সরে গেল সামনে থেকে, পায়চারি করতে লাগলো। একটা জ্বালোভরা গলার আক্ষেপ শোনা গেল, এইভাবে জীবনের অপচয় ঘটে, এইভাবে এই হতভাগা দেশের কত মহৎ বস্তু ধ্বংস হয়! এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে একদিন সমাজকে।
না, অম্বিকাকে বিয়ে দিয়ে সংসারী করবার সাধ আর মিটলো না সুবালার। অম্বিকা পায়ে হেঁটে ভারত ভ্ৰমণ করতে বেরোলো। সুবালা বুঝতে পারছে, মুখে ও যতই বলুক, এই ভারতবর্ষটাকে একবার দেখতে চাই, দেখতে চাই বাংলা দেশের মত হতভাগা দেশ আর কোথাও আছে কিনা, তবু বুঝতে পারছে সুবালা, সেসব দেখেশুনে ফিরে আর আসছে না। ছন্নছাড়া ভবঘুরেই হয়ে যাবে!
ওর মা-বাপ থাকলে জীবনটাকে নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলতে পারতো না ও।
অমূল্যের চোখটাও লালচে হয়ে উঠেছিল।
ভারী ভারী গলায় বলেছিল, ওটা তোমার ভুল ধারণা! ওর মা থাকলে যে তোমার থেকে বেশি ভালবাসতে পারতো, একথা আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু তা তো নয়, মায়ার বাঁধন সবাইকে বাধতে পারে না! বুদ্ধদেবের কি মা-বাপ ছিল না? নদীয়ার নিমাইয়ের ছিল না। মা, বৌ? আসলে এই জগতের অবিচার-অত্যাচার দুঃখ-দুৰ্দশা দেখে যাদের প্রাণ কাদে, তারা পাঁচজনের মতন খেয়ে শুয়ে দিন কাটাতে পারে না। ঘরে তিষ্ঠোনো দায় হয় তাদের। মা-বাপও বেঁধে রাখতে পারে না, স্ত্রী-পুত্ৰও বেঁধে রাখতে পারে না। তবু ভালই হল যে একটা পরের মেয়ে গলায় গেথে দেওয়া হয় নি। ওর!
দেশ দেশ, স্বাধীন পরাধীন, এই সব করেই একটি হলো ওর— সুবালা চোখের জল মুছতে মুছতে বলে, এই গায়েই জন্মালো, এই তোমাদের বংশেই বড় হলো, কোথা থেকে যে ওসব চিন্তা মাথায় ঢুকলো, ভগবান জানেন।
তাছাড়া আর কি বলবে সুবালা?
মানুষের জানার সীমানা ছাড়ালেই বলে ভগবান জানেন। একা সুবালা কেন, সবাই বলে। আর খুব যখন কষ্ট হয়, তখন ভগবানের বিচারের দোষ দেয়। সুবালাও দিল।
আর তার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ মুছতে মুছতে ওই ছন্নছাড়ার যাত্রাকালে জোর করে সঙ্গে দিয়ে দিল একগাদা চিড়ের নাড়ু, তিলপাটালী-নারকেলের গজা! যা সব একদা অম্বিকার বড় প্রিয় ছিল।
অম্বিকা মুখে খুব উৎসাহ দেখায়। বলে, বাঃ বাঃ! চমৎকার! পথে পথে ঘুরবো, কোথায় কি জুটবে কে জানে, যেদিন কোথাও কিছু না জুটবে ওইগুলি বার করবো, আর আপনার জয়গান করতে করতে খাবো!
থাক, আর আমার জয়গান করতে হবে না। আমার ওপর যে তোমার কত মায়া আছে তা বোঝাই গেছে।
বুঝে ফেলেছেন তো? বাঁচা গেল! অম্বিকা হাসে। তারপর বলে, রামকৃষ্ণ পরমহংসের সবচেয়ে বড় ভক্ত বিবেকানন্দের নাম শুনেছেন? এক সময় তিনি ঘুরছিলেন পথে পথে, হাতে এক কপর্দকও নেই, মনের জোর করে বললেন, দেখি আমার চেষ্টা ছাড়াই খাদ্য আসে। কিনা! এসে গেল। আশ্চর্য উপায়ে এসে গেল! একটা মিষ্টির দোকানের দোকানী স্বপ্ন দেখলো অমুক জায়গায় এক উপবাসী সাধু এসে বসে আছেন, খাওয়াগে যা তাকে চৰ্য্যচোষ্য লেহ্য পেয়। কাজেই ঠিক করেছি, তেমন অসুবিধেয় পড়লে সাধু বনে যাব!
