দর! তোমার সঙ্গে আবার দরাদরি কিগো, সেজবৌদিদি, আজ নতুন হলে নাকি?
না না ঠাকুরঝি, তুমি আমায় একটু আশ্বাস দাও। পছন্দ করতে ভরসা পাই।
শোনো কথা! তোমার আবার নির্ভরসা! গিরি অবহেলায় বলে, বড়মানুষের গিন্নী, ট্যাকার গোছা ফেলো, কাপড়ের গোছা পছন্দ করো! সাতহাতি আট-হাতি সব রকমই আছে, খুকীদের জন্যে নাও দিকি দু-পাঁচখানা। কই গো খুকীরা—
গিরিবালা তথাপি কাপড় নাড়তে নাড়তে দাম জিজ্ঞেস করে, এবং জবাব পাবার পর অপ্ৰসন্ন গলায় বলে, দেবো না তাই বল! দেবার ইচ্ছে থাকলে এমন দর হাকতে না! বলি ও বাড়ির তিনতিনটে বিয়েতে তো বিস্তর লাভ করেছ। সে হল বড়মানুষের ব্যাপার, এই গরিবের সঙ্গে একটু দয়াধর্ম করে কাজ করো না!
গিরি দরাজ গলায় বলে, তা মিথ্যে বলবো না, অনেক কাপড়-চোপড় নিয়েছে মেজবৌদিদি, তবে মানুষটার প্রাণে যেন সুখ নেই!
গিরিবালা ভিতরের কথার আশায় গলা নামিয়ে চুপিচুপি বলে, ওমা র্যার এত সুখ সম্পত্তি, তার আবার সুখের অভাব!
গিরি বলে, তা একো একো মানুষের অকারণ দুঃখ ডেকে আনা রোগ যে। মেজবৌদিদির তো সে রোগ আছেই। তাছাড়া মনে হলো বৌরা সুবিধের হয়নি—
গিরিবালা যেন জানে না, কথা সৃষ্টি করার এই লীলাই গিরি তাঁতিনীর পদ্ধতি, অথবা কারো ঘরে বৌ সুবিধের না হওয়াটা যেন অসম্ভব ঘটনা, তাই যেন আকাশ থেকে পড়লো।
ওমা সে কি কথা! তবে যে শুনলাম খুব ভালো বৌ হয়েছে!
ওগো দেখতেই ভালো। ওপর ভালো, ভেতরে কালো। তা নইলে ঘরুনী গিন্নী দস্যি মাগী এক্ষুনি বৌদের হাতে সংসার ছেড়ে দেয়া!
ওমা বল কি? তাই বুঝি?
তাই তো— গিরি দুই হাত উল্টে বলে, তবে আর বলছি কি! মাগী নাকি এখন রাতদিন খাতা-কলম নিয়ে সেরেস্তার মতন নেখা নিখছে।
তা এসব কথা বললে কে তোমাকে?
কে আর! মেজদাদাবাবুই রাস্তায় এল সঙ্গে সঙ্গে, নানান দুঃখের গাথা গাইল। বৌরা শ্বশুর বলে তেমন মান্যিমান করছে না, শাউড়ীকে দেখে না, আরো একটা মেয়ে ডাগর হয়ে উঠলো, এই সব!
কথা ক্রমশই গম্ভীর হয়ে আসে, গিরিবালা ইত্যবসরে খান্নতিনেক শাড়ি পছন্দ করে ফেলে এবং বাকির প্রশ্নও ওঠে না। তবে ও বাড়ির মেজবৌদিদির কাছেও যে ধারে কারবার করতে হয় না, সেই হুলটুকু ফুটিয়ে বোঁচকা গোটায় গিরি।
এই সময় ঘর থেকে মুক্তকেশীর ভাঙা-ভাঙা কণ্ঠস্বর শোনা যায়, গিরি এসেছিস নাকি? অ গিরি!… সেই থেকে গলা পাচ্ছি মনে হচ্ছে, এদিকপানে উঁকিও দিচ্ছিস না দেখছি!
ওই হলো জ্বালা–গিরি খাদের গলায় বিরক্তিটা প্ৰকাশ করে গলা তোলে, এই যাই গো খুড়ি, এখানে সেজবৌদিদি কাপড় কিনলো পাঁচখানা, তাই—
পাঁচখানা! পাঁচখানা কাপড় কিনলো। সেজবৌমা! তা কিনবে বৈকি! সোয়ামীর পয়সা হয়েছে—
মরণ বুড়ী! বলে গিরি ও-ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, আর তৎক্ষণাৎ তার কাংস্যকণ্ঠ ধ্বনিত হয়, কী সববোনাশ, এ কী হাল হয়েছে তোমার খুড়ি! ঐ্যা, এ যে মড়িপোড়ার ঘাটে যাবার চ্যাহারা! বলি কবরেজ বদ্যি দেখাচ্ছে বেটা বেটার বৌ?
