একসঙ্গে মা-বাপ। হারালো!
বেচারা বেঁটা!
এ আবার কোন ধরনের খবর?
কাদের বৌ?
এবার আর ঔদাসীন্য দেখানো যায় না। মান খুইয়ে বলতেই হয় শ্যামাসুন্দরীকে, হলোটা কী?
হলো না-টা কি তাই বল? মা গেল। খবরটাও দিল না কেউ তারপর পিঠপিঠ কদিন পরেই বাপ গেল, তখন খবর। নে এখন জোড়া চতুর্থ করে মর।
শ্যামাসুন্দরীও ক্রুদ্ধ হন।
বলেন, কার বৌ, কি বৃত্তান্ত বলবি তো সে কথা?
কার বৌ আবার? শ্ৰীমান প্ৰবোধবাবুর বৌয়ের কথাই হচ্ছে। বেচারা মেজবৌমার কথা। বাপ বুঝি মরণকালে একবার দেখতে চেয়েছিল, তাই গিয়েছিলেন মেজবৌমা! তখন বলেছে, মা তোর মরেছে, তবে অশৌচ নেওয়া নিষেধ। দুদিন বাদে নিজেও পটল তুললো।
শ্যামাসুন্দরী যদিও বুড়ো হয়েছেন, কিন্তু কথায় সতেজ আছেন। তাই সহজেই বলেন, তোর মতন মুখ্যুর সঙ্গে কথা কওয়াও আহম্মুকি! বলি খবরটা তুই পেলি কোথায়?
আরে বাবা, স্বয়ং তোমার ভাগ্লোব কাছেই। আসছিল এখানেই, বাজারে দেখা। আসবে, এক্ষুনি আসবে। দু-দুটো চতুর্থী, ব্যাপার তো সোজা নয়, ঘটা পটা হবে। তাই আমার কাছে আসবে পরামর্শ করতে। এই জগা শৰ্মা না হলে যজ্ঞি। সুশৃঙ্খলে উঠুক দেখি? ইঃ বাবা!
শ্যামাসুন্দরী কিন্তু এ উৎসাহে যোগ দেন না। বলিরেখাঙ্কিত কপালে আরো রেখা পড়িয়ে বলেন, ঘটোপটাটা করছে কে?
কে আবার! তোমার ভাগ্নেই করছে। বললো, তোমার মেজবৌমার বড় ইচ্ছে—
শ্যামাসুন্দরী অবাক গলায় বলেন, মেজবৌমার ইচ্ছে? মা-বাপের সঙ্গে তো কখনো—
ওই তো–এখন অনুতাপটি ধরেছে! সেই যে কথায় আছে না, থাকতে দিলে না ভাতকাপড়, মরলে করলো দানসাগর তাই আর কি।
শ্যামাসুন্দরী দৃঢ় গলায় বলেন, মেজবৌমা সে ধরনের মেয়ে নয়।
জগু অবাক গলায় বলে, তাই নাকি? তবে যে পেবো বললে—
কথা শেষ হয় না, স্বয়ং পেবোই ঢোকে দরজাটা ঠেলে।
বলে, এই যে মামী, তুমিও রয়েছ। পরামর্শ করতে এলাম। মায়ের তো শরীর খারাপ, এখন তুমিই ভরসা। দায়টা উদ্ধার করো তোমার মায়ে-ছেলেয়। সোজা দায় তো নয়, শ্বশুরদায় শাশুড়ীদায়। মাতৃদায় পিতৃদায়ের অধিক।
আপন রসিকতাশক্তির পুলকে টেনে টেনে হাসতে থাকে প্ৰবোধ হ্যাঁ-হ্যাঁ করে।
২.০৯ অনেকগুলো বছর জেলের ভাত খেয়ে
অনেকগুলো বছর জেলের ভাত খেয়ে অবশেষে একদিন বাড়ি ফিরল অম্বিকা। কালো রংটা আরও একটু কালো হয়ে গেছে, পাকসিটে চেহারাটা যেন আরো পাকসিটে আর জীর্ণ হয়ে গেছে, চুলের গোড়ায় গোড়ায় বিবৰ্ণ সাদাটে ছাপ। যেন পাকতে শুরু করে নি বটে, কিন্তু একসঙ্গে সবই পাকবে বলে নোটিশ দিয়েছে।
তবু মোটামুটি যেন তেমন কিছু বদল হয় নি। মনে করা যায় এতগুলো বছর পরে সেই অম্বিকাই ফিরে এল।
ফিরে এল অধিকা তার দাদা-বৌদির কাছে। বলতে গেলে সুবালার সুবালার কাছেই।
