বলে, তবে মনে মনে ভাবে, কিই বা জোটাতে পারবো! আহা, বেচারা এতদিন পরে এল। সজনেডাঁটাটা ভালবাসে, মৌরলা মাছটাও খুব ভালবাসতো। আর আড়র ডাল। দেখি যাই—
সুবালা চলে যায় রান্নার যোগাড়ে, এরা দুই ভাই কথা বলে, গ্রামের কথা, পড়াশীর কথা।
আর এর মাঝখানেই হঠাৎ একসময় প্রশ্ন করে ওঠে অম্বিকা, তোমার শ্বশুরবাড়ির খবর কি?
আমার শ্বশুরবাড়ির!
হ্যাঁ, তোমার সেই—— ইয়ে, মেজবোঁদি, তার ছেলেমেয়েরা— আর শ্ৰীযুক্ত বাবু মেজদা?
একটু ভয়ে-ভয়েই বলে।
মনকে প্রস্তুত করে দু-একটা দুঃসংবাদ শোনবার জন্যে।
কিন্তু আশ্চর্য, শুনতে হলো না তা।
বরং ভালো খবর।
মেজদার আয়ের আরো উন্নতি হয়েছে, ছেলেরা ভ্ল ভাল পাস করেছে, নতুন বাড়ি করেছে নিজস্ব, আলাদা হয়ে চলে গেছে। মোটের মাথায় হতাশার খবর নয়।
অথচ আশ্চৰ্য, অম্বিকা যেন খুব একটা হতাশ হয়।
অম্বিকা যেন এসব খবর শোনবার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
কিন্তু কী শোনবার আশাতেই বা ছিল। তবে সে? অমূল্যর শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে খুব একটা দুঃসংবাদ? কে জানে কি! তার মনের কথা সে-ই জানে। তবু— মনে হলো, অম্বিকা যেন ওই খুশির খবরগুলোয় খুশি হলো না।
তবু অম্বিকা নতুন বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইল। বলল, যাবো তো কাল-পরশু কলকাতায়। একবার দেখা করে এলে তো হয়। অবশ্য চিনতে পারবেন। কিনা জানি না।
শোনো কথা! সুবালা হাসে, তোমায় পারবে না চিনতে? তোমাকে কত পছন্দ হয়েছিল তার। আমি তো ভাবছিলাম–
হেসে চুপ করে যায় সুবালা।
কি ভাবছিলেন?
সুবালা মিটিমিটি হেসে বলে, ভাবছিলাম তমাকে তারই জামাই করে দিই! মেয়েটা তো বেশ বড় হয়ে উঠেছে–
আমাকে–জামাই-
অম্বিকা এবার নিজস্ব ভঙ্গীতে হেসে ওঠে সেই আগের মত, চমৎকার! এটা ঠিক আপনার উপর্যুক্ত কথা হয়েছে। বাঃ! বাঃ বাঃ! তাহলে বৃথা আশ্বাস দিচ্ছিলেন না, কনে রেডি? কি যেন হলাম। আমি মেয়েটির? মামা?
আহা, মামা আবার কি? সুবালা সতেজে বলে, কিছুই নয়। জানো না, মামার শালা পিসের ভাই, তার সঙ্গে সম্পর্ক নাই। তুমি হচ্ছে পিসের ভাই—
ব্যস! ব্যস! শাস্ত্রবচনও মজুতা! অম্বিকা বলে, কিন্তু এত সব ছেলেমেয়ের বিয়ে হল, তার মেয়েরই বা হয় না কেন?
সুবালা সন্দেহের গলায় বলে, তার কোন মেয়েটার কথা বলছে তুমি?
আহা, সেই তো সেই যে তোমার এখানে আসে নি। নবদ্বীপে না কোথায় যেন গিয়েছিল!
আশ্চর্য যে এটা ভুলে যায় নি। অম্বিকা।
কিন্তু সে কথা তুলে হাসে না সুবালা। হাসে অম্বিকার অজ্ঞানতায়।
সেই মেয়ে? সেই মেয়ে এখনো বসে আছে, এই ভাবছো তুমি? হায় হায়! চাপা? তার কবে বিয়ে হয়ে গেছে, মেজ মেয়ে চন্ননেরও হয়েছে। এ হচ্ছে, সেই পারুল! সব সময় যে ছোট্ট মেয়েটা চুপচাপ থাকতো—
পারুল! মানে সেই যে দোলাই গায়ে জড়িয়ে মাঠে-বাগানে ঘুরে বেড়াতো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। এই তো মনে পড়েছে বাপু! ওদের মত ফরসা না হলেও সেই মেয়েটাই তো সব চেয়ে সুচ্ছিরি মেজবৌয়ের—
অম্বিকা আবার বলে, চমৎকার! দত্ত জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে একটু ইতারবিশেষ এই যা।
শোনো কথা, তার সঙ্গে কিসের তুলনা? আমি বাপু ওর কথাই ভাবছিলাম—
আপনার ভাবনার দড়িটা একটু খাটো করুন বৌদি, বড্ড লম্বা হয়ে যাচ্ছে!
