সুবৰ্ণ কি সেই পরম সৌভাগ্যকে পরম আনন্দে নিয়েছিল?
সে ইতিহাস কি লেখার?
লিখে প্ৰকাশ করবার?
কলম হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ভেবেছে সুবর্ণ, তারপর আস্তে আস্তে কলম নামিয়ে রেখেছে।
তারপর জয়াবতীর কথা দিয়েই শুরু করেছে।
জয়াবতী বলতো, গোড়ায় গোড়ায় ভয় করে রে, তারপর সয়ে যায়। আর দেখ এ সংসারে ওই লোকটাই তো একমাত্র আপনার লোক, ওর জন্যেই তাই প্ৰাণটা পড়ে থাকে। দেখিস তোরও হবে।
সুবৰ্ণ বলতো, আহা রে, তোমার বরটির মতন কিনা?
সুবৰ্ণর সেই ছেলেমানুষ ভাসুরের উপর শ্রদ্ধা ছিল, ভালবাসা ছিল, সমীহ ছিল, জয়াবতীর সঙ্গে সখীত্বের সূত্রে ঠিক ভাসুরও ভাবতো না যেন, বান্ধবীর বর হিসেবেই ভাবতো!
সুবৰ্ণরা যতদিন সেই পুরানো বাড়িতে ছিল, জীবনের নীরেট দেওয়ালে এই একটা ঘুলঘুলি ছিল তার, কিন্তু সে ঘুলঘুলিও বন্ধ হয়ে গেল।
ভাসুরপো আর দ্যাওরদের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি মামলাবাজি করে শেষ পর্যন্ত বাড়ির অংশের টাকা ধরে নিয়ে আলাদা বাড়ি ফাদলেন মুক্তকেশী।
জয়াবতীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেল সুবৰ্ণলতার।
অনেক অনেক দিন পরে আবার সে পথ খুলেছিল সুবৰ্ণলতা, কিন্তু তখন আর সেই আনন্দময়ী জয়াবতীর দেখা মেলে নি।
জয়াবতী তখন তার সাদা সিঁথিটার লজ্জায় মুখ তুলতো না, মুখ খুলতো না।
তবু আজীবন যোগসূত্র আছে। বাইরের না হোক হৃদয়ের।
তাই সুবৰ্ণলতার স্মৃতিকথা শুরু হলো সেই ঘুলঘুলি পথে আসা একমুঠো আলোর কাহিনী নিয়ে।
জয়াদি ঘুরে-ফিরে কেবল বরের কথা বলে। বর কি রকম দুষ্টুমি করে রাগায়, কেমন এক-এক সময় বৌয়ের দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে বৌকে বড়দের বকুনি থেকে বাঁচায়, আবার জয়াদির বাপের বাড়ি যাবার কথা উঠলেই কেমন মুখভারী করে বেড়ায়, কথা বলে না, এই সব।
ওর সঙ্গে আমার কোনটাই মেলে না।
আমার বাপের বাড়ি বলতে কিছু নেই। আর দোষ ঢাকা? বরং ঠিক উল্টো। মায়ের কাছে ভালো ছেলে নাম নেবার তালে আমার বর কেবল আমার দোষ জাহির করে বেড়ায়! দেখে তো মা ওতেই সব থেকে সন্তুষ্ট হন।
তা বেশ, করো তাই।
মায়ের সুয়ো হও।
কিন্তু সেই মানুষই যখন আবার বৌকে আদর করতে আসে? রাগে সর্বশরীর জ্বলে যায় না? আদরণ আদর না হাতি! ইচ্ছে হয় ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলে যাই! নয়তো চলে যাই ছাতে! ঠাণ্ডা হাওয়ায় পড়ে থাকি একলা!
উঃ, কী শাস্তি, কী শাস্তি!
আচ্ছা জয়াদির বরও কি এইরকম?
তাই কখনও হতে পারে? হলে জয়াদি আমন আহ্লাদে ভাসে কি করে? আমার নিশ্চিত বিশ্বাস ওর বর সভ্য ভদ্ৰ ভালো।
হলদে হয়ে যাওয়া পুরনো খাতার একটা পাতায় এইটুকু লেখা ছিল, সেই লেখার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিল সুবৰ্ণ, কী বয়েস ছিল ওই মেয়েটার? অথচ সে কথা কেউ ভাবেনি। বরং শাশুড়ীর বান্ধবীরা এসে ফিসফিস করে কথা কয়েছেন, আর তারপর গালে হাত দিয়ে বলেছেন, ওমা তাই নাকি? বৌ তা হলে হুড়কো? তা ছেলের বিয়ে দিয়ে হলো ভাল তোমার!
