এসেই কড়াগলায় বলে ওঠে, জগুদাকে কে কি বলেছে?
বলেছে।
বলবে। আবার কে কি?
পারুল বকুল দুজনেই অবাক হয়ে তাকায়। প্ৰবোধ আরো চড়া গলায় বলে, নিশ্চয়ই কিছু একটা বলা হয়েছে, বুড়োমদ একটা লোক চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে যেত না। আমাকে বলে গেল, আমার দ্বারা কিছু হবে না, আমি তোর বামুনভোজনের যজ্ঞিশালায় নেই— শুধু শুধু এমন কথাটা বলবে এমন পরোপকারী মানুষটা? বলেছ, তোমরাই কেউ কিছু বলেছ। মায়ের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছ তো সবাই, গুরুলঘু জ্ঞান করতে জানো না, গুরুজনদের মান-অপমানের ধার ধারো না। উদ্ধত অবিনয়ী এক-একটি রত্ব তৈরী হয়েছ তো!
বকুল এর বিন্দুবিসর্গও জানে না, তাই বকুল হাঁ করে চেয়ে থাকে। তবে পারুলও উত্তর দেয় না। কিছু। কারণ পারুল জানে, এসব কথার লক্ষ্যস্থল পারুল বকুল নয়, তাদের দাদারা।
এই স্বভাব বাবার, মুখোমুখি কিছু বলবার সাহস হয় না ছেলেদের, তাই এমন শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপ!
ওরাও তাই শিখেছে।
জবাব দেয় না, ঠেস দিয়ে কথা বলে দেওয়ালকে শুনিয়ে।
ছেলে বলেই অবশ্য এতটা সাহস তাদের! মাকে (বোধ করি তুচ্ছ মেয়েমানুষ জাতটার একটা অংশ হিসেবে) তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কটু-কাটব্য করে, আর ব্যাপকে অবজ্ঞা করে।
কিন্তু ওদেরই বা দোষ কি?
ওরা ওদের মা-বাপের মধ্যে শ্রদ্ধাযোগ্য কী দেখতে পাচ্ছে?
হয়তো শুধু মা-বাপ। এই হিসেবেই করতো ভয়-ভক্তি, যদি ওদের দৃষ্টিটা আচ্ছন্ন থাকতো অন্য অনেকের মত। কিন্তু তা হয় নি, সুবৰ্ণলতা অন্য পাঁচ জনের থেকে পৃথক করে মানুষ করতে চেয়েছিল তার সন্তানদের। তাদের খোলা চোখে দেখতে শেখাবার চেষ্টা করেছিল, ওরা সে চেষ্টা সফল করেছে। ওরা শুধু মা-বাপ বলেই ভক্তি-শ্রদ্ধা করবে। এমন নির্বোধের ভূমিকা অভিনয়ে রাজী নয়।
না করুক, সমতলেও নেমে আসুক!
প্রবোধ অন্তত তা নয়।
প্ৰবোধের ইচ্ছে করে, ছেলেমেয়েরা তার মুখে মুখে চোটপাট জবাব করুক, সেও তার সমুচিত জবাব দেবার সুযোগ পাক। কিন্তু তা হয় না! ছেলেরা তো দূরের কথা, মেয়েরা পর্যন্ত যেন কেমন অবজ্ঞার চোখে তাকায়।
সে দৃষ্টিতে আগুন জ্বলে উঠবে না মাথার মধ্যে?
তাই এখনও আগুন জ্বালা কণ্ঠে চীৎকার করে প্রবোধ, কেউ কিছু বলে নি বললেই মানবো আমি? ওই অবোধ-অজ্ঞান মানুষটা কখনো মান-অভিমানের ধার ধারে না, সে হঠাৎ এতটা অভিমান করে–
বাপের কণ্ঠ-মাধুর্যে আকৃষ্ট হয়ে ভায়েরা এসে দাঁড়ালো, একটু থমকে বলে উঠলো, কি ব্যাপার? বাড়িতে ভোজটোজ নাকি? পারুর বিয়ে বুঝি?
পারুর বিয়ে!
হতবাক প্ৰবোধ বলে, পারুর বিয়ে? তোমরা জানবে না সেটা?
বাঃ, এই তো জানিছি। ভাঁড় খুরি এসে গেছে!