সুবালার চেহারায় অবশ্য অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সুবালার চুলগুলো বেশ পেকেছে, ঠিক সামনের দুটো দাঁত পড়ে গেছে, আর রংটা জ্বলে-পুড়ে গেছে। দারিদ্র্যকে যে কেন অনলের সঙ্গে তুলনা করা হয় সেটা অনুভব করা যাচ্ছে তাকে দেখে।
তথাপি সুবালার প্রকৃতিতে খুব একটা পরিবর্তন হয় নি। সুবালা অম্বিকাকে দেখেই প্রথমে আহ্লাদে কেঁদে ফেললো। তারপর সুবালা শাশুড়ীর নাম করে কান্দলো, কান্দলো অম্বিকার বাড়িতে চোর পড়ে যথাসর্বস্ব নিয়ে গেছে বলে, আর অভাবের জ্বালায় যে সেই চোর-আধুষিত বাড়িটার ভাঙা পাঁচিল আর ভাঙা জানালা মেরামত করে রাখতে পারে নি। সুবালারা, তা নিয়ে কান্দলো এবং সর্বশেষে কান্দলো অম্বিকাকে আর বিপদের পথে পা না বাড়াতে মাথার দিবি দিয়ে।
শেষ কথাটার শেষে অম্বিকা একটু ক্ষুব্ধ হাসি হেসে বলে, আর বিপদ কোথা? দেশ তো বেশ ঠাণ্ডা মেরে গেছে। বিপদ যারা বাধাচ্ছিল তাদের শায়েস্তা করা হয়েছে, এখন দেশের কেষ্ট-বিষ্ট নেতারা কথার জাল ফেলে ফেলে স্বাধীনতারূপ বোয়াল মাছটি টেনে তোলবার তাল করছেন। এর মধ্যে আর আমরা কোথায় পা বাড়াতে যাব? আমরা এখন দাবার আড্ডায় বসে ক্ষুদিরাম, কানাইলাল, প্ৰফুল্ল চাকি, বাঘা যতীনের আলোচনায় উদ্দীপ্ত হবো। আর বসে বসে দিন গুনবো কবে কখন সেই স্বাধীনতা নামের রসালো ফলটি গাছ থেকে টপ করে খসে পড়ে।
তা অম্বিকার যে একেবারেই পরিবর্তন হয় নি তা বলা যায় না। আগে অম্বিকা ব্যঙ্গের সুরে কথা জানত না, এখন সেটা শিখেছে।
কিন্তু সুবালা এসব প্রসঙ্গের ধারে-কাছে আসতে চায় না, কারণ সুবালা অত বোঝে না। হয়তো বা বুঝতে চায়ও না।
তাই সুবালা তাড়াতাড়ি বলে, যাক গে বাবা ওসব কথা। আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবরে দরকার কি? আমার কথা হচ্ছে – এবার তোমার বিয়ে দেব!
হ্যাঁ, এই সঙ্কল্পই স্থির করেছে এখন সুবালা, ওই বাউণ্ডুলে ছেলেটার বিয়ে দেবে। বয়েস একটু বেশি হয়ে গেছে, তা যাক, দোজবরে তেজবরে তো নয়? কত কত দোজবরে তেজবরে যে ওর ডবলবয়সী হয়েও বিয়ে করতে ছোটে!
মেয়ের অভাব হবে না।
বাংলা দেশে আর যে কিছুরই অভাব থাক না কেন, কনের অভাব নেই। আর সুবালার মতে বিয়ে না করে বুড়িয়ে যাওয়ার মত দুঃখের আর কিছু নেই।
সুবালা ইতিমধ্যে তার দুই ছেলের বিয়ে দিয়ে কাজ সেরেছে। যদিও সংসারের অবস্থা সুবিধেয় নয়, কিন্তু সংসারের অবস্থা বিয়ের প্রতিকূল হয়েছে কেন এ তর্ক করেছে সুবালা। আর শেষ অবধি তর্কে সে-ই জিতেছে। তাই এখনও বললো, বিয়ে দেব। জানে-জিতবো।
কিন্তু অম্বিকা ছিটকে উঠলো, বললো, বিয়ে? অম্বিকা হেসে ফেলল। কিন্তু আগের মত সেই হো হো হাসির প্রাণখোলা সুরাটা যেন অনুপস্থিত রইল সে হাসিতে। এ হাসি কেমন একরকম নিরুত্তাপ হাসি।
