শুধু আশা করিতে ইচ্ছা হয়, ভবিষ্যৎ কালের সেই আলোকোজ্জ্বল দিনের মেয়েরা আজকের এই অন্ধকার দিনের মেয়েদের অবস্থা চিন্তা করিতে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিতেছে, আজকের দিনের মেয়েদের অবস্থা চিন্তা করিতে একবিন্দু অশ্রুবিসর্জন করিতেছে, আজ যাহারা যুদ্ধ করিতে করিতে প্ৰাণপাত করিল, তাহাদের দিকে একটু সশ্রদ্ধ দৃষ্টিপাত করিতেছে।
মা সুবৰ্ণ, এসব কথা না লিখিয়া যদি লিখিতাম— সুবৰ্ণ, এ যাবৎকোল প্রতিনিয়ত আমি তোমার জন্য কাঁদিয়াছি—হয়তো তুমি আমার হৃদয়টা শীঘ্ৰ বুঝিতে। কিন্তু সুবৰ্ণ, আমি তো শুধু আমার সুবৰ্ণর জন্যই কাদি নাই, দেশের সহস্ৰ সহস্র সুবৰ্ণলতার জন্য কাঁদিয়াছি! তাই এই সব কথা।
তাছাড়া অবিরত শুষ্ক জ্ঞানের চর্চায় কাটাইতে কাটাইতে ভাষাও শুষ্ক হইয়া গিয়াছে, তাই মাঝে মাঝেই মনে হইতেছে, তুমি কি এত কথা বুঝিতে পারিতেছ! ন বছর বয়স হইতেই তো তোমার বিদ্যাশিক্ষায় ইতি হইয়াছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হইতেছে, তুমিও নিশ্চয়ই এসব কথা ভাবো, তুমিও কেবলমাত্র নিজের কথাই নয়, আরো সহস্র মেয়ের কথা চিন্তা করো।
অধিক আর কি লিখিব, আমার শতকোটি আশীৰ্বাদ গ্ৰহণ করো। তোমার পরিজনবৰ্গকেও জানাইও। আর যদি সম্ভব হয়, তোমার এই চিরনিষ্ঠুর মাকে – অন্তত তার মৃত্যুর পরও ক্ষমা করিও।
ইতি
তোমার নিত্য আঃ মা।
অনেকবার অনেক ঝলক জল গালের উপর গড়িয়ে পড়েছে, অনেকবার সে জল শুকিয়েছে, এখন শুধু গালটায় লোনাজল শুকিয়ে যাওয়ার একটা অস্বস্তির অনুভূতি।
নাকি শুধু গালেই নয়, অসার অনুভূতি দেহমানের সর্বত্ৰ!
স্তব্ধ, মৃত্যুর মত স্তব্ধ!
যেন এ স্তব্ধতা আর ভাঙবে না কোনোদিন। এই স্তব্ধতার অন্তরালে বহে চলবে অন্তহীন একটা হাহাকার।
সুবৰ্ণর মা নিজেকে জানিয়ে গেল, সুবৰ্ণকে জেনে গেল না।
সুবৰ্ণর মা সন্দেহ করে.গেল সুবর্ণ এত সব কথা নিয়ে ভাবে কিন্য।
সুবৰ্ণর মা শুধু আশা করে গেল, হয়তো সুবৰ্ণ সহস্ৰ মেয়ের কথা ভাবে। আর কিছু নয়। আর কিছু করার নেই।
২.১২ সুবালা তার ভাঙা দাঁতের হাসি হেসে
সুবালা তার ভাঙা দাঁতের হাসি হেসে অভ্যস্ত ভঙ্গীতে সকৌতুকে বলে, বল শুনি কেমন লাগলো?
অম্বিকা অবাক হয়।
অম্বিকা যেন আর এক জগৎ থেকে এসে পড়ে।
পারু মানে? পারু কে?
পারু কে কিগো? মেজদার মেয়ে না? এই সুবালাসুন্দরীর ভাইঝি। তোমার সামনে বেরোয় নি বুঝি? না বেরোনোই সম্ভব, বড় হয়েছে তো! তা মেজবৌ কিছু বললো?
