ভটচার্য বিদায় নিলে সুবল এসে দাঁড়ায়।
বলে, জ্যাঠামশাই, মা একটা কথা বলছেন।
মা!
সুবোধচন্দ্র একটু নড়েচড়ে বসলেন। সুবলের মার আবার বক্তব্য কি!
ঘাটকামান না হওয়া পর্যন্ত প্ৰবোধকে আর সুবৰ্ণলতাকে এ বাড়িতেই থাকতে হয়েছে, পাড়াপ্রতিবেশী জ্ঞাতিগোত্রের এই নির্দেশ।
তাই বকুলকে নিয়ে এ বাড়িতেই রয়েছে সুবর্ণ, ছেলেরা যাওয়া-আসা করছে। এদিকে তো চাঁপা এসেই গেছে, চন্নন পারুল ওরাও আসবে শ্রাদ্ধের দিন।
সে যাক, ওসব ব্যবস্থাপনার মধ্যে সুবোধ নেই। সুবৰ্ণ যে রয়েছে। এ বাড়িতে, তাও ঠিকমত জানে কিনা সন্দেহ। কাজেই মা আপনাকে একটা কথা বলবেন শুনে সন্দিগ্ধ গলায় বলেন, কি কথা!
সুবল মাঝখানে শিখণ্ডিস্বরূপ থাকলেও সুবৰ্ণলতার কণ্ঠটাই স্পষ্ট শোনা গেল, মার চার ছেলে বর্তমান, নাতিরাও অনেকেই কৃতী হয়ে উঠেছে, মার তো বৃষোৎসর্গ হওয়াই উচিত।
সুবোধচন্দ্র অবশ্য তাঁদের বাড়ির মেজবৌকে কোনদিনই লজ্জাশীলা মনে করেন না, কাজেই এই স্পষ্ট কণ্ঠস্বরে খুব একটা অবাক হন না। তবে বোধ করি একটু বিচলিত হন। গম্ভীর গলায় আস্তে বলেন, উচিত সে কথা জানি মেজবৌমা, কিন্তু ক্ষমতা বুঝে কথা। আমার ক্ষমতা কম।
এবারে সুবলের মাধ্যমেই কথা হয়, মা বলছেন, তা হোক আপনি এগোন, আপনার পেছনে সবাই আছে।
আমার পিছনে-, সুবোধচন্দ্রের গলাটা যেন কাঁপা-কোপা আর ভাঙাভাঙা শোনায়, আমার পিছনে কেউ নেই সুবল, শুধু সামনে ভগবান আছেন, এইটুকু তোর মাকে বলে দে বাবা। গতকাল এসব আলোচনা হয়ে গেছে, আমার তিন ভাই-ই সাফ জবাব দিয়ে গেছে, তিরিশ টাকা করে দেবে, তার বেশি দিতে পারবে না। আমার অবস্থাও তদ্রপ। কাজেই ও নিয়ে আর-তোর মাকে বাড়ির মধ্যে যেতে বল সুবল।
এটা অবশ্যই বাক্যে যবনিকা পাতের ইশারা।
তত্ৰাচ সুবৰ্ণলতা যবনিকা পাত করতে দেয় না।
হয়তো প্ৰবোধের এই নীচতলার খবরে এখনো নতুন করে বিস্ময়বোধ করে, তাই কথা বলতে একটু সময় যায়, আর বলে যখন তখন গলায় স্বরটা প্ৰায় বুজে আসার মত লাগে, তবু বলে, সুবল, বল-জ্যাঠামশাই, মার একটা মিনতি রাখতেই হবে।
মিনতি!
রাখতেই হবে!
সুবোধচন্দ্র বিব্রত বোধ করেন।
চিরকেলে পাগলা মানুষটা কি-না-কি আবদার করে বসে!
কে জানে কি সঙ্কল্প নিয়ে এমন তোড়জোড় করে তার দরবারে এসে হাজির হয়েছে! মুহূর্তের মধ্যেই অবশ্য এসব চিন্তা খেলে যায়। পরমুহূর্তে সুবোধের কণ্ঠ থেকে প্রায় হাসির সঙ্গে উচ্চারিত হয়রত্নতই হবে! তোর মার যে এটা সাদা কাগজে সেই করিয়ে নেবার মত ইচ্ছে রে সুবল কি বল শুনি?
