অবশেষে একদিন এই ধাক্কা অসহ্য হলো। সুবর্ণ ট্রাঙ্কের তলা থেকে ওর মায়ের সেই অন্তিমবাণী টেনে বার করলো।
দিনটা ছিল একটা রবিবারের দুপুর। যদিও জ্যৈষ্ঠ মাস, তবু কেমন যেন ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা মেঘলা দুপুর। আকাশটা যেন ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কোনো রকমে দিনসই করেই সন্ধ্যার কুলায় আশ্রয় নেবো নেবো করছে। বাড়ি থেকে কারো বেরোবার কথা নয়, তবু আকস্মিক একটা যোগাযোগে আশ্চর্য রকমের নির্জন ছিল বাড়িটা।
গিরিবালার সাবিত্রীব্রতের উদযাপন সেদিন। সেই উপলক্ষে ব্ৰাহ্মণভোজনের সঙ্গে সঙ্গে আত্মজন-ভোজনেরও ব্যবস্থা করেছিল সে, তাই ভাসুরের বাড়ির সবাইকে নেমন্তন করে পাঠিয়েছিল ছেলেকে দিয়ে।
কবে যেন ব্ৰতটা ধরেছিল গিরিবালা?
সুবৰ্ণ ও বাড়িতে থাকতেই না?
উদযাপনের খবর মনে পড়েছিল বটে সুবর্ণর। কারণ ওই ব্ৰতটাকে উপলক্ষ করে অজস্রবারের মধ্যে আরো একবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল সুবৰ্ণকে।
মুক্তকেশী বলেছিলেন, বড়বৌমার কথা বাদ দিই, ওর না হয় ক্ষ্যামতা নেই, কিন্তু তোমার সোয়ামীর পয়সা তো ওর সোয়ামীর চেয়ে কম নয়। মেজবৌমা, খরুচে বত্তটায় সেজবৌমা ব্ৰতী হলো, আর তুমি অক্ষমের মতন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখবে?
হয়তো ইদানীং গিরিবালার স্বাধীনতাও ভাল লাগছিল না মুক্তকেশীর, তাই এক প্রতিপক্ষকে দিয়ে আর এক প্রতিপক্ষকে খর্ব করবার বাসনাতেই এ উস্কানি দিচ্ছিলেন। কিন্তু সুবৰ্ণলতা তার ইচ্ছে সফল করে নি, সে অমানবদনে বলেছিল, ও ধাষ্টামোতে আমার রুচি নেই।
ধাষ্টামো!
সাবিত্রীব্ৰত ধাষ্টামো! মুক্তকেশী স্তম্ভিত দৃষ্টি ফেলে বোবা হয়ে তাকিয়ে ছিলেন।
গিরিবালাও মুখ লাল করে বলে উঠেছিল, এ কথার মানে কি মেজদি?
মেজদি আরো অম্লানবদনে বলেছিল, মানে খুব সোজা। যার সবটাই ফাঁকা তা নিয়ে আড়ম্বর করাটা ফাঁকি ছাড়া আর কি? অন্যকে ধোকা দেওয়া, আর নিজেকে ফাঁকি দেওয়া, এই তো? সেটাই
স্বামীভক্তিটা তাহলে হাসির বস্তু?
সুবৰ্ণলতা হেসে উঠে বলেছিল, ক্ষেত্রবিশেষে নিশ্চয় হাসির। ফুল-চন্দন নিয়ে স্বামীর পা পূজো করতে বসেছি আমরা, একথা ভাবতে গিয়েই সে হাসি উথলে উঠছে আমার!
নিজেকে দিয়ে সবাইকে বিচার কোরো না মেজদি, ভক্তি যার আছে—
মেজদি এ ধিক্কারকে নস্যাৎ করে দিয়ে আরো হেসে বলেছিল, ভক্তি? ওই ভেবে মনকে চোখ ঠারা, এর মধ্যে ভক্তিও নেই, মুক্তিও নেই। সেজবৌ। আছে শুধু শখ অহমিকা!
সেই অকথ্য উক্তির পর বাড়িতে কোট-কাছারি বসে গিয়েছিল। যে দ্যাওর ডেকে কথা। আর কইত না ইদানীং, সেও এসে ডেকে বলেছিল, বিষটা নিজের মধ্যে থাকলেই তো ভাল ছিল মেজবৌ, অন্যের সরল মনে গরল ঢেলে দেবার দরকার কি? স্বামীকে সত্যবান হতে হবে। তবে স্ত্রীরা সাবিত্রী হবে, নচেৎ নয়, এমন বিলিতি কথার চাষ আর নাই বা করলে বাড়িতে!