মেয়েরাই ছেলেদের শক্ৰ।
গৃহিণী মেয়েরা যদি এতটুকু সহানুভূতিশীল হতো, হতো এতটুকু মমতাময়ী, হয়তো সমাজের চেহারা এমন হতো না। তা হয় না, তারা ওই অত্যাচারী পুরুষসমাজের সাহায্যই করে। যে পুরুষেরা সমাজ-সৌধ গঠনের কালে মেয়ে জাতটাকে ইট পাটকেল চুনসুরকি ছাড়া কিছু ভাবে না। হ্যাঁ, গাঁথুনির কাজে যখন যেমন প্রয়োজন, তখন সেই ভাবেই ব্যবহার।
বেওয়ারিশ বিধবা মেয়েগুলোর দায়দায়িত্ব কে নেয়, তাদের ভাত-কাপড়ের ভার! মারো তাদের জ্যান্ত পুড়িয়ে, মিটে যাক সমস্যা!
দেশে মেয়ের সংখ্যা বেশী, পুরুষের সংখ্যা কম। করুক এক-একটা পুরুষ গণ্ডা গণ্ডা বিয়ে, ঘুচুক সমস্যা। হয়তো এই দেশেই আবার কালে-ভবিষ্যতে এমন দিন আসবে যে বদলে যাবে পালা, তখন হয়তো ওই সমাজপতিরাই নির্দেশ দেবে… সব মেয়ে দ্ৰৌপদী হও সেটাই মহাপুণ্য।
একদা বাল্যবিবাহের প্রয়োজন ছিল, তাই মেয়ের বাপের কাছে প্রলোভন বিছোনো ছিল, কন্যাদান করে নাকি তারা পৃথিবীদানের ফল পাবে, পাবে গৌরীন্দানের … বিপরীত চোদ্দপুরুষ নরকস্ত?
অর্থসমস্যা আর অন্নসমস্যার চাপে কন্যাদানের পুণ্যলাভের সম্পূহা মুছে আসছে সমাজের। অতএব এখন আর চোঁদপুরুষ নরকস্থ হচ্ছে না। হয়তো বা এমন দিন আসবে যেদিন এই সমাজই বলবে, বাল্যবিবাহ কদাচার, বাল্যবিবাহ মহাপাপ।
কোথায় কোন দেশে নাকি খাদ্যসমস্যা সমাধান করতে মেয়ে জন্মালেই তাকে মেরে ফেলে, পাছে তারা দেশে মানুষ বাড়ায়। আবার এদেশে বাজা হওয়া এক মস্ত অপরাধ, শতপুত্রের জননী হতে উৎসাহ নেওয়া হয় মেয়েদের। কে জানে আবার পালাবদল হলে এই দেশেই বলবে কিনা বহুপুত্রবতীকে ফাঁসিতে লটকাও!
মেয়েদের নিয়েই যত ভাঙচুর।
অথচ এমন কথার কৌশল চতুর পুরুষজাতটার যে, মেয়েগুলো ভাববে, এই ঠিক ধর্ম! এতেই আমার ইহ-পরকালের উন্নতি!
পতি পরম গুরু!
স্বামীর বাড়া দেবতা নেই!
ধোঁকাবাজি! ধাপ্লাবাজি!
কিন্তু কতকাল আর চলবে এসব? চোখ কি ফুটবে না মেয়েমানুষের?
কে জানে, হয়তো ফুটবে না! অথবা ফুটলে ওই চতুর জাতটা নতুন আর এক চালের আশ্রয় নেবে। হয়তো দেহিপদপল্লবমুদারমের বাণী শুনিয়ে শুনিয়েই মেয়েদের ওই ঘানিগাছেই ঘুরিয়ে নোবে!
বোকা, বোকা নীরেট বোকা এই জাতটা, তাই টের পায় না, অহরহ তাকে নিয়ে কী ভাঙচুর চলছে!
ভাবছে, আহা আমি কী মূল্যবান। আমায় ভালবাসছে, আমায় পুজ্যি করছে, আমায় সাজাচ্ছে।
আমার দেহটা যে ওর সোনা মজুতের সিন্দুক তা ভাবি না, আমার সাজসজ্জা যে ওর ঐশ্বর্যের বিজ্ঞাপন তা খেয়াল করি না, আমি গহনা-কাপড়ে লুব্ধ হই, ভালবাসার প্রকাশে মোহিত হই। ছিছি। সাধে বলছি। একের নম্বরের বোকা!
২.১৪ গিরি তাঁতিনী এসেছে
গিরি তাঁতিনী এসেছে তাঁতের শাড়ির বোঁচকা নিয়ে। ভালো ভালো সিমলে ফরাসডাঙার শাড়ি নিয়ে গোরস্তর বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো কাজ গিরির। উত্তর কলকাতা থেকে মধ্য কলকাতা পর্যন্ত সর্বত্র তার অবাধ গতি। সকলের অন্তঃপুরের খবর তার জানা।
