সুবৰ্ণ হাসে, তা ভূতও তো পরকালের চিন্তা করে!
তারপর হাসি রেখে বলে, না ঠাট্টা নয়, এবার তাড়াতাড়ি করা দরকার!
সুবৰ্ণ কি ওর মার ওপর শোধ নিচ্ছে?
সুবৰ্ণ কি রাত্রির অন্ধকারে বিনিদ্ৰ শয্যা ছেড়ে বারান্দায় বেরিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনো এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে উদ্দেশ করে বলে, ঠিক হচ্ছে তো? বল! একেই পূর্ণতা বলে? বেশ তো হোক! শুধু আমার সারা জীবনের অন্তর ইতিহাসের কথা লিখব। আমি বসে বসে।… লিখেছি কখনো কখনো, টুকরো টুকরো, বিচ্ছিন্ন।… আস্ত করে ভাল করে লিখবো। যারা আমার শুধু বাইরেটাই দেখেছে আর ধিক্কার দিয়েছে, আমার সেই স্মৃতিকথার ভিতর দিয়েই তাদের—না, মুখের কথায় কখনো কাউকে কিছু বোঝাতে পারি নি। আমি-আমার অভিমান, আমার আবেগ, আমার অসহিষ্ণুতা, আমার চেষ্টাকে পণ্ড করেছে। আমার খাতা-কলম। এবার সহায় হোক আমার।
কে জানে বলে কিনা, কি বলে আর না বলে।
পাগল মানুষটার কথা বাদ দাও। তবে দেখা গেল সুবৰ্ণলতার সেই গোপালীরঙা দোতলার ছাতে বারে বারে তিনবার হোগলা ছাওয়া হল, সুবৰ্ণলতার বাড়ির কাছাকাছি ডাস্টবিনে কলাপাতা আর মাটির গেলাস খুরির সমারোহ লাগল এক এক ক্ষেপে দু-তিনদিন ধরে।
তারপর আদি অন্তকাল যা হয়ে আসছে তারই পুনরাভিনয় দেখা গেল ও-বাড়ির দরজায়।
কনকাঞ্জলির একথালা চালে আজীবনের ভাত-কাপড়ের ঋণ শোধ করে দিয়ে মেয়ে বিদায় হলো আর এক সংসারের ভাত-কাপড়ে পুষ্ট হতে, আর জলের ধারা মাড়িয়ে এসে দুধে-আলতার পাথরে বৌ দাঁড়ালো এ সংসারের অন্নজলে দাবি জানাতে।
দুটো দৃশ্যেই অবশ্য শাঁখ বাজলো, উলু পড়লো, বরণডালা সাজানো হলো, শুধু ভিতরের সুরের পার্থক্যটুকু ধরা পড়লো সানাইয়ের সুরে। সানাইওলারা জানে কখন আবাহনের সুর বাজাতে হয়, আর কখন বিসর্জনের।
তা সুবৰ্ণলতার তো এবারে একটু ছুটি পেতে পারে? বৌরা সেকালের মত কচি মেয়ে নয়, ডাগর-ডোগর মেয়ে, তাই বৌরা ধুলো-পায়ে ঘরবসতি করে দু মাস পরেই ঘুরে এসে শ্বশুরঘর করতে লেগেছে। পারুল চলে গেছে তার নতুন ঘরে, আর অবহেলিত বকুল কখন কোন ফাঁকে তার খেলাঘরের ধুলো ঝেড়ে নিঃশব্দে পারুলের জায়গায় ভর্তি হয়ে গেছে।
এখন সুবৰ্ণ না দেখলেও অনেক কাজ সুশৃঙ্খলে হয়ে যাচ্ছে। এখন বৌরা সব সময়েই বলছে, আপনি আবার কেন করতে এলেন মা, আমাদের বলুন না কি করতে হবে।
অতএব সুবর্ণার তার খাতার পাতায় কলমের আকিবুকি কাটবার অবকাশ জুটেছে।
কিন্তু কোনখান থেকে শুরু হবে সেই স্মৃতিকথা? আর সেটা কোন ধারায় প্রবাহিত হয়ে আসবে সুবৰ্ণলতার জীবনের সমাপ্তি-সমুদ্রে?…
প্রথম যেদিন মুক্তকেশীর শক্ত বেড়ার মধ্যে এসে পড়লো সুবৰ্ণ নামের একটা সর্বহারা বালিকা মেয়ে, সেই দিনটাই কি স্মৃতিকথার প্রথম পৃষ্ঠায় ঠাঁই পাবে?