এই।
এই হচ্ছে গিরির নিজস্ব ভঙ্গী। আর তাই সবাই গিরিকে ভয় করে।
গিরি যে অন্তঃপুরের বার্তা রাখে। তার বাড়া ভয়ঙ্কর আর কি আছে?
মুক্তকেশীর ছেলে, ছেলের বৌরা যে দেখছে না, এখন রটিয়ে বেড়াবে না। সে? তাই গিরিবালাও তাড়াতাড়ি শাশুড়ীর ঘরে এসে ঢোকে।
মুক্তকেশী নীচু গলায় কিছু একটা বলছিলেন, বৌকে ঢুকতে দেখে বেজার মুখে চুপ করেন। শুধু চোখের ইশারায় কি যেন বুঝিয়ে বিদায় সম্ভাষণ করেন।
তা গিরি তাঁতিনী ইশারার মান রাখে।
পরদিনই এ বাড়িতে এসে হাজির হয়।
এবং সাড়ম্বরে ঘোষণা করে, কাপড় গছাতে আসিনি গো মেজবৌদিদি, এসেছি। একটা বাত্রা নিয়ে।
সুবৰ্ণলতা বেরিয়ে আসে, প্রশ্ন করে না, শুধু সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকায়।
গিরি বলে ওঠে, বলি বুড়ী শাউড়ীর খবর নাওনী কতদিন?
সুবৰ্ণ অবাক গলায় বলে, কেন? ইনি তো মাঝে মাঝেই-
হ্যাঁ, তা শুনলাম। গিরি টিপে টিপে বলে, মেজদাদাবাবু পেরায় পেরায় যায়! তবে বেটা ছেলের চোখ কি তেমন টের পায়! বুড়ীর তো দেখলাম শেষ অবস্থা।
তার মানে?
মানে আর কি, রক্ত অতিসার। গিরি যেন যুদ্ধজয়ের ভঙ্গী নেয়, ও আর বেশিদিন নয়। আর মরতে তো একদিন হবে গো! চেরকাল কি থাকবে? বয়সের তো গাছ-পাথর নেই, কোন না চার কুড়ি পেরিয়েছে। তা আমায় মিনুতি করে বললে, মেজবৌমাকে একবার আসতে বলিস গিরি, আর আসবার সময় নুকিয়ে পাকা দেখে দুটো কাশীর প্যােয়রা আনতে বলিস।
পেয়ারা! সুবর্ণ বলে, রক্ত-অতিসার বললে না?
আরে বাবা, হলো তো বয়েই গেল। বলি খাওয়ায় সাবধান করে শাউড়ীকে আরো বাঁচিয়ে রাখতে সাধা! না। তাই পারবে? মহাপ্ৰাণীর খেতে ইচ্ছে হয়েছে, দেওয়াই দরকার। বাঁচবার হলে ওতেই বেঁচে থাকবে।
সুবৰ্ণ অবাক হয়ে তাকায়।
সুবৰ্ণ ভাবে, এরা কত সহজে সমস্যার সমাধান করে ফেলতে সক্ষম! রাখে কেষ্ট আর মারে কেষ্টর তথ্যে এরাই প্রকৃত বিশ্বাসী।
সুবৰ্ণর ভাবার অবসরে গিরি। আর একবার বলে, তা প্যায়রা নে যাও আর না যাও, যেও একবার! বুড়ী মেজবৌমা মেজবৌমা করে হামলাচ্ছে!
যাবো, কালই যাবো!
গিরি হৃষ্টচিত্তে বলে, অবিশ্যি আজই একটা কিছু ঘটে যাবে তা বলছি না। তবে এ যাত্রা যে আর উঠবে না বুড়ী, তা মালুম হচ্ছে।
গিরি চলে যায়, সুবর্ণ কেমন অপরাধীর মত বসে থাকে। বাস্তবিক, বড় অন্যায় হয়ে গেছে। বহুদিন যাওয়া হয়নি বটে। সেই কতদিন যেন আগে নিজেই এসেছিলেন মুক্তকেশী, সেই শেষ দেখা।
