অতএব অম্বিকা বলে উঠেছে, আরো ব্যস, সব ব্যবস্থা কমপ্লিট? তা আমিও তো তাহলে দিব্যি একখানি শ্বশুর হয়ে বসে আছি! আমাকে নিয়ে তবে আবার ডাংগুলি খেলবার বাসনা কেন?
সুবালা এ পরিহাসটুকুর অর্থ বোঝে।
সুবালা তাই হেসে উঠে বলে, তুমি যাতে আর ডাংগুলি খেলে বেড়াতে না পারো তার জন্যে। শক্ত শেকল এনে বাঁধতে হবে তোমায়। করছি তার যোগাড়।
কেন, আমার অপরাধ?
এই তো অপরাধ। জীবনটা মিছিমিছি বিকিয়ে দিলে।
অম্বিকা সুবালার এই আক্ষেপে অবোধ বলে অনুকম্পার হাসি হাসল না। অম্বিকা চমকে উঠল। অম্বিকা ভাবলো, আমি কি এই কথাই ভাবছিলাম না।
তারপর অম্বিকা বললে, আপনি তো শেকল যোগাড়ে লাগবেন, বলি শেকল তো আর ভুইফোঁড় নয়? মা-বাপ থাকতে আর কে এই জেলখাটা আসামীকে মেয়ে দেবে শুনি?
শোনো কথা! সুবালা গালে হাত দেয়। এ কী চুরি-জোচ্চারি খুন-জখমের আসামী? লোকে যে তোমাদের এই স্বদেশী জেলখাটাদের পায়ে ফুলচন্নন দেয় গো!
অম্বিকা এবার যেন পুরনো ধরনে হেসে ওঠে। বলে, পায়ে ফুলচন্নন দেয় বলেই যে হাতে মেয়ে দেবে, তার কোনো মানে নেই!
দেবে না?
সুবালাই এবার অনুকম্পার হাসি হাসে, সুবালা যেন তার মূল্যবান দ্যাওরটির মূল্য সম্পর্কে আরো বেশি অবহিত হয়। বলে, আচ্ছা, দেয় কি না দেয় সে আমি বুঝবো! ব্যাটাছেলে বিয়ে করতে চাইলে আবার মেয়ের ভাবনা?
এবার অম্বিকা অমূল্য দুজনেই হেসে ওঠে। অমূল্য বলে, আহা, এ আশ্বাস যদি কিছুদিন আগে পেতাম তো আর একবার চেয়ে। দেখতাম।
এখনও দেখ না। সুবালা হাসে। তারপর গ্রামের কোন কোন ঘরে এমন কটা বুড়ো ঘরে গিন্নী থাকতেও দিবিব আর একটা বিয়ে করে মজায় আছে, তার আলোচনা এসে পড়ে।
অম্বিকা নিথর হয়ে গিয়ে বলে, বল কি দাদা? দত্ত জ্যাঠামশাই?
অমূল্য হাসে, সেই তো, সেটাই হচ্ছে সব চেয়ে অসহ্য। গিয়েছিলেন ভগ্নীর ছেলের জন্যে কিনে দেখতে-
দেখে আর চোখ ফেরাতে পারলেন না, নাতির হাতে তুলে দিতে বুক ফাটলো—, সুবালা হেসে হেসে বলে, সম্পর্কটা অবিশ্যি খারাপ হল না। নাতবৌ হতো, বৌ হলো। তেরো আর তেষট্টি!
অম্বিকা হাসে না, অম্বিকা হঠাৎ রূঢ় গলায় বলে ওঠে, লোকটাকে ধরে এক দিন হাটতলায় দাঁড় করিয়ে চাবাঁকাতে পারলে না কেউ?
এরা চমকে উঠলো।
সুবালা আর অমূল্য।
অম্বিকার গলায় কখনো এমন রূঢ় স্বর শোনে নি এর আগে। তা যতই হোক, দত্ত জ্যাঠামশাই গুরুজন!
অম্বিকা সেটা বুঝতে পারলো।
অম্বিকা নিজেকে সামলে নিল, অপ্ৰতিভ গলায় বললো, জেলের ভাতের এই গুণ ধরেছে, রাগ চাপতে পারি না। অসভ্যতা দেখলেই মেজাজ আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে। বাস্তবিক, এদের শাস্তি দেওয়া উচিত। কিনা তোমরাই বল?