জোর করে টেনে টেনে হাসে।
সুবালা রেগে উঠে বলে, আহা, সাধু বনে যাবে! তুমিই না বল দেশের ওই গেরুয়াধারীরাই হচ্ছে সর্বনামের গোড়া। ওরাই জগৎ মিথ্যে না কি বলে বলে দেশের লোকগুলোকে কুড়ের বাদশা করে রেখে দিয়েছে! সবাই পরকালের চিন্তাতেই ব্যস্ত, ইহকালের কথা ভাবে না!
বলি, বলবোও। তবে এক-একজনকে দেখলে ধারণা পালটে যায়। যাক আপনি মন খারাপ করবেন না। আমাদের ধর্মের দেশে হরিবোল বললেই অন্ন মেলে!
তাই তো, ভিক্ষে মেগেই যে খাবে তুমি, সুবালা রেগে বলে, তাই ভিটে জমি সর্বস্ব বিক্কিরী করে দিলে!
ওই, ওটাই হচ্ছে সব চেয়ে দুশ্চিন্তার। যে মানুষ ভিটেমাটি বেচে চলে যায় সে কি আবার ফিরে আসে?
অথচ কটা টাকাই বা পেলো?
সুবালার যদি টাকা থাকতো, নিশ্চয় দিয়ে দিতো। বলতো, দেশ বেড়াবার জন্যে ভিটে বেচবে তুমি, আর তাই আমি দেখবো বসে বসে?… কিন্তু ভগবান মেরেছেন সুবালাকে!
অমূল্য সঙ্গে গেল খানিকটা এগিয়ে দিতে।
সুবালাও এলো গরুর গাড়ির সঙ্গে যতটা যাওয়া যায়। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে দেখতে লাগলো যতদূর পর্যন্ত দেখা যায়।
অনেকক্ষণ পরে যখন উড়ন্ত ধুলোও নিথর হয়ে গেল তখন ফিরে এল, একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আপনমনে বললো, বেটা ছেলে, কোনো বন্ধন নেই, বিয়ে করবো না তো করবো না। ঘর ছেড়ে চলে যাবো তো চলে যাবো! ব্যস! নিন্দের কিছু নেই। পোড়া মেয়েমানুষের সকল পথ বন্ধ! আমাদের মেজবেঁটা যদি বেটা ছেলে হতো, সেও বোধ হয় এই রকম হতো। বিয়ে করতো না সংসারে থাকতো না। মেয়েমানুষ, বন্দীজাত, খাঁচার মধ্যে ঝটপাটানি সার!
২.১৩ ঝটপটানি কি আছে আর
কিন্তু ঝটপটানি কি আছে আর?
সমস্ত বাটপটানি থামিয়ে ফেলে একেবারে তো নিথর হয়ে গেছে সুবালার মেজবৌ। ও যেন এইবার সহসা পণ করেছে, এবার ও সাধারণ হবে। যেমন সাধারণ তার আর তিনটে জা, তার ননদেরা, পাড়াপাড়শী আরো সবাই।
অপ্ৰতিবাদে কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম মেনে নিয়ে করছে সংসার।
আর ইচ্ছা যদি প্রকাশই করে তো সেটা হবে সাধারণের ইচ্ছা। তাই সুবৰ্ণ তার স্বামীকে তাক লাগিয়ে দিয়ে একদিন ইচ্ছে প্ৰকাশ করলো, পারুলের জন্যে একটা পাত্র দেখো, এই শ্রাবণেই যাতে বিয়েটা হয়ে যায়। তারপর আঘাণে ভানু-কানু দুজনের একসঙ্গে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা—
প্ৰবোধ অবাক হয়ে তাকায়।
তারপর বলে, ভূতের মুখে রামনাম! তোমার মুখে ছেলেমেয়ের কথা?
