, শুধু ওদের নিজেদের ধরনে বাসে। তা তাই বাসুক। সুবৰ্ণলতাও চেষ্টা করবে ওদের বুঝতে।
হয়তো জীবনের এই শেষপ্রান্তে এসে জীবনের মানে খুঁজে পাবে সুবৰ্ণ, আর তার মধ্যেই খুঁজে পাবে জীবনের পূর্ণতা।
ক্রমশই যেন প্রত্যাশার দিগন্ত উদ্ভাসিত হতে থাকে নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষ্ণয়।
শুধুই বা ওই জবানবন্দী কেন?
আরও তো লিখেছে সুবৰ্ণলতা, যা শিল্প, যা সৃষ্টি।
যেখানে সুবৰ্ণলতা একক, যেখানে তার ওপর কোনো ওপরওয়ালা নেই। যেখানে থাকবে সুবৰ্ণলতার অস্তিত্বের সম্মান। যেখানে সে বিধাতা।
আঃ, এ কল্পনায় কী অপূর্ব মাদকতা!
এ যেন কিশোরী মেয়ের প্রথম প্রেমে পড়ার অনুভূতি। অনুক্ষণ মনের মধ্যে মোহময় এক সুর গুঞ্জরণ করে। সে সুর রাত্রির তন্দ্রার মধ্যেও আনাগোনা করে।
নিত্য নূতন বই লেখা হচ্ছে, নিত্য নিত্য বই ছাপা হয়ে বেরোচ্ছে সে সব, অবাক হয়ে যাচ্ছে সবাই সুবৰ্ণলতার মহিমা দেখে, আর ভাবছে তাই তো!
আশ্চর্য! আশ্চর্য! কী হাস্যকর ছেলেমানুষটিই করে এসেছে এতদিন সুবর্ণ। R\OO
এই তুচ্ছ সংসারের বিরূপতা আর প্রসন্নতার মধ্যে নিজের মূল্য খুঁজে এসেছে! হিসেব কষেছে লাভ আর ক্ষতির!
অথচ সুবৰ্ণলতার নিজের মুঠোর মধ্যে রয়েছে রাজার ঐশ্বৰ্য্য!
সুবৰ্ণলতার ওই হলুদ পোচফোঁড়নের সংসারখানা নিক না যার খুশি, নিয়ে বরং রেহাই দিক সুবৰ্ণলতাকে। সুবৰ্ণলতার জন্যে থাক এক অনির্বচনীয় মাধুৰ্যলোক।
কী আনন্দ!
কী অনাস্বাদিত সুখস্বাদ!
সুবৰ্ণলতার জীবনখাতার এই অধ্যায়খানি যেন জ্যোতির কণা দিয়ে লেখা।
সুবৰ্ণলতা রান্নাঘরে এসে বলে, ও বড়বৌমা, বল বাছা কী কুটনো হবে? কুটি বসে।
বড়বৌমা শাশুড়ীর এই আলো-ঝলসানো মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে অবাক হয়। তবে প্রকাশ করে না সে বিস্ময়। নরম গলায় বলে, আমি আবার কি বলবো? আপনার যা ইচ্ছে—
বাঃ, তা কেন? তুমি রাধবে— তোমার মনের মত রান্নাটি হওয়াই তো ভাল। বলে। বঁটিটা টেনে নেয়। সুবর্ণ।
