আগে আমি ওদের অবজ্ঞা করতাম— সুবৰ্ণলতা ভাবে, যারা লড়াইয়ের পথ ধরে নি, নির্বিচারে বশ্যতা স্বীকার করে বসে আছে। এখন আর অবজ্ঞা করি না তাদের। বুঝতে পারি, এদের লড়াইয়ের শক্তি নেই, তাই নিরুপায় হয়ে ঐ দ্বিতীয় পথটা বেছে নিয়েছে। ওদের অনুভূতি নেই, ওরা ওতেই খুশি,–এ কথা আমাদের ভাবা ভুল হয়েছে।
সত্তার বদলে শান্তি কিনেছে। ওরা, আত্মার বদলে আশ্রয়। কারণ এ ছাড়া আর উপায় নেই ওদের!
সমাজ ওদের সহায় নয়, অভিভাবকরা ওদের অনুকুল নয়, প্রকৃতি পর্যন্ত ওদের প্রতিপক্ষ! ওরা অন্ধকারের জীব!
খামে বন্ধ চিঠিটা একবার হাত নিয়ে অনুভব করলো সুবৰ্ণলতা। এই নিঃসীম অন্ধকারে বসে যদি পড়া যেত!
যদি দিনের আলোয় কি দীপের আলোয় এমন একটু নিঃসীম নির্জনতাও পেত সুবর্ণ, হয়তো খুলে ফেলতো। রুদ্ধ কপাট। বিহ্বল দৃষ্টি মেলে দেখতো কোন কথা দিয়ে গেছে তাকে তার মা।
কিন্তু কোথায় সেই নির্জনতা?
চারিদিকে চোখ।
বিদ্রূপে অথবা কৌতুকে, কৌতূহলে অথবা অনুসন্ধিৎসায় যে চোখেরা সর্বদা প্রখর হয়ে আছে। কত বেশি চোখ পৃথিবীতে! সুবৰ্ণলতার এই নিজের গোলাপী-রঙা দোতলাটাতেও এতে বেশী লোক ওমে উঠেছে? এত বেশী চোখ? অথচ এদের জন্যে অসহিষ্ণু হওয়া চলে না, এরা সুবৰ্ণলতার। এদের সমস্ত দায়-দায়িত্ব বহন করেই চলতে হবে শেষ দিনটি পর্যন্ত। এদের বিয়ে দিতে হবে, সংসারী করে দিতে হবে, অসুখ করলে দেখতে হবে, আঁতুড়ে ঢুকলে আঁতুড় তুলতে হবে, আর এদের মন-মেজাজ বুঝে বুঝে কথা বলতে হবে। এদের অবহেলা করা চলবে না, এড়ানো যাবে না, তুচ্ছ করা যাবে না। তা করতে গেলে এরা তৎক্ষণাৎ ফোঁস করে উঠে তার শোধ নেবে। কারণ সুবৰ্ণলতাই এদের শিখিয়েছে–সব মানুষই সমান। শিখিয়েছে–মানুষ মাত্রেরই স্বাধীনতার অধিকার আছে।
ওরা যদি শিক্ষার আলাদা একটা অর্থ বোঝে, নিশ্চয় সেটা ওদের দোষ নয়, দোষ সুবৰ্ণলতার শেখানোর।
নিজের হাতের তৈরি ড্রাগনের হাঁ থেকে পালাবে কি করে সুবৰ্ণ?
সুবৰ্ণ উপায় খোঁজে।
পালাবার, অর্থাৎ পালিয়ে প্রাণ বাঁচাবার চিরাচরিত পদ্ধতিগুলোয় আর রুচি নেই সুবর্ণর। অনেকবার চেষ্টা করেছে, যম তাকে ফেরত দিয়ে গেছে, একবার নয়, বার বার।
আহা, যদি অকারণ শুধু শুয়ে পড়ে থাকা যেত! কোনোদিকে তাকাতে হতো না, শুধু দিনে-রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে পড়ে থাকা!
মৃত্যুর পরে যেমন করে সংসারের দিকে মুখ ফিরোয় মানুষ তেমনি!
আজ এই ভয়ঙ্কর একটা শূন্যতার মুহূর্তে সংসারটা যেন তার সমগ্র মূল্য হারিয়ে একটা মৃৎপিণ্ডের মত পড়ে থাকে। সুবৰ্ণলতা সেই মৃৎপিণ্ডটাকে ত্যাগ করবার উপায় খোঁজে। সুবৰ্ণলতা বুঝি ঐ মাটির বোঝার ভার আর বইতে পারবে না।
২.০৮ ভাগ্নের বাড়ির খবর
শুনেছ মা, তোমার ভাগ্নের বাড়ির খবর?
