সুবৰ্ণ বুঝতো!
কিন্তু সুবৰ্ণর বাবা তা করেন নি!
আর সুবর্ণর মা তার চিঠির জবাব চায় না বলে গেছে—আমি মরলে তবে দিও সুবৰ্ণকে!
কী দরকার ছিল এই মুষ্টিভিক্ষায়?
সারা শরীর তোলপাড়-করা একটা প্ৰবল বাম্পোচ্ছাস যেন সেই পাথরকে ভাঙতে চাইছে।
হাতের মুঠোর মধ্যে বন্ধ রয়েছে সেই মুষ্টিভিক্ষার নমুনাটুকু।
বন্ধ খাম বন্ধই রয়েছে।
সুবৰ্ণলতা খুলবে না ও খাম, দেখবে না। কী লেখা আছে ওতে।
নিরুচ্চার থাক সুবৰ্ণলতার নিষ্ঠুর মায়ের নিষ্ঠুরতার নমুনাটা।
মাকে যদি দিয়েও যদি এত বড় জীবনটা কেটে গিয়ে থাকে সুবর্ণর তো বাকী জীবনটাও যাবে।
সুবৰ্ণলতা ভাবুক, যে বস্তু ছিল না, তার আবার হারানো কি? সুবৰ্ণলতার মা নেই, মা ছিল না।
কিন্তু সত্যই কি ছিল না?
কোনোদিনই না?
সুবৰ্ণলতার জীবনের নটা বছর একেবারে নয় হয়ে যাবে?
সুবৰ্ণলতার সেই নবছরের জীবনের সমস্ত জীবনাকাশ জুড়ে নেই একখানি অনির্বাণ জ্যোতি? সেই জ্যোতির পরিমণ্ডলে ও কার মুখ?
সুবৰ্ণলতার মায়ের মুখ কি ভুলে গেছে সুবৰ্ণ?
সুবৰ্ণর জীবন-আকাশের সেই জ্যোতি চিরতরে মুছে গেছে? মুছেই যদি গেছে তো সুবৰ্ণলতা কোন আলোতে দেখতে পাচ্ছে ওই ফ্রক-পরা ছোট মেয়েটাকে?
যে মেয়েটা স্কুল থেকে ফিরেই হাতের বইখাতা নামিয়ে রেখে দুদ্দাড়িয়ে ছুটে এগিয়ে গেছে তার মায়ের কাছে দু হাত বাড়িয়ে?
মা! মা! মা!
মা অবশ্য হাঁ-হাঁ করে উঠেছে, ছুসনে, ছুসনে, ইস্কুলের জামাকাপড়-
কিন্তু মায়ের চোখের কোণে প্রশ্রয়, মায়ের ঠোঁটের কোণে হাসি।
আর শোনে কেউ তাঁর মিথ্যে নিষেধের সাজানো বুলি! জড়িয়ে না ধরে ছাড়ে?
অন্ধকার, নিঃসীম অন্ধকার। এই অন্ধকারের সমুদ্রে তলিয়ে গিয়ে বুঝি ঐ ছোট্ট মেয়েটার সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে সুবৰ্ণ।
কিন্তু ওই অতল অন্ধকারের মধ্যে দৃষ্টি তেমন চলে না। শুধু শব্দতরঙ্গ পড়ে আছড়ে আছড়ে।
সেই তরঙ্গে তরঙ্গে ভেসে যাচ্ছে সুবর্ণ।
শব্দ, শব্দ!
স্মৃতির কোটোয় ভরা বুঝি স্তরে স্তরে? আজকের ধাক্কা লেগে তারা উঠে আসছে, ছড়িয়ে পড়ছে, নতুন করে ধ্বনিত হচ্ছে।
প্রথম ভোরে যে শব্দটা সেই ছোট মেয়েটার ঘুমের শেষ রেশকে সচকিত করে ধাক্কা দিয়ে যেত, সে হচ্ছে হাড়-পাজরা বার করা ঘোড়ায় টানা ময়লা-গাড়ির বানাৎ বানাৎ শব্দ।
অবিশ্বাস্য একটা জঞ্জালের স্তূপ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে গাড়িটা। আর শব্দ উঠছে ঝন-ঝন-ঝনাৎ। সেই শব্দের সঙ্গে আর এক শব্দ, সুবর্ণ এবার উঠে পড়া। সুবর্ণ অবশ্যই এক কথায় উঠে পড়তো না, তখন একটু মৃদু ধমক। কিন্তু সেই ধমকের অন্তরালে যেন প্রশ্রয়ের মাধুর্য। সুবৰ্ণ উঠে পড়তো, আর শব্দ শুনতে পেতো মায়ের রান্নাঘরের বাসনপত্র নাড়ার শব্দ। সেই শব্দের মধ্যে মা মাখানো। দুপুরের নির্জনতায় আর একটা শব্দ উঠতো, ঠেং ঠং ঠং! বাসনওলা চলেছে চড়া রোদ্দুরে, তার মাথার ওপর। বাসনের ঝাঁকা, আর হাতে একটা কাসির সঙ্গে একটুকরো কাঠ। সেই কাঠটুকুতেই কাসির গা থেকে শব্দ উঠছে— ঠং, ঠং, ঠং!
