তাই বেত ছিঁড়ছে, ডাঙা ভাঙছে, রং চাঁট দাঁত বেরিয়ে যাচ্ছে, তবু পালকি মেরামতের কথা ভাবছে না। ওরা। দলের অনেকেই তো ক্রমশঃ গলায় একটা পৈতো বুলিয়ে রাধুনী বামুনের চাকরি নিচ্ছে। তার চাহিদা বরং দ্রুতগতিতে বাড়ছে।
বাড়ছেই।
মেয়েরা ক্রমশই বাবু হয়ে উঠছে, রান্নার ভারটা চাপাচ্ছে উড়িয়া কুলতিলকের হাতে।
বন্ধ দরজা খোলবার জন্যে কড়া নাড়া অথবা দরজায় ধাক্কা দেবার যে একটা প্রচলিত রীতি আছে সে রীতিকে অগ্রাহ্য করে মুক্তকেশী ভাঙা ভাঙা অথচ সতেজ গলায় ডাক দেন, পেবো–
হ্যাঁ, এ পাড়ার প্রবোধবাবুকেই ডাক দেন। তিনি। বাড়ির ছোট ছেলেপুলেদের নাম ধরে ডাক দেবার যে একটা রীতি প্রচলিত, সেটাকেও অস্বীকার করে থাকেন। তিনি। এ বাড়ি তাঁর ছেলে পেবোর তাকেই ডাকবেন। তিনি। সে বাড়িতে থাক বা না থাক।
অবশ্য যখনই আসেন, প্ৰবোধচন্দ্রের উপস্থিতির সম্ভাবনা অনুমান করেই আসেন।
তা এক ডাকেই কাজ হলো।
যদিও পেবো বা সেই জাতীয় কেউ নয়, দরজা খুলে দিল বছর দশেকের একটি মেয়ে। মুক্তকেশী যতটা সম্ভব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার ওর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে তীব্র গলায় বলে উঠলেন, কপাট খুলে দিতে হুট্ করে বেরিয়ে এলি যে? বাড়িতে আর লোক নেই?
মেয়েটা এই প্রশ্নবাণের সামনে থতমত খেয়ে বলে, সবাই আছে।
আছে তো তুই তাড়াতাড়ি আসতে গেলি কেন? আমি না হয়ে যদি অপর কোনো ব্যাটাছেলে হতো? পাবির বিয়ে হচ্ছে না বলে বুঝি তুই কচি খুকী আছিস?
মেয়েটা তাড়াতাড়ি বলে, ছাদ থেকে দেখলাম তুমি এলে, তাই—
ছাদ থেকে!
সেই পুরনো চোখ আবার ধারালো হয়ে ওঠে, ভরদুপুরে ছাদে কী করছিলি?
কাপড় শুকোচ্ছিল, মা বললেন, তুলে আন।
হুঁ, তা বলবেন বৈকি মা। চিরকেলে আয়েসী! নে চল, বাবা বাড়ি আছে?
আছেন। ঘুমোচ্ছেন।
তা তো ঘুমোবেই। মুক্তকেশী ধিক্কারের স্বরে বলেন, সঙ্গগুণের মহিমা! বুকের ওপর পাহাড় মেয়ে, আরো একটা ধিঙ্গী হয়ে উঠলো, ছুটিছাটায় দিন কোথায় মাথায় সাপ বেঁধে ছুটোছুটি করে বেড়াবে, তা নয় নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছেন। নে চল!
মুক্তকেশী আজকাল মাঝে-মাঝেই আসেন।
ভেন্ন হওয়া রূপ দুরাচারের জন্যে অনেকগুলো দিন পুত্রবধুর মুখ দেখেন নি মুক্তকেশী, কিন্তু পুত্রের আকিঞ্চন ও তোষামোদে সে ভাবটা কেটে গিয়েছিল। তারপর সেই সুবৰ্ণলতার গুরুমন্ত্র নেওয়ার সময় বাধা ভাঙলো। রাগের, তেজের, লজ্জার।
সময়ে সবই সয়। সর্বতাপহর।
সময় সবই সহজ করে আনে। এবং মুক্তকেশী মেজবৌমা মেজবৌমাই বেশি করেন। তার জন্যে ঘরে থাকা অন্য বৌদের হিংসের অবধি নেই, কিন্তু এখন যে প্ৰবোধচন্দ্রের মাতৃভক্তিটা প্রায় ভারতের ভ্রাতৃভক্তির তুল্য মূল্যবান! আর মূল্যেই তো জগৎ বশ!
