কিন্তু সুবৰ্ণলতার মেয়েরা?
যে মেয়ে দুটো এখনো পরের ঘরে যায় নি? পারুল আর বকুল?
তা ওদের কথাও বোঝা যায় নি।
মনে হচ্ছিল ওদের চোখে একটা দিশেহারা ভাব ফুটে উঠেছিল। যেন ওরা ঠিক করতে পারছিল না, মায়ের উপরে বরাবর যে ঘৃণা আর বিরক্তি পোষণ করে এসেছে, সেটাই আরো পুষ্ট করবে, না নতুন চিন্তা করবে?
বকুল ছেলেমানুষ।
এত সব ভাববার বয়স হয় নি তার।
কিন্তু তাই কি?
সুবৰ্ণলতার ছেলেমেয়েরা ছেলেমানুষ থাকবার অবকাশ পেল কবে? জ্ঞান হয়ে পর্যন্ত তো ওরা শুধু ওদের মাকে বিশ্লেষণ করেছে, তার তিক্ততা অর্জন করেছে। তাই করতে করতেই বড় হয়ে উঠেছে।
ওরা অনেক কিছু জেনে বুঝে পরিপক্ক।
বাপকে ওরা ঘৃণা করে না, করে অবহেলা। কিন্তু মাকে তা পারে না। মাকে অবহেলাও করতে পারে না, অস্বীকারও করতে পারে না, তাই ঘৃণা করে।
শুধু আজই যেন ওদের দৃষ্টিভঙ্গী বদলাচ্ছে। অম্বিকার ফিরে চলে যাওয়ার মধ্যে ওরা বুঝি সমস্ত মেয়েমানুষ জাতটার দুঃসহ অসহায়তা টের পেয়ে গেছে। তাই দিশেহারা হয়ে ভাবছে, গৃহিণী শব্দটা কি তাহলে একটা ছেলেভোলানো শব্দ? নাকি দাসী শব্দেরই আর একটা পরিভাষা?
গৃহিণীর যদি তার গৃহের দরজায় এসে দাঁড়ানো একটা অতিথিকে এসো বসো বলে ডাকবার অধিকারটুকুমাত্র না থাকে, তবে গৃহিণী শব্দটা ধোকাবাজি ছাড়া আর কি? ওই ধোকায় দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে দিয়ে দাসত্ত্ব করিয়ে নেওয়া!
সংসার করা মানে তা হলে শুধু সংসারের পরিচর্যা করা, আর কিছু না! আশ্চর্য, যেখানে এক কানাকড়াও অধিকার নেই, সেখানে কেন এই গালভরা নাম?
খুব স্পষ্ট করে মনে না পড়লেও মেজপিসীর বাড়ি গিয়ে থাকার কথাটা পারুলের কিছু কিছু মনে আছে বৈকি। মনে আছে অম্বিকাকাকার নাম, তাছাড়া ছেলেবেলায় কতবারই না। শুনেছে সে নাম মায়ের মুখে। কত শ্রদ্ধার সঙ্গে, কত প্রীতির সঙ্গে, কত মেহের সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে সে নাম। অথচ সেই মানুষটাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হলো সুবৰ্ণলতারই সামনে!
গৃহিণীর সম্ভ্রম দিয়ে সুবৰ্ণলতার ক্ষমতা হলো না তাকে ডেকে এনে ঘরে বসাবার!
পারুল দেখেছে সেই অক্ষমতা। হয়তো বকুলও দেখেছে। আর অনুভব করেছে, এ অক্ষমতা বুঝি একা সুবৰ্ণলতারই নয়।
তাই দৃষ্টিভঙ্গী পালটাচ্ছে ওদের।
কিন্তু সুবৰ্ণলতার বাপ-মায়ের সেই চতুর্থী শ্রাদ্ধের কি হলো? খুব একটা সমারোহের আয়োজন করেছিল না তার স্বামী ওই উপলক্ষে। বলে বেড়াচ্ছিল, না বাবা, এ হলো গিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ীর দায়, পিতৃমাতৃদায়ের চতুর্গুণ!
তা সেও একরকম ধাষ্টামো করেই হলো বৈকি। সহজ সাধারণ কিছু হলো না। হবে কোথা থেকে?
সহজে কিছু কি হতে দেয় সুবৰ্ণলতা? সব কিছুকেই তো বিকৃত করে ছাড়ে ও!