সেই শব্দ–
দুপুরের নির্জনতায় যেন একটা শিহরণ জাগিয়ে দিয়ে যেত। মনটা হু-হু করে উঠতো। শেলেট পেনসিল রেখে মায়ের কাছে গিয়ে গা ঘেষে। বসতে ইচ্ছে করতো।
মা বলতো, কি হল? লিখতে লিখতে উঠে এলি যে?
মেয়েটা মায়ের গা ঘেষে বসে বলতো, এমনি।
মা মেয়েটার ঝুমরো চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিতে দিতে স্নেহভরা গলায় বলতো, এমনি মানে? এমনি কিছু হয় নাকি?
মেয়েটা মায়ের গালে গাল ঘষে ঘষে বলতো, হয়, হয়! এই তো হলো!
তখন যদি দুপুরের সেই নির্জনতা ভেদ করে আবার হাঁকি উঠতো, ট্যাপারি, টোপাকুল, নারকুলে কু-ল!
অথবা হাঁক উঠতো—চীনের সিঁদুর! চাই চীনে-র সিঁদুর- কিছুই এসে যেত না মেয়েটার।
বুক গুরগুর করে উঠতো না, গা ছমছম করে উঠতো না। যেন সব ভয় জয়ের ওষুধ মজুত আছে ঐ মিষ্টি গন্ধেভরা গা-টার মধ্যে!
কিসের সেই মিষ্টি গন্ধ?
চুলের? শাড়ির? না শুধু মাতৃহৃদয়ের?
শব্দ উঠতো—
বেলোয়ারি চুড়ি চাই, কাচের পুতুল খেলনা চাই! সাবান, তরল আলতা চাই! শব্দ উঠতো, পাংখা বরো।–ফ! পাংখা বরো-ফ!
তখন আর ভয় নয়, আহ্লাদ।
আহ্লাদ, আগ্রহ, উৎসাহ।
শুনতে পেলেই জানালার কাছে ছুটে যেত মেয়েটা, তারপর সরে এসে উতলা গলায় বলতো, মা, মাগো।
মা হেসে হেসে বলতো, ভারী যে আদর দেখছি! কী চাই শুনি?
কাচের পুতুল একটা—
আর পুতুল কি হবে রে? কত রয়েছে—
মেয়েটা তীক্ষ্ণ গলায় বলতো, বা রে, আমার বুঝি কচি পুতুল আছে?
অতএব কচি পুতুল!
অথবা বরফ! পাংখা বরফ! তখন মা বলতো, দূর, দূর, ও বরফ বিচ্ছিরি জলে তৈরি হয়। ওসব কি খায় মানুষে?
খায় না তো বিক্রি করে কেন? পরনে খাটো ফ্রক থাকলেও তর্কে খাটো ছিল না মেয়েটা। বলতো, খায় না তো বিক্রি করে কেন?
মা পয়সা বার করতো আর বলতো, বিক্রি তো সাপের বিষও করে। খাবি তাই?
বলতো, আবার পয়সা দিতো।
বলতে, শুধু আজ, আর নয় কিন্তু।
তাই, তাই, তাতেই সই।
নগদ যা পাও, হাত পেতে নাও, বাকির খাতায় শূন্য থাক। আর একদিনের কথা পরে ভাবা যাবে।
এক-একদিন আবার মা বকতো।
বলতো, কেবল কেবল পড়া ফেলে উঠে আসিস কেন বল তো? মন নেই কেন পড়ায়?
মেয়েটা বলে ফেললেই পারতো ভরদুপুরে ওইরকম শব্দ শুনলে ভয় করে আমার। বললে অনেক কিছু সোজা হয়ে যেত। কিন্তু মেয়েটা তা বলতো না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতো।
মা বলতো, যাও, হাতের লেখা করে ফেল গে।
মেয়েটা আস্তে আস্তে চলে যেত।
