মেজবৌমাকে দেখতে চেয়েছেন মুক্তকেশী আর সে খবর জানিয়েছেন। জগতে কত অদ্ভুত ঘটনাই ঘটে!
মুক্তকেশী সুবৰ্ণলতার প্রতিপক্ষ।
মুক্তকেশী সুবৰ্ণলতাকে বহুবিধ যন্ত্রণার স্বাদ যুগিয়ে এসেছেন চিরদিন, তবু মুক্তকেশী সুবৰ্ণকে দেখতে চেয়েছেন শুনে যেন মনটা বিষণ্ণ বেদনাবিধুর হয়ে উঠলো।
হয়তো ব্যাপারটা হাস্যকর, তবু নির্ভেজাল। শক্ৰ যদি শক্তিমান হয়, তার জন্যেও বুঝি মনের কোনোখানে একটা বড় ঠাঁই থাকে। রাবণের মৃত্যুকালে রামের মনস্তত্ত্ব এ সাক্ষ্য দেয়।
বহুকাল হলো এ বাড়িতে আসে নি। সুবর্ণ।
আগে মাঝে মাঝে ভাসুরবি-দ্যাওরঝিদের বিয়ে উপলক্ষে আসা হতো, ইদানীং যেন বিয়ের হুল্লোড়টাও কমে গেছে। তাই আর হয় না।
কিন্তু এসে যে মুক্তগেশীকে সত্যিই একেবারে মৃত্যুশয্যায় দেখতে হবে একথা কে ভেবেছিল? সংবাদদাত্রী তো আশ্বাস দিয়েছিলো-আজি-কালই আর কিছু হচ্ছে না!
কিন্তু হঠাৎ গতরাত্রেই নাকি অকস্মাৎ কেমন বিকল হয়ে গেছেন মুক্তকেশী। মুখ দিয়ে ফেনা কাটছিল, গো গো শব্দ শুনে মল্লিকা তাড়াতাড়ি সবাইকে ডেকেছে। রাত্রে তার হেফাজতেই তো থাকেন মুক্তকেশী।
ডাক শুনে সবাই এসেছে, ছেলেরা শত-সহস্রাবার মা মা ডাক দিয়েছে, মুক্তকেশী শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছেন, সাড়া দিতে পারেননি। সকাল হয়েছে, দুপুর গড়ালো,একই অবস্থা। কবরেজ এসে দরাজ গলায় সুবোধকে বলে গেছেন, আর কি, এবার কোমরে গামছা বাঁধুন।
সুবৰ্ণ এসব জানতো না, সুবর্ণ এমনিই এসেছিল।
গাড়ি থেকে নেমে গলিটুকু হেঁটে আসতেই হাঁপাচ্ছিল সুবর্ণ। এসে বসতেই বিরাজ চোখ বড় বড় করে বলে উঠলো, ওমা এ কী, তোমার এমন চেহারা হয়েছে কেন মেজবৌ?
সুবৰ্ণলতার হাঁপ ছেড়ে ওর কথার উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করলো, মা কেমন আছেন?
আর থাকাথাকি–, বিরাজ আবার কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলে, কবরেজ তো বলে গেল রাত কাটে কিনা!
তা আমাদের ওখানে তো একটা খবরও—
হঠাৎ গলাটা বুজে এল সুবর্ণর।
চুপ করে গেল।
ঘরে যারা ছিল তারা কি একবার ভাবল না, মাছের মায়ের পুত্ৰশোক! অথবা মাছ মরেছে বেড়াল কাঁদে–
তা ভাবলে অসঙ্গতও হবে না।
তবে মুখে কেউ কিছু বলে না।
বিরাজই আবার বলে, দিত খবর, আমায় তো দিয়েছে! কিন্তু মার না হয় যাবার বয়েস, চার ছু কাঁধে চড়ে চলে যাবেন, বলি তোমারও যে যাবার দাখিল চেহারা! অসুখ-বিসুখ কিছু হয়েছে নাকি?
না, অসুখ আর কি!
বলে সুবর্ণ এগিয়ে যায় মুক্তকেশীর দিকে। খুব ধীরে বলে, মা আমায় ডেকেছিলেন?
মুক্তকেশীর চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।
এই সময় হেমাঙ্গিনী এসে ঢুকলেন। থারথার করতে করতে, চীৎকার করে বলে উঠলেন, মুক্ত চললি? আমায় ফেলে রেখে চলে যাবি?