কিন্তু প্রতিটি দিনের ইতিহাস কি লেখা যায়? প্রতিটি অনুভূতির?
তাছাড়া–
মুক্তকেশী যে সেই ক্ৰন্দনাকুল মেয়েটার একটা নড়া ধরে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে যেতে বলেছিলেন, ঢের হয়েছে, আর ঠাট করে কাঁদতে হবে না, কান্না থামাও দিকি? মুখ-চোখের চেহারা হয়েছে দেখ না, মা তো তোমার মরে নি বাছা, এত ইয়ে কিসের? এইটা দিয়েই শুরু করবে, না সেই যখন গিন্নীরা এদিক সরে গেলে একটি প্রায় কাছাকাছি বয়সের বৌ পা টিপে টিপে এসে ফিসফিস করে বলেছিল, আমি তোমার বড় জা হই, বুঝলে? তোমার শাশুড়ীর ভাসুরপো-বৌ। উঠোনের মাঝখানে যে পাঁচিল দেখছো, তার ওদিকটা আমাদের। আসতে দেয় না, এই বিয়ে-বাড়ির ছুতোয় আসার হুকুম মিলেছে। তা একটা পথ আছে—বলে হদিস দিয়েছিল সিঁড়ির ঘুলঘুলি দিয়ে কি ভাবে যোগাযোগ হতে পারে।
ছাদের সিঁড়ির সেই ঘুলঘুলি পর্যন্ত চোখ পোছত না তখন সুবর্ণর, তাই ঠিক তার নীচেটায়, দুখানা ইট এনে পেতেছিল। তার উপর দাঁড়িয়ে চার চোখের মিলন হতো। সেই ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে আদানপ্ৰদান হতো শুধু হৃদয়ে নয়, রীতিমত সারালো বস্তুরও।
কুলের আচার, আমের মোরব্বা, মাখা তেঁতুল, কয়েৎবেল, ফুলুরি, রসবড়া অনেক কিছুই। বলা বাহুল্য নিজের ভাগের থেকে এবং প্রায়শই খেতে খেতে তুলে রাখা। সুপুরি মশলা পান পর্যন্ত।
সাবেকি বাড়ির সেই ভাঙা দেওয়ালের অন্তরালে যে বছরগুলো কাটিয়েছিল সুবৰ্ণ, তার মধ্যে মরুভূমিতে জলাশয়ের মত ছিল ওই সখীত্ব। আর একটু যখন বয়েস হয়েছে, তখন আদান-প্রদানের মাধ্যমটা আর কুলের আচারের মধ্যেই সীমিত থাকে নি, ঘুলঘুলির মাঝখানের একখানা ইট ঠিকে ঠুকে সরিয়ে ফেলে। পথটাকে প্রশস্ত করে নিয়ে সেই পথে পাচার হতো বই।
না, সুবৰ্ণর দিক থেকে কিছু দেবার ছিল না। ওর কাজ শুধু ফেরত দেওয়া!
যোগান দিত। জয়াবতী।
মুক্তকেশীর ভাসুরপো-বৌ।
তার বর মুক্তকেশীর ছেলেদের মত নয়। সে সভ্য, মার্জিত, উদার। তার বর বৌকে বই এনে এনে পড়াতো, যাতে বৌয়ের চোখ-কান একটু ফোটে।
বলেছিল। তাই জয়াবতী।
বলেছিল, দিনের বেলা সবাইয়ের সামনে তো পড়তে পারি না, লুকিয়ে রাত্তিরে। তুই বই পড়তে ভালবাসিস শুনে, ও তো আর একটা লাইব্রেরীতে ভর্তি হয়েই গেছে। হেসে বলেছে, তোমাদের সেই ঘুলঘুলি-পথেই পাচার কোরো।
তার। আর সেই গল্পেই তার উৎসাহ।
জয়াবতীর মুখে বরের গল্প শুনে শুনে স্পন্দিত হতো সুবর্ণ, আর ভাবতো, আশ্চর্য এরা একই বাড়ির!
বিয়ের পর একটা বছর অবশ্য কড়াকড়িতে রাখা হয়েছিল সুবৰ্ণকে, বৌকে নিজের কাছে নিয়ে শুতেন মুক্তকেশী। বাপেরবাড়ির বালাই তো নেই, কাজেই ঘরবসতের প্রশ্নও নেই। নচেৎ একটা বছর তো সেখানেই থাকার কথা। কিন্তু এক বছর পরে যখন সুবৰ্ণ সেই পরম অধিকার পেল?…রাতের অধিকার!
