শ্যামাসুন্দরী সুবর্ণর কুণ্ঠিত ভাব দেখে আশ্চর্য হন। বলেন, কি গো বাছা?
বলছিলাম কি—ইয়ে–
থেমে যায় সুবর্ণ।
শ্যামাসুন্দরী সমধিক অবাক হন। সুবৰ্ণলতার এমন কুণ্ঠিত মূর্তিা ও তো সদাই সপ্রতিভা। তা ছাড়া কুণ্ঠার মধ্যে কেমন যেন প্রাথী ভাব! টাকা ধার চাওয়ার ক্ষেত্রেই এমনটা দেখা যায়। কিন্তু সুবৰ্ণলতার ক্ষেত্রে তো সে আশঙ্কা ওঠে না।
তবে?
শ্যামাসুন্দরীর প্রশ্নমুখর দৃষ্টির সামনে একটু অপ্রতিভ হাসি হাসে সুবর্ণ। তারপর আঁচলের তলা থেকে একখানা মলাট বাঁধানো মোটা খাতা বার করে বলে ফেলে, ভাসুর ঠাকুর ছাপাখানা খুলেছেন শুনেছিলাম, তাই একটু শখ হয়েছে, সেই ইয়েতেই আসা। আমি তো আর নিজে মুখে বলতে পারবো না, আপনি যদি বলে দেন!
শ্যামাসুন্দরী বার্ধক্যের চোখে কৌতূহল ফুটিয়ে বলেন, কি জন্যে কি বলবো, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না বৌমা!
সুবৰ্ণলতা মৃদু হাসে, বুঝতে পারবেনও না। তাহলে বলি শুনুন, ছেলেবেলা থেকে আমার একটু লেখার শখ আছে, জীবনভোর সকলের অসাক্ষাতে একটু-আধটু লিখেছি, এই পদ্যটদ্য আর কি। এদানীং গল্পটল্পর ধরনেও কিছু লেখা হয়েছে, তবে ছাপাবার কথা স্বপ্নেও ভাবি নি। ভাসুর ঠাকুর ছাপাখানা খুলেছেন শুনে অবধি মনে উদয় হয়েছে, একখানা বই মতো করে যদি ছাপানো যায়। যা খরচা লাগে আমি দেব, শুধু আগে কেউ যেন জানতে না পারে। একেবারে বই হলে জানবে দেখবে। তা আপনি একটু বলে দেখুন না মামীমা, যদি একটু দেখেন এখন ভাসুরিঠাকুর!
প্রৌঢ় সুবৰ্ণলতার চোখে যেন ভাবাকুল অবোধ কিশোরীর দৃষ্টি।
যে সুবৰ্ণলতা সমুদ্রের স্বপ্ন দেখতো—সে সুবৰ্ণলতা কি আজও মরে নি? কোথাও কোনখানে এতটুকু প্ৰাণ আহরণ করে বেঁচে আছে?… কোথায় আছে সেই অফুরন্ত অগ্নি, যা আজীবন বরফজল নিক্ষেপেও নিভে যায় না?
শ্যামাসুন্দরী তবুও বিস্মিত প্রশ্ন করেন, বই ছাপা হবে? কোথায় সেই বই?
সুবৰ্ণ মুদু হেসে বলে, বই তো পরে। ছাপা হবে এই খাতাটা। এইটা না হয় নিয়ে যান ভাসুর ঠাকুরের কাছে, উনি ঠিক বুঝতে পারবেন।
খাতাখানা হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখে শ্যামাসুন্দরী হতভম্ব গলায় বলেন, এসব লেখা তুমি লিখেছি? এই খাতা-ভর্তি?
ওই তো পাগলামি—, হাসে সুবর্ণ।
নিজের মন থেকে? না কিছু দেখে?
সুবৰ্ণলতা ছেলেমানুষের মত শব্দ করে হেসে ওঠে, নাঃ, দেখে লিখবো কি? তা হলে আর নিজের লেখা হলো কোথায়?
শ্যামাসুন্দরীর বিস্ময় ভাঙে না, তা হ্যাগো মেজবৌমা, এত কথা তোমার মনে মাথায় এলো কি করে?
