হঠাৎ থেমে যায় জগু।
ভাদ্রবৌয়ের মুখের দিকে তাকানো অশাস্ত্রীয় এটা জানা থাকলেও বোধ করি হঠাৎই তাকিয়ে ফেলেছিল সে। অথবা ভয়ঙ্কর একটা নীরবতা অনুভর করে তাকিয়েছিল কে জানে। তবে থেমে যাবার হেতুটা তাই। ওই মুখ!
মুখ দেখে ভয়ে প্ৰাণ উড়ে যায়। ওই বাজখাই লোকটার। তাড়াতাড়ি ডাক দেয়, পারু পারু, দেখ তোর মার শরীর-টরীর খারাপ হলো নাকি?
মুটেগুলো এতক্ষণ অপেক্ষান্তে রাগ-ভরে নিজেরাই স্থান নির্বাচন করে জিনিসগুলো নামাতে শুরু করে, এবং সারাও করে আনে। ইতিমধ্যে পারু এসে দাঁড়ায়, সমস্ত দৃশ্যটার ওপর একবার দৃষ্টিটা বুলিয়ে নিয়ে সেও অবাক গলায় বলে, এসব কি বড় জ্যাঠা?
এবার বিস্ময়-প্রশ্নের পালা জগুর।
তোদের কথায় আর আমি কি উত্তর দেব রে পারু, আমিই যে তাজ্জব বনে যাচ্ছি! বলি তোদের বাবা কি আমার সঙ্গে ন্যাকরা করে এল? তোদের বাড়িতে কোনো কাজকর্ম নেই? দাদামশাই দিদিমা মরে নি তোদের? সব ভুল?
পারু আস্তে বলে, ভুল নয়। তবে তার জন্যে এসব- গলাটা একটু নামায়, আস্তে বলে, জানি একটা মরণকে উপলক্ষ করে মানুষ এমন ঘটা লাগায়, কিন্তু জানেনই তো মাকে! মা এসব একেবারেই ইয়ে করেন না। তা ছাড়া–
পারুর কথা থেমে যায়।
সহসা পারুর মায়ের কণ্ঠ কথা কয়ে ওঠে, পারু ভাসুরিঠাকুরকে বল, যেন আমার অপরাধ না নেন। লোকে যা করে, আমার তার সঙ্গে মেলে না। আমি আমার জ্যান্ত মা-বোপকে কখনো একটি দুটি অল্প এগিয়ে দিই নি, আজ মরার পর আর তাদের ওপর খাঁড়ার মা দিয়ে অপমান করতে পারব না।–
সহসা একটা অভাবিত ব্যাপার ঘটে।
অন্তত পারুর তাই মনে হয়।
মায়ের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরে পড়তে কবে দেখেছে পারু? সে চোখে তো শুধু আগুনই দেখে এসেছে জ্ঞানাবধি।
কিন্তু বেশিক্ষণ সে দৃশ্য দেখবার সুযোগ দেয় না পারুর মা, দ্রুতপায়ে চলে যায়। চলে যায় শুধু পারুকেই নয়, আরও মানুষকে পাথর করে দিয়ে।
পাগল-ছাগল জণ্ড আরও একবার শাস্ত্রীয়বিধি বিস্মৃত হয়ে ভদ্রবৌয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ফেলেছিল, এবং বলা বাহুল্য সে মুখে অবগুণ্ঠনের খুব একটা বাড়াবাড়ি ছিল না। কাজেই দেখায় অসম্পূর্ণতা ছিল না।
পাগল-ছাগল বলেই কি হঠাৎ এত আঘাত খেল জগু? নাকি এরকম একখানা ভয়ঙ্কর দুঃখ হতাশা গ্লানি ক্ষোভ বেদনা বিদ্রোহের সম্মিলিত ছবি সে জীবনে আর দেখে নি বলেই?
স্তব্ধ হয়ে দু-এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকেই দ্রুতকণ্ঠে আমি এসব কিছু জানি না পারু, আমি এত সব কিছু জানি না। আমায় তোর বাবা গুচ্ছির টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে বলে এল— তোমার বৌমার খুব ইচ্ছে, তাই আমি— বলেই কোঁচার খুঁটে চোখ চেপে একরাম ছুটে বেরিয়ে যায় জগু বাড়ির সদর চৌকাঠ পার হয়ে। কে বলবে, তার দু চোখেও সহসা জলের ধারা ঠেলে আসে কেন?