উচিত তো! কিন্তু শাস্তিটা দিচ্ছে কে?
আমি তুমি, এরা ওরা, সবাই। অম্বিকা দৃঢ় গলায় বলে, কিছুদিন স্রেফ ধোলাই চালালেই এ ধরনের পাজীরা শায়েস্তা হয়ে যাবে।
সুবালা যেন অবাক হয়ে অম্বিকার মুখের দিকে তাকায়। বলে, ধোলাই মানে?
অম্বিকা আর একবার অপ্রতিভ হয়। বলে, ওই তো! সঙ্গগুণের সুফল! যত–সব চাষাড়ে কথার চাষের মধ্যে তো বাস ছিল। ধোলাই মানে ধরে ঠ্যাঙানো! দু-পাঁচজন মার-ধোর খাচ্ছে দেখলেই আর পাঁচজন সামলে যাবে।
অমূল্য ক্ষুব্ধ হাসি হাসে, তোর ওই ধোলাই তা হলে পাত্তরকে না দিয়ে পাত্রীর ব্যাপকেই দেওয়া উচিত। তারা মেয়ে দেয় কেন?
সুবালা বলে ওঠে, দেয়, ভাল ঘরে-বরে দিয়ে উঠতে পারে না বলে, নচেৎ টাকাকড়ির লোভে। এই তো তোমাদের দত্ত জ্যাঠামশাইয়ের ব্যাপারই তাই। মেয়ের বয়েস বেশি হয়ে গেছে, জাত যাবার ভয়ে কাতর বাপ হাতের সামনে একটা বড়লোক বুড়ো পেয়ে—
জাত! জাত যাবার ভয়! আশ্চর্য, এত অনাচারে জাত যাচ্ছে না, জাত যাবে শুধু মেয়েকে সাতসকালে বিয়ে না দিলে! অম্বিকা বলে, এ পাপের ফল একদিন পাবেই সমাজ!—তা দত্তজেঠিমা কোথায়?
কোথায় আবার? সুবালা বলে, ঘর-সংসার ছেড়ে যাবেন কোথায়? আছেন। প্রথম প্রথম খুব গালমন্দ করেছিলেন, সতীনটাকে বাটা মারতে যেতেন, ক্রমশঃ সয়ে গেছে। এখন তাকে রেঁধে ভাতও দিচ্ছেন। সেও মহা দুষ্ট মেয়ে! সংসারে কিছু করে না, কেবল সাজেগোজে আর কর্তার তামাক সাজে।
হুঁ। ওটাকেই আশ্রয় ভেবেছে। বুড়ো মরলে তখন? ছেলেরা কে কোথায়?
বড় তো রাগ করে বাপের সঙ্গে পৃথক অন্ন হয়ে গেছে। আর সবাই আছে।
তা যিনি পৃথক অন্ন হলেন, মাকে ভাইদের নিয়ে হতে পারলেন না?
কি যে বল, তার কি ক্ষমতা? বাপ তো তাকে তেজ্যপুত্তুর করেছেন। আসল কথা, সুপ্রিয়ালা লোকেদের সব দরজা খোলা, বুঝলে ঠাকুরপো মরণ শুধু গরীবদের। পৃথিবী জুড়েই এই।
অম্বিকা বলে, হয়তো এর শাস্তিও আসবে একদিন পৃথিবীতে। তবে আমার মতে, কবে কি হবে মুক্তিত্ব এখনই একটা বৌ বেঁচে থাকতে আর একটা বিয়ে করা আইন করে বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
অমূল্য হাসে, আইনটা কে করবে শুনি?
করবো। আমরা, তোমরা, সবাই। চিরদিন ধরে ভয়ঙ্কর একটা পাপ চলতে পারে না।
সুবালার এসব কথায় অস্বস্তি।
সুবালা এবার প্রসঙ্গকে অন্য পথে পরিচালিত করে। সুবালা তার ছেলের বৌদের আর জামাইদের কথা তোলে, তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়, বলে, আমার ভাগ্যে বাবা সবাই খুব ভালো জুটেছে—
অম্বিকা হেসে ফেলে।
অম্বিকা বলে, আপনার ভাগ্যে মন্দ হবার জো কি? আপনি কি কাউকে ভালো ছাড়া মন্দ দেখবেন?
সুবালা লজ্জিত গলায় বলে, আহা! বলে, নাও বাপু, বল এখন কি খাবে? কতকাল বাড়ির রান্না খাও নি—
