তবু হাসি।
হেসেই উত্তর।
বিয়ে! নাঃ, আপনি দেখছি চুলগুলো মিছিমিছিই পাকিয়েছেন, বিয়েসে সামনে না হেঁটে পিছনে হাঁটছেন!
সুবালা অবাক হয়ে বলে, তার মানে?
অমূল্য এতক্ষণ মিটমিটি হাসছিল বসে বসে। এবার বলে, মানে আর কি, অম্বিকার মতে তোমার শুধু চুলই পেকেছে, বুদ্ধি পাকে নি।
কেন? কাঁচা বুদ্ধির কি দেখলে শুনি?
অম্বিকা হাসে, পুরোপুরিই দেখলাম। এখনো আপনার দ্যাওরের বিয়ে দেওয়ার শখ!
হ্যাঁ, এই রকম করেই বলে অম্বিকা।
হৈ-হৈ করে বলে ওঠে না, কাঁচা বুদ্ধি নয়? শুধু বিয়ের মতলবটি এঁটেই বসে আছেন, কই কনে রেডি করে রাখেন নি? টোপ চেলি ঠিক করে রাখেন নি? কে বলতে পারে আবার কখন শ্ৰীঘর থেকে ডাক পড়ে?
আগেকার অম্বিকা হলে এই রকমই বলতো!
এখনকার অম্বিকা বলে, এখনো আপনার দ্যাওরের বিয়ে দেওয়ার শখ?
সুবালা ভাঙা দাঁতের হাস্যকর হাসি হেসে বলে, তা কখন আর শখ করবার সুবিধা পেলাম শুনি? তুমি তো বসে আছ শ্ৰীঘরে, এদিকে কত ঘটনাই ঘটে গেল, ঘটে চলেছে। তোমার চার-চারটে ভাইপো-ভাইঝির তো বিয়ে হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে!
চার-চারটে ভাইপো-ভাইঝি!
অম্বিকা অর্থই জলে পড়ে।
এতগুলো ছেলেমেয়ে বিয়ের যোগ্য হয়েছিল অমূল্যর? তাছাড়া বিয়ের যোগ্যতা! ওর মধ্যে কোনটা মেয়ে, কোনটা বা ছেলে! হঠাৎ কারো নাম মনে পড়ছে না কেন? বড় বড় ছেলে দুটোর নাম রাসু ঘু বন্ধ ছিল না; রাসবিহার, বন্ধুবিহার, কিন্তু, তারপর? সারি সারি অনেকগুলো ছিল যে?
আশ্চর্য!
এমন স্মৃতিভ্ৰংশ হল অম্বিকার?
দাদার ছেলেমেয়েগুলোর নাম ভুলে গেল? ভুলে গেল কোনটা কত বয়সের ছিল? মুখই বা মনে পড়ছে। কই তেমন করে?
পড়ছে আস্তে আস্তে।
নামও… ভাবতে ভাবতে ভেসে উঠেছে, রাসু, বন্ধু, টিন্ধু, কুলু, নেড়ু টেপু… আরো কি কি যেন! একটা দল হিসেবেই তাদের দেখেছে। অম্বিকা, খুব যেন আলাদা করে নয়।
দাদার ছেলেমেয়েরা!
এই অনুভবের মধ্যে ছিল তারা!
কিন্তু সেই বালখিল্যের দল এত লায়েক হয়ে উঠল এর মধ্যে?
তার মানে সময়ের সেই বিরাট অংশটা হারিয়ে ফেলেছে। অম্বিকা তার জীবন থেকে। অম্বিকা বুড়ো হয়ে গেছে!
কিন্তু জীবনের ওপর কবে মোহ ছিল অম্বিকার? কবে ছিল লোভ? তাই হারিয়ে ফেলেছে বলে মনটা হায় হায় করে উঠল?
হয়তো এমনিই হয়। শুধু অম্বিকার মত পাগলাদের নয়, সকলেরই!
যে মায়া-হরিণের পিছনে ছুটতে ছুটতে সময়ের জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মানুষ, সেই হরিণটা যখন একটা দুয়ো দিয়ে দিগন্তের ধূসরতায় মিলিয়ে যায়, তখন মনটা এমনি হায় হায় করে ওঠে। মনে হয় এতগুলো দিন-রাত্ৰি হারিয়ে গেল! কি করলাম? কি বা পেলাম?