অম্বিকা বিচিত্র একটু হেসে বলে, বললেন।
সুবালা আশ্বস্ত গলায় বলে, যাক, তাহলে সেজদা আমার চিঠিটার মান রেখেছে মেজদার নতুন বাড়ির ঠিকানাটা ঠিক জানি না তো, কি জানি পৌঁছায় না-পৌঁছয়, তাই সেজদার কেয়ার অফে মেজদাকে একটা চিঠি দিয়েছিলাম তোমার কথা উল্লেখ করে। তা এখন বল বাপু শুনি, কি সব কথা-টথা হলো? আমার তো ইচ্ছে–এ মাসেই লাগিয়ে দিই।
অম্বিকা যেন একটু গম্ভীর হয়।
বলে ওঠে, কী মুশকিল! আপনি এসব কী যা-তা আরম্ভ করলেন!। এ রকম চালালে। কিন্তু ফের পালাবো!
বলে ওঠে, কী মুশকিল! আপনি এসব কী যা-তা আরম্ভ করলেন!। এ রকম চালালে। কিন্তু ফের পালাবো।
সুবালা শঙ্কিত হয়।
সুবালা বোঝে অবস্থাটা আশাপ্ৰদ নয়। মেজবৌ বোধ হয় তেমন আগ্রহ দেখায় নি। তা হতে পারে, মানুষটা তো আছে একটু উল্টো-পাল্টা! অম্বিকাকে যতই ভালবাসুক, মেয়ের সঙ্গে বয়সের তফাৎটা মনে গেথে রেখেছে। ঠাকুরপোর একটু অপমান বোধ হয়েছে তা হলে। বলতে কি একটু আশায় আশায়ই তো গেল তাড়াতাড়ি! বিয়ের মন হয়েছে, সেটা বুঝতে পারছে সুবালা। ভাবে, যাকগে–পারু না হোক গে, আমি তোড়জোড় করছি। কনের আবার অভাব? আবার ভাবে, তবে অত বয়সের মেয়ে সহসা পাওয়া যাবে না। মেজবৌ ডাকাবুকো, তাই মেয়েকে অতখানি বড় করছে। বসে বসে।
কিন্তু সুবালা চট করে কিছু বলে না, আস্তে দ্যাওরের মন-মেজাজ বুঝতে বলে, শোনো কথা, আমি আবার কী চালালাম?
এইসব বাজে বাজে কথা? বিয়ে-টিয়ের কথা শুরু করলেই কিন্তু জেনে রাখবেন আমি হাওয়া!
সুবালা ভয়ে ভয়ে বলে, মেজদা— বুঝি-
দোহাই বৌদি, আপনার ওই মেজদটির নাম আমার সামনে করবেন না। বসেছিল, উঠে পড়লো। পায়চারি করতে করতে বললো, আপনার ওই মেজদা আর মেজবোঁদিকে পাশাপাশি দেখলেই মনে হয় যেন বিধাতার একটু নিষ্ঠুর বঙ্গের জ্বলন্ত নমুনা!
সুবালা অবাক গলায় বলে, কিসের নমুনা?
যাক গে, ও আপনাকে বোঝানো যাবে না। তবে আপনার পূজনীয় মেজদার বাড়িতে ঢোকবার সৌভাগ্য আমার হয়নি, এইটাই জেনে রাখুন।
সুবালা হতভম্ব গলায় বলে, তবে যে বললে মেজবৌ কথা বলেছে—
হ্যাঁ, বলেছেন, অম্বিকা একটা জ্বালোভরা গলায় বলে, রাস্তায় বেরিয়ে এসে বলেছেন। আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আমায় বৌদি!
তার মানে, মেজদা তোমায় অপমান করেছে! জেলখাটা আসামী বলে বাড়ি ঢুকতে দেয় নি। আস্তে বলে সুবালা, বুঝতে পারছি আসল কথা—
অম্বিকা সহসা স্থির হয়। সামনে সরে আসে। বলে, আসল কথা বোঝাবার ক্ষমতা আপনার ইহজীবনেও হবে না বৌদি। আপনি এতই ভালো যে, এসব কথা আপনার মাথাতেই ঢুকবে না। শুধু বলে রাখি, যদি হঠাৎ কোনোদিন শোনেন আপনার মেজবৌদি। পাগল হয়ে গেছেন, অবাক হবেন না। হয়তো শীগগীিরই শুনতে হবে। … আশ্চর্য, আপনার ওই মেজদার মত একটি শয়তানের কোনো শাস্তি হয় না। না দেয় সমাজ, না দেন। আপনাদের ওই ভগবান।… কিছু মনে করবেন না বৌদি, না বলে পারলাম না। বড় যন্ত্রণা হলো দেখে। ছেলেও তো দেখলাম ঠিক বাপের মতন!