আর প্রবোধ বাড়ি ফিরে ঘটনা শুনে দেওয়ালে মাথা ঠুকতে গিয়েছিল, বলেছিল, হবে বিদেয় হতেই হবে। আমায় এ বাড়ি থেকে। এভাবে আর-
সুবৰ্ণলতা বলেছিল, আহা! এ সুমতি হবে তোমার? তাহলে পায়ে না হোক, মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক তোমার!
অবশ্য বিষমন্ত্র দেওয়া সত্ত্বেও ব্ৰত নেওয়া বন্ধ থাকেনি গিরিবালার, এবং দেখা যাচ্ছে চোদ্দ বছর ধরে নিষ্ঠা সহকারে পতিপূজা করে এখন সগৌরবের ব্ৰত উদযাপন করতে বসেছে সে।
সুবৰ্ণলতা কি ওর সুখী হবার ক্ষমতাকে ঈর্ষা করবে?
না। সুবৰ্ণলতা শুধু হাসবে?
তা এখন আর হেসে ওঠে নি। সুবর্ণ, শুধু ছেলেটাকে বলেছিল, যেতে পারবো না বাবা সুশীল, মাকে বলিস মেজজেঠির শরীর ভাল নেই। আর সবাই যাবে।
সেই উৎসবে যোগ দিতে চলে গেছে সুবর্ণর স্বামী, সন্তানেরা। অবশ্য পারুল বাদে। পারুলের থেকে বয়সে ছোট খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো বোনেদের বিয়ে হয়ে গেছে, পারুর হয় নি, এই অপরাধে প্ৰবোধ বলেছিল, ওরা যাওয়ার দরকার নেই।
পারু মনে মনে বলেছে, বাঁচলাম।
কে জানে, হয়তো বাড়ির কোন কোণে একখানা বই নিয়ে পড়ে আছে পারুল, হয়তো বা তার কবিতার খাতাটা নিয়েও বসতে পারে, এই অকস্মাৎ পেয়ে যাওয়া একখণ্ড অবসরের সুযোগে। সুবর্ণ জানে, পারু তার নির্জনতায় ব্যাঘাত ঘটাবে না।
কিন্তু তখন কি ভেবেছিল সুবৰ্ণ, ওরা চলে গেলে মায়ের চিঠিখানা খুলবো।
আমি?
তা ভাবে নি।
শুধু অনেকটা কলকোলাহলের পর হঠাৎ বাড়িটা ঠাণ্ডা মেরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়ানক একটা মন উচাটন ভাব হয়েছিল সুবৰ্ণর!
আর তখনই মনে হয়েছিল ওর, আমি কি সেজবৌয়ের সুখী হওয়ার ক্ষমতাকে হিংসে করছি?… তা নয়তো কেন আজই এত করে। মনে আসছে। সারাজীবন আমি কি করলাম!
অবিশ্রান্ত একটা প্ৰাণপণ যুদ্ধ ছাড়া আর কোনোখানে যেন কিছু চোখে পড়ে না। কোথাও যে একটু সুশীতল ছায়া আছে, কোনোখানে যে একবিন্দু তৃষ্ণার জল মিলেছিল, সে কথা যেন ভুলেই যাচ্ছে সুবর্ণ। সুবর্ণ দেখতে পাচ্ছে অবিরত সে শুধু আক্রমণ ঠেকাচ্ছে, তবু এগিয়ে যাবার চেষ্টায় নিজেকে ছিন্নভিন্ন করেছে।
নিজের উপর করুণায় আর মমতায় চোখে জল এসে গেল সুবর্ণর, ভিতরটা যেন হাহাকার করে উঠলো, আর তখনই মনে হলো, দেখব। আজ আমি দেখব–ভগবান আমাকে শেষ কি উপহার
খাম ছিঁড়তে হাত কাঁপছিল সুবর্ণর, আর বুকের মধ্যে খুব কষ্ট হচ্ছিল। যেন ওটা ছেঁড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মস্ত একটা কিছু ফুরিয়ে যাবে ওর।
কী সে?
পরম একটা আশা?
নাকি ওই খামটার মধ্যে ওর মা এখনও জীবন্ত রয়েছে, খোলার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলবো?
