কিন্তু মুশকিল। এই—কিসে যে সুবৰ্ণলতা মাথা কোটে বোঝা শক্ত।
কারো সঙ্গে মেলে না।
নইলে একটা জেলখাটা আসামী, কবে কোনদিনের একটু আলাপের সূত্র ধরে সুবৰ্ণলতার সঙ্গে দেখা করবার আবদার নিয়ে ওর বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে দেখে ওর স্বামী-পুত্তুর তাকে দরজা থেকেই বিদায় দিয়েছিল বলে মাথা কোটে ও?
বলে, ভগবান, এ অপমানের মধ্যে আর কতদিন রাখবে আমায়! এবার ছুটি দাও, ছুটি দাও!
অথচ সত্যের মুখ চাইলে বলতে হয়, আসলে অপদস্থ যদি কেউ হয়ে থাকে তো সে সুবৰ্ণলতার স্বামী-পুত্ৰই হয়েছিল।
ওরা সাধারণ সংসারী মানুষ! অতএব একটা জেলখাটা আসামী সম্পর্কে সহসা হৃদয়দ্বার খুলে দিতে পারে না। তাই ঘরের দ্বার খুলে দেয় নি। ওরা জেরা করেছিল। বলেছিল, কি দরকার, কাকে চান, কতদিন জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন, সুবৰ্ণলতার সঙ্গে খুব কোন জরুরী প্রয়োজন যদি না থাকে, এত কষ্ট করে এতদূর আসবার মানে কি, ইত্যাদি ইত্যাদি!
বাড়ির কর্তা হিসাবে প্ৰবোধই করছিল প্রশ্ন, তবে ভানুও ছিল দাঁড়িয়ে। তা বাড়ির কর্তাকে বাড়ির নিরাপত্তা, পরিবারের সম্ভ্রম–এসব দেখতে হবে না? তাই দেখছিল প্ৰবোধ। সহসা দেখল সুবৰ্ণলতা অন্তঃপুরের সভ্যতার গণ্ডি ভেঙে বাড়ির বাইরে সদর রাস্তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভাবা যায়? দেখেছে। কেউ কখনো এমন দৃশ্য?
ওটা ওর স্বামীর পক্ষে লজ্জার নয়? অপমানের নয়?
তার উপর কিনা, প্ৰবোধ যখন রক্তবর্ণ মুখে বলেছে, তুমি বেরিয়ে এলে যে? এর মানে? ভানু, তোর মাকে বল বাড়ির মধ্যে যেতে—
তখন কিনা সুবৰ্ণলতা, তুমি স্বামীর দিকে দৃষ্টিপাত না করে বলে উঠলে, কী সর্বনাশ অম্বিকা ঠাকুরপো, তুমি এখানে? পালাও, পালাও! এ যে ভূতের বাড়ি! মেজবৌদির সঙ্গে দেখা করতে এসেছ? কী আশ্চৰ্য, কেউ তোমায় বলে দেয় নি সে কবে মরে ভূত হয়ে গেছে! এটা তার প্ৰেতাত্মার বাসভূমি!
এতে অপদস্থ হলো না তোমার স্বামী পুত্ৰ?
পরে যদি তোমার ছেলে বলেই থাকে, বাবা, তুমি বৃথা রাগ করছে, মা তো বেশি কিছু করেন নি! যা চিরকালের স্বভাব, তাই শুধু করেছেন। অন্যকে অপদস্থ করা, গুরুজনকে অপমান করাএটাই তো প্রকৃতি ওঁর, এতেই তো আনন্দ!—সেও কিছু অন্যায় বলে নি।
তার দৃষ্টিতে তো আজীবন ওইটাই দেখেছে সে।
আর সুবৰ্ণ, তুমি তো অম্বিকার সামনে শুধু ওইটুকু বলেই ক্ষান্ত হও নি? আরও বলেছ। অম্বিকা যখন তৎসত্ত্বেও প্ৰেতাত্মাকেই হেঁট হয়ে প্ৰণাম করতে গিয়েছিল, তুমি শশব্যাস্তে পা সরিয়ে নিয়ে বলেছি, ছিছি ভাই, প্ৰণাম করে আর পাপ বাড়িও না। আমার, একেই তো পূর্বজন্মের কত মহাপাপে বাঙালীর মেয়ে হয়ে জন্মেছি, আর আরও কত শত মহাপাপে এই মহাপুরুষদের ঘরে পড়েছি। আর কেন? প্ৰণাম বরং তোমাদেরই করা উচিত। তোমরা যা নিজের সুখ-দুঃখ তুচ্ছ করে দেশের গ্লানি ঘোচাতে চেষ্টা করছি।
কী? প্ৰবোধ যা বলেছে। তাছাড়া আর কি?