হ্যাঁ, সেটাই হাহাকারের স্বর।
কী পেলাম! কী পেলাম!
যেন কে কোথায় অঙ্গীকার করে রেখেছিল পাইয়ে দেবে অনেক কিছু।
যেন বলে রেখেছিল, তোমার ওই দিনরাত্রিগুলো আমার কারবারে ফেল, তার বিনিময়ে পাওনার পাহাড় জমবে তোমার।
কেউ দিয়েছিল। সেই আশ্বাস?
কেউ করেছিল সেই অঙ্গীকার?
একখানা মূল্য নির্ধারণ করে রেখেছিল, আমার এই দিনরাবিতে গড়া জীবনের?
জানি না।
দেখি নি তেমন কাউকে।
তবু ওই প্ৰাপ্তির ধারণাটা আছে। বদ্ধমূল। নিশ্চিন্ত হয়ে আছি। এই ভেবে যে আমার সোনার দিনগুলো বিকোচ্ছি বসে বসে, তার বদলে জমা হচ্ছে স্বর্গের সোনা। খানিকটা এগিয়ে গেলেই সেই স্বর্গীয় সোনার তালটাকে ধরে নেব খপ করে, ভরে নেব মুঠোর মধ্যে।
কিন্তু সে সোনার আশ্বাস মায়া-হরিণের মতোই অনেক ছুটিয়ে মেরে অকস্মাৎ কখন একসময় দিগন্তের ধূসরতায় মিলিয়ে যায়, তখন ক্ষুব্ধ নিঃশ্বাস মর্মরিত হয়ে ওঠে, পেলাম না, আমি আমার যথার্থ মূল্য পেলাম না। আমি ঠিকে গেলাম। আমি কত দিলাম, কী বা পেলাম! যেন আমার মনিব আমায় সারা মাস খাঁটিয়ে নিয়ে মাসের শেষে মাইনে দিল না!
আশ্চর্য!
কে বলেছে আমার এই জীবনটা ভারী এক দামী জিনিস? কে বলেছে আমার এই দিনরাত্রিগুলো সোনার দরের?
নিজেই নিজের দাম কষছি, মোটা অঙ্কের টিকিট মারছি তার গায়ে, ভেবে দেখছি না কেন তা করছি! করছি হায় হায়! ভেবে দেখছি না। আমি কেউ না, আমি এই নিখিল বিশ্বের অন্যাহত লীলার একটা অবিচ্ছিন্ন অংশ মাত্র। বাড়তি কিছু পাওনা নেই আমার।
কেউ ভাবি না, কেউ ভাবে না।
অম্বিকাও তা ভাবল না।
অম্বিকা ভাবলো, এতগুলো দিন হারিয়ে ফেললাম! ভাবলো, কী বা পেলাম তার বিনিময়ে?
তাই কেমন যেন দিশেহারার মত বলে উঠলো, কাদের বিয়ে হয়ে গেল?
কেন রাসু, বন্ধু, টেঁপি আর নিভার। নিভাটার অবিশ্যি একটু সকাল সকালই হয়ে গেল, ভাল পাত্তর পেয়ে যাওয়া গেল। আর দিতেই তো হবে। চারটের হিল্লেী হয়েছে, বাকি ছটার হয়ে গেলেই আমাদের ছুটি। তারপর বুড়োবুড়ী কাশীবাস করবো।
বাকি ছটার হয়ে গেলেই–
অম্বিকা ওই দুঃসাহসী আশার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে। তারপর ভাবে, হয়তো সেই অসাধ্যসাধন করেই ফেলবে ওরা, হয়তো সত্যিই শেষ অবধি নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী তীর্থবাস করতেও যাবে। আর সমস্ত কর্তব্য সমাধা করার যে একটা আত্মতৃপ্তি, সেটুকু রসিয়ে উপভোগ করবে।
অম্বিকা অন্তত তাই ভাবলো।
তাই অম্বিকা সহসা ওদের জীবনটাকে হিংসে করে বসলো।
অনেকদিন জেলের ভাত খেয়ে খেয়ে এ উন্নতিটুকু তা হলে হয়েছে অম্বিকার! অম্বিকা তার স্বপ্ন থেকে শ্বলিত হয়ে তুচ্ছ জীবনের দিকে তৃষ্ণার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
অম্বিকা তাই কাঁচা-বুদ্ধি সুবালার কাঁচামি-টাকেই দীর্ঘ বিলম্বিত করে দেখতে চাইছে।
