পালকি-বেয়ারাদের হাতে ছটা পয়সা দিতে যাচ্ছিলো প্ৰবোধ, মুক্তকেশী ছোঁ মেরে পয়সাটা কেড়ে নিলেন ছেলের হাত থেকে, খরখর করে বলে উঠলেন, রেট্ বাড়াসনে পেবো, বাপের পুণ্যে দুটো পয়সার মুখ দেখতে পেয়েছিস বলেই মা-লক্ষ্মীকে অবহেলা করিসনে। চার পয়সায় বরাবর যাচ্ছি-আসছি। দয়াদাক্ষিণ্য করে তুমি দু পয়সা বেশি দিলে অন্যের তাতে ক্ষতি করবে, তা মনে বুঝে। একবার বেশি পেলে আর কমে মন উঠবে?
এবারে বেয়ারা চারটে কিন্তু প্রতিবাদ করে ওঠে এবং প্ৰবোধও মায়ের দিকে করুণ মিনতি নিয়ে তাকায়, কিন্তু মুক্তকেশী অনমনীয়!
সদৰ্পে বলেন, দূর হ!।দুল হয়ে যা পালকি নিয়ে! ভাত ছড়ালে আবার কাকের অভাব? বলি পালকির বেত তো ছিঁড়ে ওয়ার হয়ে গেছে, পড়ে গিয়ে সোয়ারির হাড়গোড় না চূৰ্ণ হয়, ইদিকে পয়সার লালসাটি তো খুব আছে! যাবি, না যাবি না?
ওরা হাতের গামছাট ঘাড়ে চাপাতে চাপাতে ব্যাজার মুখে বলে, যিবো না কাঁই?
বেশ, ওই চার পালকিতে ওঠেন মুক্তকেশী।
পালকি-বেয়ারাদের পরিচিত ধ্বনিটা শোনা যায় কাছ থেকে ক্রমশ দূরে।
আরো দূরে গিয়ে যেন ক্ষুদ্ধ হৃদয়ের চাপা আৰ্তনাদের মত শুনতে লাগে।
মুক্তকেশী যতক্ষণ ছিলেন প্ৰবোদের প্রাণে যেন বল ছিল, মা চলে যেতেই মুখটা শুকিয়ে এল, কমে এল বুকের বল।
তবু কর্তব্য করতেই হবে।
তাই সুবৰ্ণলতার কাছে গিয়ে ইতস্তত করে বলে, মা তো একটা বার্তা দিয়ে গেলেন!
সুবৰ্ণ অবশ্য এই বার্তা সম্পর্কে বিশেষ উৎসুক হল না, শুধু মুখ তুলে তাকালো।
প্ৰবোধ জয় মা কালীর ভঙ্গীতে বলে ফেললো, তোমার বাবা যে ও বাড়িতে এক খবর পাঠিয়েছিলেন—
সুবৰ্ণলতা চমকে ওঠে।
তোমার বাবা!
খবর পাঠানো!
এ আবার কি অভিনব কথা?
সুবৰ্ণলতার যে একজন বাবা এখনো অবস্থান করছেন এই পৃথিবীতে, সে কথা কে মনে রেখেছে?
সুবৰ্ণলতা চমকে ওঠে, কিন্তু প্রশ্ন করতে পারে না। প্ৰবোধই আবার বলে, মানে এ বাড়ির ঠিকানা তো জানেন না। তোমারও একবৰ্গগা গো, আমারও ইয়ে হয় না— বাপ বলে কথা! সে যাক, খবর পাঠিয়েছেন, খুব নাকি অসুখ, তোমাকে একবার দেখতে চান–
তোমাকে একবার দেখতে চান!
সুবৰ্ণর বাবা সুবৰ্ণকে একবার দেখতে চান?
এটা কি সন্ধ্যাবেলা?
এই একটু আগেই না। দুপুর ছিল?
তবে এখন কেন চারিদিক ছায়াচ্ছন্ন হয়ে আসছে?
সুবৰ্ণ সেই হঠাৎ অন্ধকার হয়ে আসা পারিপার্শ্বিকের দিকে অসহায়ের মত তাকায়।
এ দৃষ্টি বুঝি সুবৰ্ণলতার চোখে একেবারে নতুন। প্ৰবোধও তাই অসহায়তা বোধ করে। অতএব তাড়াতাড়ি বলে, আরে বেশি ভয় পাবার কিছু নেই, মানে বয়স হয়েছে তো—মানে অসুখটা বেশি করেছে। হঠাৎ, মানে আর কি-ইয়ে তোমার এখুনি একবার যাওয়া দরকার।
সুবৰ্ণর চোখে জল নেই।
সুবৰ্ণর চোখ দুটো যেন ইস্পাতের।
সেই ইস্পাতের চোখ তুলে সুবর্ণ বলে, যাবার দরকার কি আছে এখনো?
