তবু–
এই তবুর উত্তর নেই, প্রশ্ন জমে ওঠে আরো।
সুবৰ্ণলতার ছেলেরা কি এই মাতৃভক্ত বংশের ছেলে নয়?
সুবৰ্ণলতা কি তার মাতৃকর্তব্যে কোনো ত্রুটি করেছে? সুবৰ্ণলতা তো বরং সেই কৰ্তব্যের দায়ের কাছেই নিজের সর্বশক্তি বিকিয়েছে বসে বসে।
তথাপি সুবৰ্ণলতার বিয়ে হওয়া মেয়েরা বাপের বাড়ি বলতে সুবৰ্ণলতার প্রাণ দিয়ে গড়া এই গোলাপী রঙের দোতলাটাকে বোঝে না, বোঝে সেই দর্জিপাড়ার গলির বাড়িটা। তাদের প্রাণপড়ে থাকে। সেখানেই। সেখানে এসে তারা পুরনো দালানের তেলচিাটে দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে তাদের মায়ের চালচলনের ব্যাখ্যানা করে।
আর সুবৰ্ণলতার ছেলেরা?
তারা অবশ্য সেই দেয়ালে তেলধারা জানালায় চুনের হাত মোছা এবং দরজার পিছনে পিছনে পানের পিক ফেলা বাড়িটাকে আদৌ পছন্দ করে না, তার প্রতি একবিন্দুও মমতা পোষণ করে না, তবু এই বাড়িটাকেও আমাদের বলে পরম স্নেহে হৃদয়ে নেয় না।
সুবৰ্ণলতার ছেলেরা যেন বাধ্য হয়ে তাদের এক প্রবলপ্ৰতাপ প্রতিপক্ষের এক্তারে পড়ে আছে, তাই সুযোগ পেলেই ছোবল বসাতে আসে।
ছোটটাকে অবশ্য এখনো ঠিক বোঝা যায় না, সে যেন বড় বেশি নির্লিপ্ত। সেজটাও আমোদপ্ৰমোদ বাবুয়ানা বিলাসিতাটুকু হাতের কাছে পেয়ে গেলে তেমন হিংস্র নয়, কিন্তু ভানু-কানু?
যারা নাকি প্ৰমাণ সাইজের জামা পরে তবে এ বাড়িতে এসেছে!
তারা যেন ঠিক কাকাদের প্রতিমূর্তি।
বিশেষ করে ভানু।
হঠাৎ যখন পাশ দিয়ে চলে যায়, কি চান করে এসে গামছাখানাকে জোরে জোরে ঝাড়ে, অথবা মুখ নিচু করে ভাত খেতে খেতে কেমন একটা কঠিন ভঙ্গীতে চোয়ালটা নাড়ে, দেখে চমকে ওঠে সুবৰ্ণলতা।
মনে হয়। সেজ দ্যাওর প্রভাসকেই দেখতে পেল বুঝি।
অপর পাঁচজনেও বলে, ভানুকে দেখো যেন অবিকল ওর সেজকাকা!
শুনে অন্ধ একটা রাগে হাত-পা কামড়াতে ইচ্ছে করে সুবৰ্ণলতার।
সুবৰ্ণর রক্ত-মাংসে গড়া, সুবর্ণর ইচ্ছে চেষ্টা সাধন শক্তি দিয়ে লালিত সন্তান সুবর্ণর পরম শত্রুর রূপ নিয়ে সুবর্ণর চোখের সামনে ঘুরে বেড়াবে এ কী দুঃসহ নিরূপায়তা!
কী অস্বস্তিকর বড় হয়ে গেছে ভানু-কানু!
কী বিশ্ৰী লম্বা-চওড়া।
গলার স্বরগুলোই বা কী রকম মোটা। আস্ত দুটো লোক হয়ে গেছে ওরা!
