যদিও আড়ালে আবড়ালে সবাই বলাবলি করতে লাগলো, সুবোধ কি রকম ভেতর চাপা! এই যে খরচটি করলো, টাকা তোলা ছিল বলেই তো! অথচ কেউ বুঝতে পেরেছে?
সে কথা প্ৰবোধ এসেও মহোৎসাহে বলে, দেখলে তো? চিরকাল দেখিয়ে এসেছেন যেন হাতে কিছু নেই!
সুবৰ্ণ একবার স্থিরদৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে, বেশ তো, হাতের টাকা তো মন্দ কাজে ব্যয় করেন নি, সদ্ব্যয়ই করেছেন! তা তোমার তো হাতে টাকার অভাব নেই, তুমি একটা সৎকাজ কুরু তোমার মায়ের একটা ইচ্ছে পালন কর না? অনেক কাঙালী খাওয়াও না? মার খুব ইচ্ছে ছিল।
প্ৰবোধ সচকিত হয়ে বলে, এ ইচ্ছে। আবার কখন তোমার কানে ধরে বলতে গেলেন মা? তুমি যখন গিয়ে পড়েছিলে, তখন তো বাকরোধ হয়ে গিয়েছিল।
ক্ষীণ একটু হাসলো সুবর্ণ।
বহুকাল পরে হাসলো।
বললো, না, এ ইচ্ছে প্ৰকাশ তখন করেন নি। যখন পুরোদস্তর বাক্যস্রোত ছিল, এ তখনকার কথা। তোমাদের ওখানের জগন্নাথ ঘোষের মা যখন মারা গেলেন, তখন কাঙালী খেয়েছিল মনে আছে? দেখে মা বলেছিলেন, আমি যখন মরবো, আমার ছেলেরা কি এমন করে কাঙালী ভোজন করাবে!
ওঃ, এই কথা! প্ৰবোধ ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। বলে, জ্যান্ত থাকতে জন্মভোর অমন কত কথা বলে মানুষ! সে-সব ইচ্ছে পালন করতে গেলেই হয়েছে আর কি!
তা বেশ। ধরে যদি আমারই ইচ্ছে হয়ে থাকে!
প্ৰবোধ বিশ্বাস করে সেকথা। এটাই ঠিক কথা। তাই বলে, তোমার তো চিরদিনই এই রকম সব আজগুবী ইচ্ছে! শ্ৰাদ্ধ হয়ে গেল। সেখানে, এখন কাঙালী ভোজন হবে এখানে। ওসব ফ্যাচাং তুলো না। অত বাড়াবাড়ি করার দরকার নেই।
তবে থাক! সুবৰ্ণ বলে, দরকার যখন নেই, ভালই হলো, তোমার ছেলেদের সুবিধে হলো। ভবিষ্যতে তাদেরও আর মেলাই বাজে খরচ করতে হবে না। মনে জানবে মা-বাপের শ্ৰাদ্ধার বেশি।
প্ৰবোধ এ ব্যঙ্গে জ্বলে উঠে বলে, ওঃ ঠাট্টা! ভারী একেবারে! আমার মার মরণকালের ইচ্ছে নিয়ে আমি কাতর হলাম না, উনি হচ্ছেন! বলি শাশুড়ীর ওপর ভক্তি উথলে উঠলো যে! এ ভক্তি ছিল কোথায়? চিরটা কাল তো মানুষটাকে হাড়ে-নাড়ে জুলিয়ে পুড়িয়ে খেয়েছ।
সুবৰ্ণ এ অপমানে রেগে ওঠে না, বরং হঠাৎ হেসে উঠে বলে, সত্যি বটে। স্মরণশক্তিটা আমার বড় কম। মনে করিয়ে দিয়ে ভালই করলে।
তারপর উঠে গেল।
সেই ওর ছাতের ঘরের কোটরে গিয়ে বসলো খাতাখানা নিয়ে।
কিন্তু খোতাখানা কি শুধু সুবর্ণর অপচয়ের হিসেবের খাতা?
সুবৰ্ণলতার জীবনের খাতাখানার মতই?
নইলে সুবর্ণর সেই খাতাখানার পাতা উল্টোলেই এই সব কথা চোখে পড়ে কেন?.