বিলক্ষণ! নেই মানে? প্ৰবোধ যেন ধিক্কার দিয়ে ওঠে, এই কি মান-অভিমানের সময়? যতই হোক জনদাতা পিতা—
সে কথা হচ্ছে না—, সুবৰ্ণ যেন কথাও কয় ইস্পাতের গলায়, বাবার মরা মুখ দেখতে যেতে চাই না। আমি।
বললো এই কথা সুবর্ণ!
কারণ সুবর্ণর সেই কথাটা মনে পড়লো। বহুবার মনে পড়া, আর ইদানীং ধূসর হয়ে যাওয়া, সেই কথাটা। সুবৰ্ণ সেদিন জলবিন্দুটি পর্যন্ত না খেয়ে চলে এসেছিল বাবার কাছ থেকে, বাবা বলেছিল, আচ্ছা, যেমন শাস্তি দিয়ে যাওয়া হলো, তেমন টের পাবে! এই বাপের মরা মুখ দেখতে আসতে হবে।
বলেছিল, বলে সুবৰ্ণকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠেছিল সুবর্ণর বাবা নবকুমার। আর একটাও কথা বলেনি।
সেই শেষ কথা!
সেই কথাটাই মনে পড়লো সুবর্ণর, তাই বলে ফেললো, মরা মুখ দেখতে যেতে চাই না আমি।
প্ৰবোধ হাঁ-হাঁ করে ওঠে, কী আশ্চৰ্য, তা কেন ভাবছো? মানুষের অসুখ করে না?
সুবৰ্ণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
প্ৰবোধ বলে, কানু কলেজ থেকে—
কেন, কানু কেন? সুবৰ্ণলতা বলে, তুমি নিয়ে যেতে পারবে না?
আহা পারবো না কেন? তবে কথা হচ্ছে পারু একা থাকবে—
একা মানে? সুবর্ণ সেই ঝকঝকে শুকনো চোখে চেয়ে বলে, পারু বকুল দুজনে নেই? মানু সুবল এরাও তো এসে যাবে এখুনি-
আহা ওরা আবার মানুষ! মানে—মা বলে গেলেন নেহাৎ খবরটা দিয়েছে, না গেলে ভালো দেখায় না-
থাক, বেশী কথা ভালো লাগছে না, তুমি একখানা গাড়ি ডেকে দাও, আমি একাই যাবো—
২.০৫ আমি নিজেই যাব
আমি নিজেই যাব! এর চাইতে অসম্ভব কথা আর কি আছে?
সুবৰ্ণলতা পাগল তাই এমন একটা অদ্ভুত আর অস্বাভাবিক কথা বলে বসেছিল। অস্বাভাবিক বৈকি। বিধবা বুড়ীরা কালীঘাট গঙ্গাঘাট করে বেড়ায়, সে আলাদা কথা। বলতে গেলে তারা বেওয়ারিশ। কমবয়েসী। বিধবারাও মাঝে মাঝে পথে বেরোবার ছাড়পত্র পায়, বুড়ীদের দলে মিশে যেতে পারলে।
পথে মানে অবশ্য তীর্থপথে।
অল্পবয়সে যারা সর্বস্ব হারিয়ে বসে আছে, সমাজের কাছে এটুকু কৃপা তারা পায়। অথবা সমাজের উপর এটুকু দাবি তারা রাখে। অবশ্য বুড়ীদের মধ্যে সপ্তরিখী বেষ্টিত অবস্থায় তাদের খিদমদগারী করতে করতেই যাওয়া।
তা হোক—তবু রাজরাস্তায় পা ফেলবার সৌভাগ্য!
কিন্তু সধবারা?
নৈব্য নৈব চ!
তারা তো আর বেওয়ারিশ নয় যে, যা খুশি করতে চাইলেই করতে পারে? তবে আর মেয়েতে পুরুযেতে তফাৎ কি? কাছাকোঁচা দিয়ে কাপড়ই বা পরবে না কেন তবে?
তবুও যদি সুবৰ্ণ বাইরে জগৎ থেকে নজীর এনে এনে দেখাতে চায়, যদি বলে, ওরা মেয়ে নয়? এই বাংলা দেশের মেয়ে? তারও উত্তর আছে।