সুবৰ্ণলতার মুখে আসে, মনে মাথায় আসে, তা লিখতে পারলে এ রকম সহস্ৰখান খাতাতেও কুলোতো না মামীমা। তবে বলে না। সে কথা।
শ্যামাসুন্দরী উঠে যান।
কিছুক্ষণ পরে প্রেসমালিক জগন্নাথচন্দ্র এসে অদূরে দাঁড়ান।
চেহারা প্ৰায় একই রকম আছে, তেমনি আটসাট খাটামুগুরে গড়ন, তেমনি হত্তেলের মত রং, বদলের মধ্যে কিছু চুল পেকেছে।
আগের মতই পরনে একটা লাল ছালটি, গলায় রুদ্রাক্ষ, কপালে রক্তচন্দনের ফোঁটা।
তার মানে এই বেশেই ছাপাখানায় বসেন। তিনি।
এসে দাঁড়িয়ে গলাখ্যাকারি দিয়ে বলেন, মা, জিজ্ঞেস করো তো বৌমাকে, এ হাতের লেখা কার?
ইশারায় উত্তর পেয়ে শ্যামাসুন্দরী মহোৎসাহে বলেন, বললাম তো সবই বৌমার লেখা!
চমৎকার হাতের লেখা তো!
সপ্ৰংশস দৃষ্টিতে খাতার পৃষ্ঠাগুলো উল্টোতে উল্টোতে জগু বলেন, মেয়েছেলেদের হাতের লেখা এমন পাকা! সচরাচর দেখা যায় না। কিসে থেকে নকল করেছেন?
রী বলে ওঠেন, এই দেখো ভূতুড়ে কথা! বললাম যে, এ সমস্ত বৌমা নিজের মন থেকে বানিয়ে বানিয়ে লিখেছে! বই-লিখিয়েরা যেমন লেখে আর কি!
বল কি? এই গদ্য-পদ্য সব?
সব। এখন আবার শ্যামাসুন্দরী জ্ঞানদাত্রী।
জগন্নাথ মহোৎসাহে বলেন, তুমি যে তাজ্জব করে দিলে মা। এতকাল দেখছি, কই এসব তো শুনি নি!
শ্যামাসুন্দরী বলেন, শুনবি কোথা থেকে। মেজবৌমা তো নিজের গুণ জাহির করে বেড়ানো মেয়ে নয়? তোর ছাপাখানার বাত্রা শুনে সাধ হয়েছে, বলছে যা খরচা পড়বে দেবে, তুই শুধু দেখেশুনে–
খরচের কথা আসছে। কোথা থেকে? খরচের কথা! জগু হৈ-হৈ করে ওঠেন, আমার প্রেসে আবার খরচ কি? রেখে দিয়ে যান বৌমা, কালই প্রেসে চড়িয়ে দেব। কিন্তু অবাক হয়ে যাচ্ছি। বৌমার গুণ দেখে। নাঃ, পিসির সংসারের এই মেজবৌমাটি এসেছিলেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। ভগবান দিয়েছেনও তাই ঢেলে মেপে! মনের গুণেই ধন। বহু ভাগ্যে এমন লক্ষ্মী পেয়েছিল পেবো।
২.১৭ কানায় কানায় পূর্ণ মন নিয়ে
কানায় কানায় পূর্ণ মন নিয়ে বাড়ি ফিরলো সুবৰ্ণলতা।
ভাবতে লাগলো। ভগবানের উপর অবিশ্বাস এসে গেলেই বুঝি তিনি এইভাবে আপন করুণা প্ৰকাশ করেন।
মানুষের উপর প্রত্যাশা হারালেই ভগবানের উপর আসে অবিশ্বাস। তবু কোথাও বুঝি কিছু একটা আশা ছিল, তাই দ্বিধাগ্ৰস্ত চিত্ত নিয়ে সেই আশার দরজায় একটুকু করাঘাত করতে গিয়েছিল সুবৰ্ণলতা, রুদ্ধ কপাট খোলে কিনা দেখতে। দেখলো, দু হাট হয়ে খুলে গেল। ভিতরের মালিক সহাস্য অভ্যর্থনায় বললো, এসো এসো! বোসো, জল খাও।
হ্যাঁ, সেই কথাই মনে হয়েছিল সুবৰ্ণলতার।
একথা সেকথার পর আবার মামীমার মাধ্যমে ছাপার খরচার কথাটা তুলেছিল সুবৰ্ণ, সুবৰ্ণলতার জগু-বটুঠাকুর সে প্রস্তাব তুড়ি দিয়ে ওড়ালেন। বললেন, দূর! কাগজের আবার দাম! বস্তা বস্তা কাগজ কেনা আছে আমার। এই তো এখনই তো দু হাজার বর্ণপরিচয় ছাপা হচ্ছে। বৌমা বই লিখেছেন, এটা কি কম আহ্লাদের কথা! ছেপে বার করে বুক ফুলিয়ে বলে বেড়াবো লোককে। কী গুণবতী বৌ আমাদের! বুকটা দশ হাত হয়ে উঠবে।