…মেয়েমানুষ হয়েও এমন বায়না কেন তোমার সুবৰ্ণ, তুমি সৎ হবে, সুন্দর হবে, মহৎ হবে! ভুলে যাও কেন, মেয়েমানুষ হচ্ছে একটা হাত-পা-বাধা প্ৰাণী! মানুষ নয়, প্রাণী! হাত-পায়ের বাঁধনটা যদি ছিঁড়তে যায়। সে তো হাত-পা-গুলো কেটে বাদ দিয়ে দিয়ে ছিঁড়তে হবে সে বাঁধন!…
কেন রেখা থাকে… তবু বাঁধন ছেঁড়ার সাধনটা চালিয়ে যেতে হবে তাকে। কারণ তাঁর বিধাতা ভারী কৌতুকপ্রিয়। তাই ওই হাত-পা-বাধা প্রাণী।মাত্রগুলোর মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ ঢুকিয়ে দিয়ে বসে থাকেন বুদ্ধি, চেতনা, আত্মা।
২.১৬ বহুদিন পরে মামাশ্বশুর-বাড়িতে
বহুদিন পরে মামাশ্বশুর-বাড়িতে বেড়াতে এল সুবর্ণ।
বড় ছেলে ভানু সম্প্রতি একটা গাড়ি কিনেছে, বড়বৌ বললো, আপনার ছেলে আসুন না মা, তখন বরং যাবেন–
সুবৰ্ণ তবু ভাড়াটে গাড়ি করেই গেল। বললো, ও বাড়িতে বরাবর। ভাড়াটে গাড়ি করেই গেছি বৌমা, জুড়িগাড়ি থাক।
বৌ বিড়বিড় করে বললো, যত্ন আদর না নিলে আর কে দেবে?
সুবৰ্ণ গাড়িতে গিয়ে উঠলো।
শ্যামাসুন্দরী সমাদর করে ডাকলেন, এসো মা, এসো।
বয়েস কম হয় নি, মুক্তকেশীর থেকে কম হলেও তাঁর দাদার স্ত্রী। তবু শক্ত আছেন দিব্যি। এখনো নিজে রোধে খাচ্ছেন, হেঁটে গঙ্গাস্নানে যাচ্ছেন!
অনেকদিন দেখেনি সুবৰ্ণ, দেখে আশ্চর্য হলো।
প্ৰণাম করে পায়ের ধুলো নিল, হয়তো দু অর্থে।
শ্যামাসুন্দরী কুশল প্রশ্ন করতে লাগলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।
ছেলেপুলেরা কেমন আছে? চাপা, চন্নন, পারুল সব ভাল আছে তো? সেই যা তোমার শাশুড়ীর কাজের সময় সকলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হলো!
এটা ওটা উত্তর দিতে দিতে হঠাৎ একসময় বলে বসে সুবর্ণ, ভাসুর ঠাকুর বাড়ি আছেন?
কে? জগা? শ্যামাসুন্দরী মুখ বাকিয়ে বলেন, থাকবেন না তো যাবে আর কোথায়? এখন তো সর্বক্ষণ বাড়িতেই স্থিতি।… আমার কানের মাথা খেতে যে বাড়ির মধ্যে এক ছাপাখানা খুলে বসে আছেন!
সুবৰ্ণলতা এ খবরে অবাক হয় না।
সুবৰ্ণলতা যেন এ খবর জানে।
শুধু সুবৰ্ণলতার মুখটা একটু উজ্জ্বল দেখায়।
বলে, বেশ চলছে ছাপাখানা? ভাল ছাপা হয়?
জানিনে বাছা—, শ্যামাসুন্দরী অগ্রাহ্যাভরে বলেন, রাতদিন শব্দ তো হচ্ছে। বলে নাকি খুব লাভ হচ্ছে। বলে, বয়েসকালে এ বুদ্ধি হলে লাল হয়ে যেতাম।… সাতজন্মে তো রোজগারের চেষ্টা দেখি নি। ওই ফোঁটা কাটতো আর মালা ঘুরাতো। তাছাড়া পাড়ার লোকের জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, রোগ, শোক, দুর্গোৎসব। এইসব নিয়েই ছিল, হঠাৎ এই খেয়াল। মাথায় ঢুকিয়েছে ওই নিতাই। নিজের আখের গোছাতেই বোধ হয় এ প্ররোচনা দিয়েছে। বলে, বাড়িখানা থেকে কিছু উসুল করি. তা তোমার সঙ্গের ওই বিয়ের হাতে আবার অন্ত সব কি বৌমা?
সুবৰ্ণ কুণ্ঠিতভাবে বলে, কিছু না, চারটি ফল, আপনি একটু মুখে দেবেন, ভাসুরাঠাকুর একটু—ইয়ে, আপনাকে আজ একটা কথা বলতে এসেছি মামীমা—
