এই অদ্ভুত যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে যত বেশি ধাক্কা খাচ্ছে তারা, তত বেশি বিতৃষ্ণ হচ্ছে, তত বেশি আঘাত হানছে।
পারু পড়তে চায়, কিন্তু পারুর পড়াকে কেন্দ্র করে সুবৰ্ণলতা যে ঘূর্ণিঝড় তোলে, সে ঝড়ের ধুলো-জঞ্জালের দিকে তাকিয়ে পারু পড়ায় বীতস্পৃহ হয়।
পারু নিজেই বেঁকে বসে।
পারু প্রতিজ্ঞা করে, লাঠালাঠি করে আদায় করা বস্তুকে গ্রহণ করে কৃতাৰ্থ হবে না সে। পারুর আত্মমর্যাদাজ্ঞান তীব্ৰ গভীর।
কিন্তু প্ৰবোধের পক্ষে মেয়ের সেই প্ৰতিজ্ঞা জানার কথা নয়। তাই প্ৰবোধ মায়ের প্রশ্নে অসহায় দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলে, তোমার মেজবৌ যে বলে গো, আজকাল আর অত সকাল সকাল বিয়ে নেই। বরং একটু লেখাপড়া-
মুক্তকেশী অবশ্য এতে বিচলিত হন না। মুক্তকেশী দৃপ্ত গলায় বলেন, কী বললি লক্ষ্মীছাড়া বামুনের গরু! মেয়ের এখন বিয়ে না দিয়ে লেখাপড়া শেখাতে বসবি? তা বলবি বৈকি, তোর উপর্যুক্ত কথাই বলেছিস। চিরটাকাল তো হাল্কা বুদ্ধিতেই চললি।
না, এখন আর বৌয়ের বুদ্ধিতে চললি বললেন না বুদ্ধিমতী মুক্তকেশী। বললেন, হালকা বুদ্ধিতে চললি!
প্ৰবোধ অবশ্য প্ৰতিবাদ করে না।
মুক্তকেশী বলেন, ওসব কথা বাদ দে, কোমরে কসি গুঁজে লেগে যা। গলার কাটা উদ্ধার না। হলে তো ছেলেদের বিয়ে দিতে পারবি না! এদিকে মেয়ে নিয়ে লোকে আমায় সাধাসাধি করছে। আমি থাকতে ছেলের বিয়ে দিবি, এই আমার সোধ। সুবোটার তো প্রথম দিকে শুধু মেয়ের পাল!
কথাটা শেষ হবার আগেই গলার কাটা ঘর থেকে বিদায় নেয়, আর সুবৰ্ণলতা একটুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বলে, হুকুম তো একটা করে বসলেন!। কিন্তু ছেলেদের এক্ষুনি বিয়ে কি? পাসই করেছে, রোজগার তো করতে শেখে নি! কানুর তো পড়াও শেষ হয় নি!
কানু ডাক্তারী পড়ছে, কাজেই তার পাস করে বেরোতে দেরি। মুক্তকেশী সেই কথার উল্লেখ করে ব্যঙ্গহাসি হেসে বলেন, ছেলে ডাক্তার হয়ে বেরুলে তবে বিয়ে দেবে মেজবৌমা? তার থেকে বল না কেন, ছেলের এখনো চুল পাকে নি, বিয়ে দেব কি? ছেলেরা রোজগার না করলে বৌরা এসে তোমার সংসারে দুটি ভাত পাবে না?
সুবৰ্ণলতা শান্ত গলায় বলে, ভাত কেন পাবে না! তবে ভাতটাই তো সব নয় মা?