বললো ভানু।
তার সেজকাকার ভঙ্গীতে।
প্ৰবোধ অসাহায়ের মত এদিক-ওদিক তাকালো! বললো, এইভাবে জানবে? বাঃ কেন, আর কোনো ঘটনা ঘটে নি সংসারে? তোমাদের মার চতুর্থীর বামুন-ভোজন–
তাই নাকি? ওঃ!
ভানু ভুরু কোঁচকায়।
ভানুর সেই ভুরুতে ব্যঙ্গের হাসি ছায়া ফেলে।
প্ৰবোধ হঠাৎ সেই দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, তা এতে হাসবার কি হলো? হাসবার কি হলো? যে মানুষটা তোমাদের সংসারে প্রাণপাত করছে, তার একটা পাওনা নেই সংসারের কাছ থেকে?
কি উত্তর ভানুদিত কে জানে!
সহসা কোন ঘর থেকে যেন বেরিয়ে এল। তার মা। খুব শান্ত আর স্থির গলায় বললো, তোমাদের এই সংসার থেকে আমার যা প্ৰাপ্য পাওনা, সেটা তাহলে শোধ হচ্ছে? অনেক ধন্যবাদ যে শোধের কথাটা। তবু মনে পড়েছে তোমার। কিন্তু ওতে আমার রুচি নেই, সেই কথাটাই জানিয়ে দিতে এলাম তোমায়। এসব আয়োজন করার দরকার নেই, করা হবে না।
করা হবে না!
প্ৰবোধ যন্ত্রচালিতের মত বলে, আজ হবে না?
না। আজ না কোনদিনই না!
এরপরও যদি রেগে না ওঠে। প্ৰবোধ, কিসে আর তবে রেগে উঠবে?
অতএব রেগেই বলে, হবে না বললেই হলো? রাজ্যসুদ্ধ লোকজনকে নেমন্তন করে এলাম—
নেমন্তন্ন করে এলে? সুবৰ্ণলতা স্তব্ধ হয়ে তাকায়। কিন্তু প্ৰবোধ ভয় পায় না, প্ৰবোধ এমন স্তব্ধতা অনেক দেখেছে। তাই প্ৰবোধ বলে, এলাম তো! বিরাজ বলেছে, সে সক্কলের আগে আসবে–আর ও-বাড়ির সবাই একটু দেরি করবে, কারণ—
থাক, কারণ শুনতে চাই না। লোকজন আসে। ভালই, তোমরা থাকবে। আমি অন্য কোথাও গিয়ে থাকবো।
তুমি অন্য কোথাও গিয়ে থাকবে?
প্ৰবোধ আর পারে না, খিঁচিয়ে উঠে বলে, বাপের ছোরাদটা তাহলে আমিই করবো?
হঠাৎ সুবৰ্ণ ঘুরে দাঁড়ায়। কাতর গলায় বলে, আমায় এবার তুমি ছুটি দাও। আর মন্দ কথা বলিও না। আমায়। আর পারছি না আমি।
চলে যাচ্ছিল দ্রুতপায়ে, ঠিক এই মহামুহূর্তে ঝি এসে খবর দেয়, বাবুর বোনের দেশ থেকে অম্বিকেবাবু না কে একজন এসেছে, খবর দিতে বললো!
২.১১ তারপর সুবৰ্ণলতা
তারপর? তারপর সুবৰ্ণলতা—
কিন্তু সুবৰ্ণলতা কী বা এমন মানুষ যে, তার প্রতিদিনকার দিনলিপি বাধানো খাতায় তোলা থাকবে, আর পর পর মেলে ধরে দেখতে পাওয়া যাবে! আ-বাধা একখানা খাতার ঝুরো কুরো পাতা থেকে সুবৰ্ণলতাকে দেখতে পাওয়া!
সুবৰ্ণলতা যখন নিজেই হাতড়ে হাতড়ে খুঁজছিল সেই বুরো খাতার। প্রথম দিকে পৃষ্ঠাগুলো তখনই কি সবগুলোর সন্ধান মিলেছিল? কই আর?
শুধু ওর মাথা কুটে মরার দিনগুলোই—
হ্যাঁ, সাদাসিধে দিনগুলো সাদা কালিতে লেখার মত কখন যেন বাতাস লেগে মিলিয়ে গেছে, আর পৃষ্ঠাগুলোই ঝরে পড়েছে অদরকারী বলে, শুধু ওই মাথা কোটার মত দিনগুলোই গাঢ় কালিতে লেখা হয়ে–