মুক্তকেশী ফ্যালফেলিয়ে তাকালেন।
হেমাঙ্গিনীর কান্নায় উপস্থিত সকলেরও যেন কান্না উথলে এল।
এসময় শ্যামাসুন্দরীও এলেন একটি পিতলের ঘটি হাতে। খুব কাছে এসে বললেন, চন্নামেত্তর খাও ঠাকুরঝি। মা কালীর চন্নামেত্তর।
বোঝা গেল সবাইকে খবর দেওয়া হয়েছে, শুধু প্ৰবোধচন্দ্ৰ বাদে।
সুবৰ্ণলতা নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে।
বোধ করি মনকে মানাতে চেষ্টা করে, এ অবহেলা তার প্রাপ্য পাওনা।
মুক্তকেশীর ভিতরের জ্ঞান লুপ্ত হয়নি। চোখের ইশারায় বোঝালেন বুঝতে পেরেছেন, হাঁ। করবার চেষ্টা করলেন, পারলেন না।
সুবৰ্ণ আর একবার কাছে ঝুঁকে বললো, মা, আমায় কেন ডেকেছিলেন?
মুক্তকেশীর চোখ দিয়ে আবার দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। চেয়ে রইলেন সুবৰ্ণলতার মুখের দিকে। তারপর আস্তে আস্তে ডান হাতটা তুললেন, সুবৰ্ণলতার মাথা অবধি উঠল না হাতটা, স্থলিত হয়ে পড়ে গেল তারই কোলের ওপর..চোখটা বুজে গেল।
ঊনআশী বছরের তীক্ষ্ম তীব্ৰ খোলা চোখ দুটো চিরদিনের জন্যে ছুটি পেলো।
কিন্তুষ্টুটকুৰা অগ্নি কোন কথা জানিয়ে গেল তারা?
২.১৫ বৃষোৎসর্গ
বৃষোৎসর্গ! সুবোধচন্দ্ৰ হাসলেন, অত বড় ফর্দ করে বসবেন না ভটাচাৰ্য মশাই। তেমন রেস্তওলা যজমান যে আপনার আমি নই, সে কথা। আপনিও ভালই জানেন। আমার ওই ষোড়শ পর্যন্তই, ব্যস।
ভটচার্য ক্ষুণ্ণভাবে বলেন, বহু প্রাচীন হয়েছিলেন তিনি, চারকুড়ির কাছে বয়েস হয়েছিল, তাই বলা। তাছাড়া তুমি তেমন উপায়ী না হলেও তাঁর আরও তিন ছেলে রয়েছে রোজগারী, নাতিরাও সব কৃতী হয়ে উঠেছে–
সুবোধচন্দ্র বাধা দিলেন, ওর সবই আমি জানি ভটচায মশাই, তবু আমার যা ক্ষমতা, আমি সেই মতই চলবো।
তুমি জ্যেষ্ঠ, শ্ৰাদ্ধাধিকারী—
সে নিয়মকানুন তো সবই পালন করছি—
তা জানি, তোমার নিষ্ঠাকাষ্ঠা সবই শুনলাম তোমার কন্যার কাছে। এযুগে এতটা আবার সবাই পারে না।
ওকথা থাক ভটচায মশাই, আপনি ওই একটা ষোড়শের ফর্দ দিন।
একটা? ভটচায আহত গলায় বলে ওঠেন, চার ভাই চারটে ষোড়শও করবে না? আর নাতিরা এক-একটা ভুজ্যি—
আমি আমার কথাই বলছি। ভটাচায মশাই, আপনি বুঝতে পারছেন না কেন তাই আশ্চর্য!
ভটচায তবু নাছোড়বান্দা গলায় বলেন, জানে তোমাদের হাঁড়ি ভিন্ন, তৎসত্ত্বেও মাতৃশ্ৰাদ্ধের সময় একত্র হয়ে করাই শাস্ত্রীয় বিধি। যার যা সাধ্য, তুমি বড় তোমার হাতে তুলে দেবে, তুমি সৌষ্ঠব করে-
সুবোধচন্দ্ৰ এবার হেসে ওঠেন।
হেসেই বলেন, শাস্ত্রীয় বিধিটাই জানেন ভট্যচায মশাই, আর একথা জানেন না, ভাগের মা গঙ্গা পায় না! কেন আর বৃথা সময় নষ্ট করছেন? আমার ফর্দটা ঠিক করে দিন, সময় থাকতে—