অতএব এখন মুক্তকেশী যখন-তখন মেজ ছেলের বাড়িতে বেড়াতে আসেন, হুকুম আর শাসন চালিয়ে যান, এবং অপর ছেলে-বৌদের সমালোচনায় মুখর হন। হাত-খরচের টাকায় ঘাটতি পড়লেই সেকথা কোনো ছলে মেজবৌমার কর্ণগোচর করেন এবং নিজের মেয়ে-জামাই নাতি-নাতনী বাবদ অর্থঘটিত যা কিছু সদিচ্ছা, সেও মেজছেলের কাছে প্ৰকাশ করে যান।
বলেন, ওদের বলি না, জানি তো বোন বলে এতটুকু মন কারো নেই। তোর তবু সে মন একটু আছে তাই বলা।
প্ৰবোধ অবশ্য মায়ের ধারণা অনুযায়ী বোনেদের প্রতি মনের অভিনয়ই করে চলে তারপর। বলে উঠতে পারে না-মন আমারও নেই মা। তারা ভিন্ন মাটিতে শিকড় নামিয়েছে, তাদের সঙ্গে আমাদের যোগ কোথায়? একদা তারা আর আমরা একই আধারে থেকেছি, শুধু এইটুকু সুবাদের জের আর কতকাল টানা যায়?
বলে না।
বলে উঠতে পারে না।
অতএব সুবৰ্ণলতার এই গোলাপী রঙের দোতলাটির মধ্যেও মুক্তকেশী বেশ পুরো চেহারা নিয়েই অবস্থান করেন।
সুবৰ্ণলতা একবারই পেরেছিল অসাধ্য সাধন করতে। একবারই দেখিয়েছিল অসমসাহসিক শব্দটার মানে আছে।
কিন্তু সে ওই একবারই। সে আওতা থেকে সরে এসে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে নিজের ইচ্ছেমত সংসার গড়ে তোলবার বাসনা হয়েছিল, সে বাসনাটা ধূসর হয়ে যাচ্ছে। সেই আওতাটা রয়েই গেছে, হয়তো বা আরো নিরঙ্কুশ হয়েছে।
সুবৰ্ণলতার জীবনের এ এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি। কারণ নিজেও সে মুক্তকেশীর সংসারে বসে যত সহজে মুক্তকেশীর বিরুদ্ধাচরণ করতে পারতো, আপন কেন্দ্রে বসে তা পারে না। ভদ্রতায় বাধে, চক্ষুলজ্জায় বাধে, আর সব চেয়ে আশ্চৰ্য-মমতায় বাধে।
অস্বীকার করে লাভ নেই, এখনকার ওই নখদন্তহীন মানুষটির প্রতি একটা মমতাবোধে সুবৰ্ণলতাকে নিরুপায় করে রেখেছে।
মৌজের দিবানিদ্রাটি ছেড়ে আস্তে আস্তে উঠে এসে প্ৰবোধ মায়ের চরণবন্দনা করে, নিজ হাতে হাতপাখা তুলে নেয়।
মুক্তকেশী আসন পরিগ্রহ করে বলেন, থাক বাতাসে কাজ নেই, বলি নাকে তেল দিয়ে ঘুম দিলেই হবে! মেয়ের বিয়ে দিতে হবে না?
নখদন্তহীন মুক্তকেশীর কথার জোর কমেছে বলে যে কথার সুর বদলেছে তা নয়। সুরাটা ঠিক আছে, ধরনটা ঠিক আছে, শুধু ভারটা খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবু—
তবু সুবৰ্ণলতা যেন আজকাল হঠাৎ-হঠাৎ ওই মানুষটাকে ঈর্ষা করে বসে। মুক্তকেশী যখন তাঁর পঞ্চাশোন্তীর্ণ ছেলেকে বলে ওঠেন লক্ষ্মীছাড়া হতভাগা, পোড়ারমুখো বান্দর, তখন অদ্ভুত একটা ঈর্ষার জ্বালা যেন দাহ ধরায় সুবৰ্ণলতাকে।
অথচ নিজে কি সুবৰ্ণলতা কখনো দরাজ ভাষায় ছেলেদের সম্বোধন করবার বাসনা পোষণ করেছে?
এই গ্ৰাম্যতা কি সুবৰ্ণলতার অসহ্য নয়?