অম্বিকা আবার হাসতে থাকে হা-হা করে।
সুবালা একসময় অমূল্যকে চুপিচুপি বলে, ঠাকুরপো কিন্তু ঠিক তেমনটিই আছে, একটুও বদলায় নি।
অমূল্য আস্তে বলে, কে বললে বদলায় নি? বদলেছে বৈকি! অনেক বদলেছে!
২.১০ তা বদলাবে এ আর বিচিত্র কি
তা বদলাবে এ আর বিচিত্র কি?
পৃথিবীর খেলাই তো তাই।
না। যদি বদলাতো অম্বিকা, সেটাই হতো অস্বাভাবিক।
বদলায় নি। শুধু অল্পবুদ্ধিরা।
বুদ্ধির চাকার অভাবে ওরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। সুবালা তাদের দলের, তাই সুবালা সুখী। সুবালার সুখ কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। সুবালা যদি দুঃসহ কোনো শোক পায়, সুবালা কেঁদে বলবে, ভগবান নিয়েছেন—
অতএব সুবালা সুখী হবে।
যারা কার্যকারোনের বিচার নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে বসে, যারা জগতের যত অনাচার অবিচার অত্যাচার, সব কিছুর বিরুদ্ধে তীব্র প্রশ্ন তুলতে বসে, তারাই জানে না সুখের সন্ধান।
কিন্তু সন্ধান কি তারা রাখতেই চায়? সুখকে কি তারা আরাধনা করে?
সুখেতে যে তাদের ঘৃণা!
নইলে সুবৰ্ণলতা—
হ্যাঁ, নইলে সুবৰ্ণলতার তো উচিত ছিল তার স্বামীর সুবিবেচনা আর পত্নী প্রেমের পরিচয়ে আহ্লাদে ডগমগ হওয়া।
স্ত্রীকে আকস্মিক আনন্দ দেবার রোমাঞ্চময় পরিকল্পনায় সে যে তার স্ত্রীর বাপের চতুর্থ উপলক্ষে মস্ত একটা যজ্ঞির আয়োজন করে ফেলেছে চুপিচুপি—এটা কি কম কথা নাকি? কম সুখের কথা?
কিন্তু সুবৰ্ণলতা হচ্ছে বিধাতার সেই অদ্ভুত সৃষ্টি, সুখে যার বিতৃষ্ণা, সুখে যার ঘৃণা।
তাই কৰ্মবীর জগু যখন অকস্মাৎ গোটা তিনেক মুটের মাথায় রাশীকৃত বাজার, ফলমূল, কলাপাতার বোঝা, মাটির খুরি-গ্লাস ইত্যাদি নিয়ে তার পিসতুতো ছোট ভাইয়ের বাড়িতে এসে ঢুকে হাঁক পাড়লো, কই রে, কে কোথায় আছিস? এসব কোথায় নামাবে দেখিয়ে দে—
তখন সুবৰ্ণলতা পাথরের মত মুখে এসে দাঁড়িয়ে একটা ধাতব গলায় বলে ওঠে, এসব কি?
দোভাষীর প্রয়োজন স্বীকার করে না।
গলা স্পষ্ট পরিষ্কার। শুধু মুখটা অন্য দিকে।
তবে জগুও অতি নীতি-নিয়মের ধার ধারে না। তাই বলে ওঠে, এই মরেছে! এ যে সেই যার বিয়ে তার মনে নেই, পাড়াপাড়শীর ঘুম নেই!—বলি তোমার বাপের ছোরাদ, আর তুমি আকাশ থেকে পড়ছে? চতুর্থর যোগাড়, দ্বাদশ ব্ৰাহ্মণের ভোজের রসদ, আর তোমার গিয়ে আত্মকুটুম্বও কোন না। ষাট-সত্তরজন হবে। একা আমার পিসির ডালাপালাই তো— জগু একটু উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে কথা শেষ করে, তাদের একটু ভালোমন্দ খ্যাটের যোগাড়—