মুটে কটা এতক্ষণ ঝাঁকা খালি করে ক্লান্তি অপনোদন করছিল, বাবু ভাগলবা দেখে তারাও ছুটি দেয়। পারু তেমনি স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পারু সহসা যেন আর এক জগতের দরজায় এসে দাঁড়ায়।
জ্ঞানাবধি শুধু মার তীব্ৰতা আর রুক্ষতাই দেখে এসেছে পারু, মার জীবনের প্রচ্ছন বেদনার দিকটা দেখে নি। আজ হঠাৎ মনে হলো তার, মার প্রতি তারা শুধু অবিচারই করে এসেছে।
কোনোদিন সেই অকারণ তীব্রতার কারণ অন্বেষণ করবার কথা ভাবে নি।
একথা ঠিক, বাবাকেও তারা ভাই-বোনেরা কেউ একতিলও শ্রদ্ধা করে না, তবু কদাচ কখনো একটু করুণা করে, অনুকম্পা করে। কিন্তু মাকে?
মার জন্যে কিসের নৈবেদ্য রাখা আছে তাদের অন্তরে?
ভাবিলো সে কথা পারু।
কারণ সহসা পারু তার মার একটা নির্জন ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো। যে ঘরের সন্ধান সে কখনো জানত না, যে ঘরের দরজা কখনো খোলা দেখে নি।… অসতর্ক একটা বাতাসে একটিবার খুলে পড়েছে সে দরজা, তাই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে পারুল।
ওই জনহীন শূন্যঘরটা এখানে ছিল চিরকাল?
অথচ ওরা–
দিদি বকুল এসে দাঁড়ালো, বললো, দাদা বললো, তোকে যে কামিজটায় বোতাম বসিয়ে রাখতে বলেছিল, সেটা কোথায়?
পারুল চোখে অন্ধকার দেখলো।
পারুলের গলা শুকিয়ে এল।
আস্তে বললো, বোতাম বসানো হয় নি, ভুলে গেছি!
ভুলে গেছিস? সর্বনাশ! কোথায় সেটা?
মার ঘরে প্যাঁটরার ওপর।
সেরেছে, দাদা তো সেখানেই বসে!
বকুলেরও যেন হাত-পা ছেড়ে যায়।
হ্যাঁ, এমনি ভয়ই করে তারা দাদাদের।
অথবা ভয় করে আত্মসম্মান-হানির। জানে যে এতটুকু ত্রুটি পেলেই খিঁচিয়ে উঠবে তারা, ঘৃণা ধিক্কার আর শ্লেষ দিয়ে বলবে, এটুকুও পার নি? সারাদিন কি রাজকাৰ্য করা? নভেল পড়া আর বাবার অন্নজল ধ্বংসানো ছাড়া আর কোনো মহৎ কর্ম তো করতে দেখি না।
যেন অন্য অনেক মহৎ কর্মের দরজা চিনিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের। যেন দাদাদের জামায় বোতাম বসানো, কি ঘর গোছানো, তাদের জুতো ঝেড়ে রাখা, কি ফতুয়া গেঞ্জি সাবান কোচে রাখাই ভারী একটা মহৎ কর্ম!
ওরা কি ওদের মহৎ পুরুষজীবনের শুল্ক আদায় করে নেবার পদ্ধতিটা রপ্ত করে রাখছে। এই মেয়ে দুটোর ওপর দিয়ে?
এ কথা ভাবে পারুল।
তবু প্ৰতিবাদ করবার কথা ওঠে না।
প্রতিবাদের সুর শুনলে খিচুনি বাড়বে বৈ তো কমবে না।
কিন্তু আজ পারুল সহসা কঠিন হলো।
বললো, অত ভয় পাবার কি আছে? বলগে যা হয় নি, ভুলে গেছি।
ও বাবা, আমি পারবো না।
ঠিক আছে আমি যাচ্ছি—
যাচ্ছিল, যাওয়া হল না। প্ৰবোধ এসে ঢুকলো বাইরে থেকে এক বোতল ক্যাওড়ার জল হাতে করে।
প্ৰবোধের মুখ রাগে থমথমে।