নাটক ছাড়া আর কি?
পুরো নাটক!
কিন্তু এই ঘরগেরস্ত লোকদের সংসারটা থিয়েটারের স্টেজ নয়। অথচ সারাজীবনে তুমি তা বুঝলে না। এখনও বুড়ো বয়সেও না।
তোমার কথায় যখন অম্বিকা স্নান হেসে বলেছিল, চেষ্টাই হয়েছে, কাজ আর কী হলো? সবটাই ব্যৰ্থতা! তখন তুমি নাটুকে ভাষাতেই উত্তর দিলে, কেন ব্যর্থতা জান ঠাকুরপো? তোমাদের সমাজের আধখানা অঙ্গ পাকে পোতা বলে। আধখানা অঙ্গ নিয়ে কে কবে এগোতে পারে বল? এ অখদ্যে অবদ্যে মেয়েমানুষ জাতটাকে যতদিন না। শুধু মানুষ বলে স্বীকার করতে পারবে ততদিন তোমাদের মুক্তি নেই, মুক্তির আশা নেই। চাকরানীকে পাশে নিয়ে। তোমরা রাজসিংহাসনে বসবে?
বললে!
একবার ভাবলে না, তোমার স্বামী-পুত্রের মাথাটা কতখানি হেঁট হলো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে তোমার ওই নাটক করায়।
অগত্যাই ওদের কঠোর হতে হয়েছে।
অগত্যাই ধমকে উঠে বলতে হয়েছে, পাগলামি করবার আর জায়গা পাও নি? আর ওই পাগলামির দর্শককেও কটু গলায় বলতে হয়েছে, আপনিও তো আচ্ছা মশাই, ভদ্রলোকের ঘরের মান ইজ্জত বোঝেন না! দেখছেন একটা মাথা খারাপ মানুষ ঘর থেকে ছিটকে এসেছে—
এরপরেও অবশ্য কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
অন্তত অম্বিকার মত শান্ত সভ্য মার্জিত স্বভাব লোকে নিশ্চয় পারে না। মাথা হেঁট করে চলে গিয়েছিল সে।
তবু সুবৰ্ণলতা তুমি হেসে বলে উঠেছিলে, ঠিক হয়েছে! কেমন জব্দ? ভূতের বাড়ি আসার ফল পেলে?
ভাবো নি। এরপরও তোমাকে তোমার স্বামী-পুত্রের সামনে মুখ দেখাতে হবে, পিছনের ওই চৌকাঠ পার হয়েই আবার ঢুকতে হবে।
কিন্তু ঢুকতে হলেই বা কি!
আবার এসে ঢোকে নি?
ঢুকেছে। আবার ঢুকেছে, আবার দাপট করেছে। মরমে মরে গিয়ে চুপ হয়ে যায় নি। এদিনও তা গেল না। যখন প্ৰবোধ গর্জে উঠলো, আর ভানু উপর্যুক্ত ধিক্কার দেবার ভাষা খুঁজে না পেয়ে শুধু ঘৃণার দৃষ্টিতে দগ্ধ করা যায়। কিনা তার চেষ্টা করলো, তখন কিনা সুবৰ্ণলতা বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে অনায়াসে বলে উঠলো, কী আশ্চর্য। এতে তোমাদের মুখ পোড়ানো হলো কোথায়? মুখ উজ্জ্বলাই হলো বরং। পাগল পাগলের মতই আচরণ করলো, চুকে গেল ল্যাঠা। তোমার কথার মান বজায় রাখলাম, আর বলছে কিনা মুখ পোড়ালাম?
ঘৃণায় মুখ ফিরিয়েছিল সেদিন একা সুবৰ্ণলতার বড় ছেলেই নয়, মেজ-সেজও অগ্নিদৃষ্টি হেনে বলেছিল, চমৎকার! মার শোক হয়েছে ভেবে আর মমতা আসে নি। ওদের। ছোট ছেলে সুবলের কথাই শুধু বোঝা যায় না, সে বরাবরই মুখচোরা। সে যে কোথা থেকে তার এই চাপা স্বভাব পেয়েছে!
