প্ৰবোধ যেন কেউ নয়!
প্ৰবোধকে যেন চিনতে পারছে না!
কে বলতে পারে নিয়ে যাওয়া যাবে, কি বুরাপের রোগশয্যা আঁকড়ে পড়ে থাকবে!
বিপদের ওপর বিপদ!
এই সময় আবার মাতৃশোক-সংবাদ!
মার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ ছিল না, অথচ ভেতরে ভেতরে তো ভক্তির সমুদুর ভরা ছিল প্ৰাণে।
তা কপালই বলবো।
একই সঙ্গে মাতৃপিতৃ-বিয়োগ!
মা মরেছে আজ দশ-বিশ দিন, খবর নেই বার্তা নেই। এখন একেবারে—
প্ৰবোধেরই গেরো!
গেরো কি সোজা? তিনি যতই বলে যান, তার মরণে কেউ যেন অশৌচ না নেয়, সমাজ তা মানবে? এখুনি তো প্ৰবোধকে মায়ের কাছে ছুটতে হবে-নিয়মকানুন জানতে। তারপর পুরুতবাড়ি!
বেঁচে থেকে কোনোকালে উপৃগার করলেন না। শ্বশুর-শাশুড়ী, এখন মরে যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছেন।
একেই বলে পূবর্জন্মের শক্ৰতা।
প্ৰবোধের দিক থেকে এসব যুক্তি আছে বৈকি।
কিন্তু সুবর্ণ!
সুবৰ্ণ কোন যুক্তি দিয়ে ক্ষমা করবে তার মাকে?
মরে গিয়ে তবে সুবৰ্ণকে উদ্দিশ করে গেল মা? চিঠিখানা পড়ে উত্তর দেবার পথটা পর্যন্ত না থাকে?
কেন? কেন? কেন মা আজন্ম এভাবে শত্রুতা করল। সুবর্ণর সঙ্গে?
ত্যাগই তো করেছিলে, মরে গেল তবু জানতে পেল না। সুবৰ্ণ, এখন তবে আবার কেন একখানা চিঠি দিয়ে আগুন জ্বলিয়ে যাওয়া?
প্ৰবোধের ভয় অমূলক।
সুবৰ্ণ থাকতে চাইল না।
সুবৰ্ণ বাপের পায়ের ধুলো নিয়ে চলে গেল। বললো, এই শেষ দেখা দেখে গেলাম বাবা। শাপ দিয়েছিলে মরা মুখ দেখতে, সেটুকু থেকে যে অব্যাহতি পেলাম, সেই পরম ভাগ্যি।
আর আসবি না?
সুবৰ্ণ তার সেই বড় বড় চোখ দুটো তুলে বললো, আর কী করবো বাবা? আর আসতে ইচ্ছে নেই। মনে জানবো একই দিনে মা-বাপ হারিয়েছে হতভাগী সুবর্ণ।
অভিমানে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল।
যেন সেই পরলোকগতার পিছু পিছু গিয়ে ফেটে পড়ে বলতে ইচ্ছে করছে—কেন? কেন? কী অপরাধ করেছিল তোমার কাছে সুবর্ণ যে এত বড় শাস্তি দিলে তাকে?
২.০৭ একই দিনে মা-বাপ হারালাম
সুবৰ্ণলতা বলেছিল, মনে জানবো একই দিনে মা-বাপ হারালাম আমি!
কিন্তু মা-বাপ কি ছিল সুবর্ণর? তাই হারানোর প্রশ্ন?
কবে ছিল?
কবে পেয়েছে সেই থাকার প্রমাণ?
তবে?
যে বস্তু ছিল না, তার আর হারাবার প্রশ্ন কোথায়?
তবু নির্বোধ সুবৰ্ণলতা অসীম নক্ষত্রে ভরা আকাশের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে একটি নতুন নক্ষত্রের সন্ধান করতে করতে সেই বলে-আসা কথাটাই আবার মনে মনে উচ্চারণ করে, একই দিনে মা-বাপ দুই-ই হারালাম আমি!
কোনো এক নতুন নক্ষত্র কি শুনতে পাবে সে কথা? আর শুনতে পেয়ে হেসে উঠবে? বলবে, যা ছিল না। তাই নিয়ে হারানোর দুঃখ ভোগ করতে বসলি তুই? ছি, ছি!