আহা, হলো না হয় গহনা-কাপড়ই সব, মুক্তকেশী জিদের গলায় বলেন, সে তুমি বিয়ের সময় বেহাইয়ের গলায় গামছা দিয়ে দশ বছরের মতন আদায় করে নেবে। ততদিনে তোমার ছেলে অবিশ্যিই উপায়ী হবে।
সুবৰ্ণলতা আরো নাম হয়, তবু দৃঢ় গলায় বলে, সে তো অনিশ্চিত, রোজগার পাতি না করলে—
দেখ মেজবৌমা, তক্কে তোমার সঙ্গে জিততে পারব না। আমি, তবে গুরুজন হিসেবে বলছি, বামুনের ছেলে, খেটে খেতে না পারে ভিক্ষে করে খাবে, তাতে লজ্জা নেই। বিয়ে একটা সংস্কার সেটা সময়ে দরকার। তবে সব আগে তোমার ওই তালগাছকে পার করো—
সুবৰ্ণলতা উঠে দাঁড়ায়।
বলে, রোদ থেকে এসেছেন, ডাব আনি একটা—
ডাবে ছোঁওয়া লাগে না, তাই মুক্তকেশীর আসার আশায় প্রায়শই ডাব মজুত থাকে। সুবৰ্ণলতারই ব্যবস্থা।
ডাব, গঙ্গাজল আর তসরের থান।
কাপড় ছেড়ে হাতেমুখে গঙ্গাজল ছিটিয়ে ডাবটি খেয়ে ছেলের সংসারের কল্যাণ করেন মুক্তকেশী।
আজ কিন্তু হাঁ-হাঁ। করে উঠলেন।
বললেন, থাক, থাক আজ—
সুবৰ্ণলতা। তবু থাকবে কেন বলে চলে গেল।
আর সুবৰ্ণলতা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই সহসা গলা নামালেন মুক্তকেশী। ফিসফিস করে কী যেন বললেন ছেলেকে, ঈষৎ চমকে উঠলো ছেলে, মুখে যেন বিপন্ন ভাবের ছায়া পড়লো তার, বারকয়েক মাথা নাড়লো আচ্ছা এবং না বাচক, তার পর সাবধান হয়ে সোজা হয়ে বসলো।
সুবৰ্ণলতার অঞ্চল।প্রান্তের আভাস দেখা গেছে।
প্রসঙ্গ চাপা দেবার জন্যেই যেন গলাটা আবার তুললেন মুক্তকেশী, বললেন, আজ আর বসবো না বেশিক্ষণ, বুদোর জন্যে একটা কনে দেখতে যাবার কথা আছে সুবোর, দেখি গে। বললাম একা না ভ্যাকা, বাপ-কাকা যাক, তা পোকা-পোভা দুজনেই ঘাড় নাড়লো। ছেলের বিদ্যোবুদ্ধি কম, তার বিয়ের কথা কইতে ওনাদের মান্যে আঘাত লাগবে। সুবো আমার ভালমানুষ-
হঠাৎ ওঘর থেকে পারু এসে উদয় হয়, একটু তীক্ষ্ণহাসি হেসে বলে, ঠাকুমা বুঝি এবার ঘটকালি পেশা ধরেছি?
মুক্তকেশী থতমত খান।
মুক্তকেশী অবাক হন।
কারণ এর জন্য প্ৰস্তৃত ছিলেন না মুক্তকেশী, তবে সামলাতে তিনি জানেন। সামলে নিয়ে বলেন, ওগো অ মেজবৌমা, এ মেয়েকে আরো বিদ্যেবতী করতে চাও? এখুনি তো উকিলব্যারিস্টারের কান কাটতে পারে গো তোমার মেয়ে। কথার কী রাঁধুনি! আমি নয়। ঠাকুমা, ঠাট্টার সম্পর্ক ঠাট্টা করেছে, তবে অন্য ক্ষেত্রে এরকম বোলচাল নিন্দের।
তোমার কাছে কোনটাই বা নিন্দের নয়। ঠাকুমা—, পারুল হেসে ওঠে, তোমাদের সবই বাবা অনাছিষ্টি! ইস্কুলে পড়লে বাঁচাল হয়, ইংরেজি শিখলে বিধবা হয়—
হয়, চোখের ওপর দেখছি লো। তোর বাবার নলিন কাকার নাতনী পান্তির অবস্থা দেখলি না? ঘটা করে মেয়েকে মেম রেখে ইংরেজি শেখানো হয়েছিলো, বিয়ের বছর ঘুরল না, মেয়ে বিধবা হল না!
পারু ফট করে বলে, কিন্তু জ্যাঠামশাই তো বড়দির জন্যে মেম রাখেন নি ঠাকুমা–
মুক্তকেশী মুখ কালি করে বলেন, কুতর্ক করার বিদ্যেয় তুই যে দেখছি মার ওপরে উঠলি পারু! তোর বাপেরই জীবন অন্ধকার। যাই আজ উঠি।
ডাব খেলেন না।
বললেন পেট ভার।
কিছু উৎকৃষ্ট গোবিন্দভোগ চাল, এক বোতল গাওয়া ঘি, পোয়াটাক সাগু, এক সের মিশ্ৰী, গোটাপাচেক টাকা, আর একখানা নতুন গামছা নিয়ে আবার পালকিতে চড়ে বসলেন মুক্তকেশী। ছেলের বাড়িতে এলেই এসব জোটে তাঁর। ডাবটাও পালকিতে তুলে দিল সুবৰ্ণলতা।