অন্য লোক।
সুবৰ্ণলতার সঙ্গে যাদের জীবনের আর কোনো যোগ নেই, সুবৰ্ণলতাকে যাদের আর কোনো প্রয়োজন নেই।
সুবৰ্ণলতার সাধ্য নেই। আর ওদের নাগাল পাবার।
আস্তে আস্তে মানু সুবলও হয়তো এই রকমই হয়ে যাবে। তাদের মুখের চেহারায় প্রকট হয়ে উঠবে মুক্তকেশীর ছেলেদের মুখের কাঠামো।
নিরুপায় সুবৰ্ণলতাকে বসে বসে দেখতে হবে এই পরিবর্তন।
মুক্তকেশীর ছেলেদের ঘৃণা করা যেত। অবজ্ঞা করা যেত, এদের বেলায় কোনো উপায় নেই।
আর এদের সম্পর্কে রও কোনো পথ নেই। এরা সুবৰ্ণলতার ইচ্ছানুরূপ শিক্ষিত হয়েছে, সভ্য হয়েছে, চৌকস হয়েছে। সুবৰ্ণলতার জীবনের প্রত্যেকটি অণুপরমাণুর ধ্বংসের মূল্যে যে সম্পদ সঞ্চয় করেছে সুবৰ্ণলতার ছেলেরা, সেই সম্পদের অহঙ্কারেই তারা অহরহ অবজ্ঞা করছে।
হয়তো বা সুবৰ্ণলতার ক্ষেত্রেই নয়, অন্য সব ক্ষেত্রেও এমনিই হয়।
বোধ ঋণবোধ ও জন্মায়, আর সেই ঋণবোধের দাহই ফণা তুলে থাকে ছোবল হানতে। যেখানে ঋণের ঘর হালকা, সেখানে বুঝি আপন হওয়া যায়, সহজ হওয়া যায়।
নচেৎ নয়।
অথচ আজীবনের স্বপ্ন ছিল সুবৰ্ণলতার, তার সন্তানেরা তাকে বুঝবে, তার আপনি হবে। কিন্তু তারা আপন হয় নি, তারা সুবৰ্ণলতাকে বোঝে নি।
হয়তো বুঝতে চায়ও নি।
কারণ সুবৰ্ণলতার ছেলেরা তার মায়ের সেই মধুর আশার স্বপ্নের সন্ধানটুকু পায় নি কখনো? তারা শুধু যোদ্ধা সুবৰ্ণলতাকেই দেখে এসেছে, দক্ষিণের বারান্দালোভী স্বপ্নাতুর সুবৰ্ণলতাকে দেখে নি কখনো।
যুদ্ধবিক্ষত সুবৰ্ণলতার বিকৃত আর হিংস্র মূর্তিটা অতএব বিরক্তি আর ঘৃণারই উদ্রেক করেছে তাদের। সন্ধান করে দেখতে যায় নি সুবর্ণলতার ভিতরে বস্তু ছিলো।
ভেবে দেখে নি বস্তু ছিলো, স্বপ্ন ছিলো মানুষের মত হয়ে বাঁচবার দুর্দমনীয় সাধ ছিলো ভব্যতা, সভ্যতা, সৌকুমাৰ্য। শুধু সে সম্পদ ক্ষয় হয়ে গেছে। যুদ্ধের রসদ যোগাতে যোগাতে।
তবে ভেবে দেখবেই বা কখন তারা?
আজো কি যুদ্ধের শেষ হয়েছে সুবৰ্ণলতার?
হয় নি।
হয়তো যুদ্ধের কারণগুলো আর তত বেশি প্রখর নেই, হয়তো অনুভূতিগুলোও তত বেশি তীব্ৰ নেই, তবু সুবৰ্ণলতা এক। আপসহীন সংগ্রামের নায়িকা!
নোংরামি আর কুশীতার সংগ্রাম করতে নিজে যে সে কথা নোংরা আর কুশী হয়ে গেছে, ভব্যতা সভ্যতা শালীনতা সৌন্দর্য বজায় রাখবার লড়াইয়ে যে নিজের চরিত্রের সমস্ত সৌন্দৰ্য শালীনতা জবাই দিয়ে বসে আছে, সে খবর আর নিজেই টের পায় না সে।
সুবৰ্ণলতার সন্তানেরা মায়ের এই অপরিচ্ছন্ন মূর্তিটাই দেখতে পাচ্ছে।
অতএব তারা হচ্ছে।
অতএব তারা মাকে ঘৃণা করছে।
মার দিকে ব্যঙ্গের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
সারা জীবনের এই সঞ্চয় সুবর্ণলতার।
অথচ সুবৰ্ণলতার সন্তানদেরও দোষ দেওয়া যায় না। মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া কেটে বিরাট পরিবারের মধ্যে থেকে সুবৰ্ণলতা তাদের শুধু উদ্ধার করেই এনেছে, আশ্রয় দিতে পারে নি।
শুধু যেন ছড়িয়ে ফেলে রেখেছে।
তাদের সদ্য-উন্মোচিত জ্ঞানচক্ষুর সামনে অহরহ উদঘাটিত হচ্ছে মা-বাপের দাম্পত্যলীলার যুদ্ধ আর সন্ধির বহু কলঙ্কিত অধ্যায়।
তারা জানে তারা সুবৰ্ণলতার স্বপ্ন-সাধনার বস্তু নয়, যুদ্ধের হাতিয়ার মাত্র।