সুবৰ্ণলতা তাই বলে বসলো, আমি ওসব করবো না।
করবে না? ভূজ্যি উছুণ্ড্যও করবে তুমি মা-বাপের?
না।
না!
শব্দজগতের চরমতম কঠোর শব্দ।
নিষ্ঠুর, অমোঘ।
আশ্চর্য, আশ্চর্য!
অত সব আয়োজন তাহলে?
নষ্ট গেল?
আবার কি!
পুরোহিত এসে শুনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাছাড়া আর করবেন কি? প্ৰবোধ যদি বা বলেছিল— ওর তো আবার জ্বর হয়ে গেছে রাত থেকে–কাজ আর হবে কি? জ্বর গায়ে তো— কিন্তু সুবৰ্ণলতা তো সে কথাকে দাঁড়াতে দেয় নি। বলে উঠেছিল, উনি ঠিক জানেন না ঠাকুরমশাই, জ্বর-টর কিছু হয় নি আমার—
জ্বর-টর হয় নি? তবে?
কিছু না। ইচ্ছে নেই সেটাই কথা!
পুরোহিত একবার প্রবোধের আপাদমস্তক দেখে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন শালগ্রামশিলাকে উঠিয়ে নিয়ে!
এ বাহাদুরিটুকুও কি না দেখালে চলতো না? হেরে যাওয়া গলায় বলেছিল প্ৰবোধ, ও-বাড়ির পুরুত উনি—
সুবৰ্ণলতা চুপ করে তাকিয়ে ছিল।
প্ৰবোধ আবার বলেছিল, চিরকালের গুরুবংশের ছেলে–
জানি, সুবৰ্ণলতাও প্রায় তেমনি হেরে যাওয়া গলায় উত্তর দিয়েছিল, গুরুবংশের ছেলে, পুরোহিতের কাজ করছেন, তাতে শালগ্রাম তাঁর সঙ্গে, আর জলজ্যান্ত মিথ্যে কথাটা কইতে ইচ্ছে হলো না।
হলো না।
হলো না তখন সে ইচ্ছে!
অথচ নিজেই সুবৰ্ণলতা ঘণ্টাকয়েক পরে শরীর খারাপ লাগছে, বোধ হয় জ্বর আসছে— বলে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো গিয়ে।
মিছিমিছিই বলল। বৈকি।
গা তো ঠাণ্ডা পাথর!
বললো কাদের? কেন, যত সব আত্মীয়-কুটুম্বদের! বাড়ি বাড়ি ঘুরে যাদের যাদের নেমন্তন করে এসেছে প্ৰবোধ, তার স্ত্রীর মা-বাপ মরার উপলক্ষে।
আর আত্মীয়দের মুখ দেখতে ইচ্ছে হয় নি বলে চাদর ঢাকা দিয়ে পড়ে আছে?
তবে সুবৰ্ণলতার পড়ে থাকার জন্যে কি কিছু আটকেছিল?
কিছু না। কিছু না।
প্ৰবোধের গুষ্টির সবাই এল, ভোজ খেল, সুবৰ্ণলতার শুয়ে থাকার জন্যে হা-হুতাশ করলো, চলে গেল।
সুবৰ্ণলতাই শুধু চাদর মুড়ি দিয়ে গলদঘর্ম হতে থাকলো।
কিন্তু সুবৰ্ণলতার মায়ের সেই চিঠিটা?
সেটার কি হলো?
সে চিঠি কি খুললো না সুবৰ্ণলতা? কবরের নীচে চিরঘুমন্ত করে রেখে দিল তার মায়ের অন্তিম বাণী?
এত অভিমান সুবৰ্ণলতার?
এত তেজ?
এত কাঠিন্য?
তা প্রথমটা তাই ছিল বটে। কতদিন যেন সেই খাম মুখবন্ধ হয়ে পড়ে রইল সুবৰ্ণলতার ট্রাঙ্কের নীচে কাপচোপড়ের তলায়।
কিন্তু সেই গভীর অন্তরাল থেকে সেই অবরুদ্ধবাণী অনুক্ষণ সুবৰ্ণলতার সমগ্ৰ চেতনাকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে বলেছে, সুবৰ্ণ, তুমি কি পাগল? সুবর্ণ, এ তুমি কী করছো? আর তারপর হতাশ হতাশ গলায় বলেছে, সুবৰ্ণ, তোমার এই অভিমানের মর্ম কে বুঝবে? কে দেবে তার মূল্য?