সুবৰ্ণলতা সে হাসি সে কথা শুনতে পাবে না হয়তো। তাই সুবৰ্ণলতা ওই আকাশটা থেকে চোখ সরাতে পারছে না।
এ বাড়িতে আকাশ আছে।
সুবৰ্ণলতার এই গোলাপী-রঙা দোতলায়। কারণ এ বাড়িতে আছে ছাদে ওঠার সিঁড়ি। আছে দক্ষিণের বারান্দা। যে বারান্দায় বাতাসের অফুরন্ত দাক্ষিণ্য, যে ছাদে অন্তহীন অন্ধকারের নিবিড় গভীর প্রগাঢ় প্রশান্তি।
ছাদেই তো মুক্তি!
এখানে—উধৰ্ব্বসীমায় স্থির হয়ে আছে সেই অসংখ্য নক্ষত্রের মালা-পরানো নির্মল আকাশ।
সুবৰ্ণলতার কি তবে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত নয়? যদি না দেয় তো সুবর্ণ অকৃতজ্ঞ।
কিন্তু সুবর্ণ অকৃতজ্ঞ নয়।
তাই সে যখন সেই অন্তহীন অন্ধকারের মাঝখানে উঠে এসে দাঁড়ায়, তার হৃদয়ের শান্ত ধন্যবাদ উঠে আসে একটি গভীর নিঃশ্বাসের অন্তরাল থেকে।
এখানে ছাদে উঠে আসতে পারে সুবৰ্ণলতা।
আর সেটা পারে বলেই দুদণ্ডের জন্যেও অন্তত ভুলে থাকতে পারে—সুবৰ্ণলতা নামের মানুষটা হচ্ছে একটা কর্মে উত্তাল আর শব্দে মুখর স্কুল আর ক্ষুদ্র সংসারের গৃহিণী। ভুলে থাকতে পারে, সেই সংসার তার স্থূলতা আর ক্ষুদ্রতা নিয়ে অহরহ সুবৰ্ণলতাকে ডাক। তার দায় এড়াবার উপায় নেই সুবৰ্ণলতার।
তবু আজ বোধ হয়। আর কেউ ডাক দিতে আসবে না।
আজ সুবৰ্ণলতাকে বোধ হয় কিছু কিঞ্চিৎ সমীহ করবে। সুবৰ্ণলতার ছেলেমেয়েরা।
ডাক দেবে না, অতএব সুবৰ্ণলতা স্তব্ধ হয়ে বসে মনে ভাবতে পারে, মা ছিল তার! রাজরাজেশ্বরী মা!
ছিল সুবৰ্ণর সমস্ত চেতনার মধ্যে, সমস্ত ব্যাকুলতার মধ্যে, সমস্ত অনুভবের মধ্যে। মূর্খ সুবর্ণলতার শুধু একটা মূঢ় অভিমানে মুখ ফিরিয়ে থেকেছে সিএ ম্যের দিক থেকে।
নইলে একবার কি সবদিকের সব মান-অভিমান ধুলোয় বিকিয়ে দিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে আছড়ে পড়া যেত না? বলা যেত না, মা, তোমায় একবার দেখবার জন্যে বড্ড ইচ্ছে হচ্ছিল তাই চলে এলাম!
সুবৰ্ণ তা করে নি।
সুবৰ্ণ তার অভিমানকেই বড় করেছে। সুবৰ্ণ ভেবেছে, মা তো কই একবারও ডাক দেন নি।
সুবৰ্ণ ভেবেছে, স্বামীর কাছে হেঁট হব না আমি!
তাই সুবর্ণর মা ছিল না!
এখন সুবৰ্ণলতা সব মান-অভিমান ধুলায় লুটিয়ে দিলেও আছড়ে পড়ে বলতে পারবে না সেই
কথাটি।
মা, তোমাকে একবার দেখবার জন্যে মরে যাচ্ছিলাম আমি।
কিন্তু অভিমান কি দূর হয়?
এখনো তো বাপের উপর একটা দুরন্ত অভিমানে পাথর হয়ে আছে সুবর্ণ। সেই পাথর যদি ফেটে পড়তো তো, হয়তো কপাল কুটে চীৎকার করে উঠতো, কেন? কেন তোমরা সবাই মিলে আমাকে ঠকাবে? কেন এমন করে নিষ্ঠুরতা করবে। আমার সঙ্গে? কী ক্ষতি হতো। যদি তোমার সুবৰ্ণলতার মায়ের চিঠিটা সুবৰ্ণলতাকে চুপি চুপি পাঠিয়ে দিতে?
যদি বলতে, সুবৰ্ণ রে, তোর মা বলছে, সে মরে না গেলে চিঠিটা না দিতে, কিন্তু আমি পারলাম না। অত নিষ্ঠুর হতে, আমি দিয়ে গেলাম তোকে। এখন তুই বোঝ, খুলবি কি খুলবি না!