মা নিজেই বলছেন—
বলে সুবল সরে দাঁড়ায়।
গুণ্ঠনবতী সুবৰ্ণলতা তার পাশ দিয়ে এসে দাঁড়ায়, আর ছেলেকে এবং ভাসুরকে প্রায় তাজ্জব করে দিয়ে মৃদু চাপা স্বরে বলে ওঠে, সুবল, তুই একটু অন্যত্র যা তো বাবা-
সুবল তুই অন্যত্র যা!
তার মানে ভাসুরের সঙ্গে একা নির্জনে কথা বলতে চায়!
এর চাইতে অসম্ভব অসমসাহসিকতা আর কি হতে পারে?
সুবোধচন্দ্র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, কি যেন বলতে চান। সুবল চলে যায় আস্তে আস্তে, আর সুবৰ্ণ এগিয়ে এসে ভাসুরের পায়ের কাছে কিছু জিনিস ফেলে দিয়ে মৃদু দৃঢ়স্বরে বলে, এগুলো নিতে হবে আপনাকে এই মিনতি। আপনার নিজের বলে মনে করে বেচে দিয়ে ইচ্ছেমত ভাবে খরচ করে। মার কাজ করুন।
সুবোধ যেন সাপের ছোবল খেয়েছেন।
সুবোধ নির্নিমেষ দৃষ্টিতে সেই উজ্জ্বল স্বর্ণখণ্ডগুলির দিকে তাকিয়ে গভীর হাস্যে বলেন, এ তো মিনতি নয়। মেজবৌমা, হুকুম। কিন্তু সে হুকুম পালন করবার ক্ষমতা আমার নেই মা। তুমি আমায় মাপ কর।
গলার মোটা হেলে হার!
হাতের চুড়ির গোছা!
সুবৰ্ণ সেই বস্তুগুলোর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বলে, এ তো শুনেছি স্ত্রীধান, এতে নাকি স্বামীপুতুদের কোনো দাবি থাকে না। তবে আপত্তি কিসের?
সুবোধ এবার আরো ভারী গলায় বলেন, এ তুমি কি বলছো মেজবৌমা! তোমার গায়ের গয়না বেচে মাতৃশ্ৰাদ্ধ করবো। আমি? গরীব বলে কি-
চড়িয়ে ঘুরে বেড়াবে, এটাও তো অনিয়ম!
অনিয়ম!
সুবোধচন্দ্ৰ যেন একটু চমকান, তারপর একটু হেসে বলেন, অনিয়ম তো জগৎ জুড়ে মা, চন্দ্রসূর্যের নিয়মটা আছে বলেই আজো পৃথিবীটা টিকে আছে। কিন্তু সেকথা থাক, তুমি এগুলো উঠিয়ে নিয়ে যাও মা। তুমি যে দিতে এসেছিলে, এতেই তাঁর আত্মার তৃপ্তি হয়ে গেছে।
তাঁর হতে পারে, কিন্তু আমাদেরও তো তৃপ্তি শান্তি হওয়া চাই। আপনার পায়ে পড়ছি, এটুকু আপনাকে করতেই হবে। মনে করুন। এ টাকা আপনার, তা হলেই তো সব চিন্তা মুছে যাবে। মার কুপুত্ৰ ছেলেরা টাকা হাতে থাকতেও নেই বলেছে, সে পাপের প্রায়শ্চিত্তেরও তো দরকার। আমি যাচ্ছি, এ আর আপনি অমত করবেন না। যদি অমত করেন, যদি না নেন, তাহলে বুঝবো আমি পতিত তাই—, গলার স্বরটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় সুবর্ণর। আমি চাই বলে নীচু হয়ে গলায় আঁচল মুড়িয়ে একটি প্ৰণাম রেখে তাড়াতাড়ি উঠে চলে যায় সুবর্ণ, সুবোধকে আর কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে।
সুবোধ হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন।
সুবোধ এখন এই সোনার তালগুলোকে নিয়ে কি করবেন?
তা শেষ পর্যন্ত সেগুলো নিলেন সুবোধচন্দ্র।
সুবৰ্ণলতার ওই রুদ্ধকণ্ঠ হয়ে চলে যাওয়ার মধ্যে তিনি একটা পরম সত্য উপলব্ধি করলেন যেন।
সেই সত্য সব দ্বিধা মুছে দিল বুঝি।
সমারোহ করেই বৃষোৎসর্গ শ্ৰাদ্ধ হলো মুক্তকেশীর।
কে জানে তাঁর আত্মা সত্যই পরিতৃপ্ত হলো কিনা! তবু সুবোধ মনে করলেন হলো। সুবোধের মুখে রইল সেই পরিতৃপ্তির ছাপ।