জগু বাজার থেকে ফেরে একজোড়া ডাব হাতে ঝুলিয়ে, পিছন পিছন নিতাই কাঁধে ধামা নিয়ে।
ভারি জিনিস-টিনিসগুলো নিজেই বয়ে আনে জগু, হাল্কাগুলো নিতাইয়ের ধামায় দেয়। দেয়। নেহাতই মাতৃভয়ে! ফুলকোঁচা দিয়ে ধুতি পরতে শিখেছে নিতাই, গায়ে টুইল শার্ট। খাওয়া-দাওয়া বাবুয়ানার শেষ নেই। এর ওপর যদি দেখা যায়, খালি হাত নাড়া দিয়ে বাজার থেকে ফিরছে। নিতাই, আর জগু আসছে মোট বয়ে, রক্ষে রাখবে না মা।
অবশ্য মার চোখে পড়বার সুযোগ বড় একটা হয় না, কারণ বাজার থেকে যখনই বাড়ি ঢোকে জগু, চেঁচাতে চোঁচাতে আসে, বাজার-টাজার করা আর চলবে না, গলায় ছুরি-মারা দর হাঁকিছে! ডবল পয়সা ভিন্ন একটা নারকোল দিতে চায় না, ডাবের জোড়া ছ। পয়সা। আর মেছুনী ম্যাগীগুলোর চ্যাটাং চ্যাটাং বুলি শুনলে তো ইচ্ছে করে, ওরই ওই আঁশ বঁটিটা তুলে দিই নাকটা উড়িয়ে….. ভাবলাম নিতাই ছোঁড়াটাসুদ্ধ আমাদের সঙ্গে জুটে নিরিমিষ্যি গিলে গিলে মরে, আজ নিয়ে যাই পোয়াটাক কাটা পোনা, তা বলে কিনা চার আনা সের!… গলায় ছুরি দেওয়া আর কাকে বলে! একটা আধলা ছাড়ল না, পুরো আনিটা নিল। গলায় ছুরি আর কাকে বলে!
এমনি বহুবিধ ধুয়ো নিয়ে বাড়ি ঢোকে।
সেই ধুয়োর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যান শ্যামাসুন্দরী। ইত্যবসরে জগু হাতের মালপত্ৰ নামিয়ে ফেলে।
তারপর নিতাইকে নিয়ে হাঁকডাক শুরু করে দেয়। ছেলেটা যে শ্যামাসুন্দরীর হৃদয়মধ্যস্থিত বাৎসল্য রস আদায় করে ফেলেছে, এটা টের পেয়ে গেছে জগু, যতই কেন না সেটা চাপতে চেষ্টা করুন শ্যামাসুন্দরী। তাই জগু এখন নিশ্চিন্ত এবং সেই নিশ্চিত্ততার বশেই ছেলেটাকে শাসন করার ভান করে।,
হাত-পা গুটিয়ে বসে রাইলি যে? সংসারে একটা কাজে লাগতে পার না? কী একেবারে কুইন ভিক্টোরিয়ার দৌত্তুর এসেছো তুমি? একেই বলে—কাজে কুঁড়ে আর ভোজনে দেড়ে!
শ্যামাসুন্দরী এক-এক সময় বলে ওঠেন, থাম জগা, আর ফাঁকা বন্দুকের আওয়াজ করিস না। ওর উপকারের বদলে মাথাটাই খেলি ওর। গরীবের ছেলেকে লাটসাহেব করে তুললি-
জণ্ড আবার তখন অন্য মূর্তি ধরে।
বলে, লাটসাহেব হয়ে কেউ জন্মায় না। আর গরীবের ছেলে বলেই চোরদায়ে ধরা পড়ে না। লাটসাহেবী! লাটসাহেবীর কি দেখলে? একটা ফরসা জামাকাপড় পরে, তাই? বলি ভগবানের জীব নয় ছেঁড়া?
প্রত্যহ প্ৰায় একই ধরনের কথাবার্তা, শুধু আজকেই ব্যতিক্রম ঘটলো। আজ জণ্ড তার মার কাছে অন্য কথা পাড়ে।
বলে, শুনেছ তোমার ভাগ্লের বাড়ির কাণ্ড?
ছেলের কথায় কান দেওয়া শ্যামাসুন্দরীর স্বভাব নয়, দেনও না, আপন মনে হাতের কাজ করতে থাকেন। জগু ক্রুদ্ধ গলায় বলে, বড়লোকের মেয়ের যে দেখছি গরীবের ছেলের কথাটা কানেই গেল না! বেচারা বেঁটা একসঙ্গে মা-বাপ। হারালো, সেটা এমন তুচ্ছ কথা হলো?
