এখন চুপ করেই থাকে হাতের খোলা বইখানা মুড়ে।
কানু একবার তার সেই বইখানার দিকে দৃষ্টিপাত করে বলে, নাটক-নভেলের তো শ্ৰাদ্ধ করেছো, ওই মাথায় আর যোগবিয়োগ গুণভাগ ঢুকবে?
পারুল এবার কথা কইলো।
বললো, ঢুকবে কিনা সে পরীক্ষা তো করা হয় নি!
ইস, কথা শেখা হয়েছে যে দেখছি খুব! নভেলের যা ফল! লেখাপড়া শেখা তোর কর্ম নয়, বুঝলি? আমার একটা বন্ধুর ছোট বোন, মানে তোর মতন একটা মেয়ে, আসছেবার এস্ট্রেন্স পরীক্ষা দেবে, বুঝলি? সে-সব মাথাই আলাদা।
মাথাটা নিয়েই বোধ হয় জন্মেছিল তোমার বন্ধুর বোন?
কানু ব্যঙ্গহাসি হেসে বলে, তা ছাড়া! তোমার দ্বারা কিসুদ হবে না, বুঝলে? শুধু মাতৃদেবীর মত বড় বড় কথা শিখবে তুমি!
পারু তার প্রকৃতিটা লজঘন করতে চায় না, তবু সে বলে ফেলে, মা ভাগ্যিস ওই বড় বড় কথাগুলো শিখেছিলেন মেজদা, তাই তোমারও এত বড় কথা বলার সুযোগ হচ্ছে!
সত্যি! বাঃ, বেশ বুদ্ধি হয়েছে তো দেখছি খেঁদুর। নাঃ, ভাল দেখে একটা বর তোকে দিতে হচ্ছে! বলে চলে যায়। কানু ভানুর মত অত সিরিয়াস নয়, তাই ব্যঙ্গই করে সে।
২.০৪ পালকি সত্যিই এবার উঠে যাচ্ছে
পালকি সত্যিই এবার উঠে যাচ্ছে।
যাই যাই করছিল অনেক দিন, এবার মনে হচ্ছে একেবারেই যাবার পথে পা বাড়িয়েছে। রাস্তায় বেরিয়ে যখন-তখন তো দূরস্থান, বলতে গেলে চোখেই পড়ে না।
পালকির সঙ্গে সঙ্গে আরো অনেক কিছুই অবলুপ্তির পথ ধরবে তাতে আর সন্দেহ কি? পালকিই বলে যাবে–মানুষের কাঁধের উপর মানুষ চড়া নির্লজ্জতা! … মনের গিয়ে শবদেহ হয়ে যাবার পর চড়ো মানুষের কাঁধে, তার আগে নয়।–বলে যাবে—আস্ত একটা মানুষকে একটা বদ্ধ বাক্সয় ঢুকিয়ে ফেলে ঘেরাটোপ ঘিরে নিয়ে যাওয়াটা হাস্যকর, আমি বিদায় নিচ্ছি ওই ঘেরাটোপ আর পর্দার জঞ্জালগুলো কুড়িয়ে নিয়ে। পথ যে পার হচ্ছে, পথটা সে যেন দেখতে পায়।… বলে যাবে, ছোটো ঘোড়ার খুরে ধুলো উড়িয়ে, ছোটো হাওয়ার বেগে হাওয়াগাড়িতে, ওড়ো মাটি ছাড়িয়ে আকাশে।… তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে আপন পরিমণ্ডলটিকেই সমগ্ৰ পৃথিবী জ্ঞান করে আলবেলায় সুখটান দেবার দিন গত হলো।
হাজার বছরের অভ্যাসের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের ধারা মুছে দিয়ে যারা চলে যায়, তারা কিছু বলে যায় বৈকি। চলে যাবার মধ্যেই বলে যাওয়া।
কালস্রোত যে কাউকে কোথাও নোঙর ফেলতে দেয় না, দুৰ্নিবার বেগে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, এইটাই আর একবার বলে যায় সে। আজকের পরম প্রয়োজনীয় পরবর্তীকালে জঞ্জালের কোঠায় ঠাঁই পায়, এই হলো পৃথিবীর পরমতম সত্য আর চরমতম ট্র্যাজেডি।
তবু সহজে কেউ মানতে রাজী হয় না। সে কথা। তারা সেই বিদায়ী পথিকের বসন প্ৰান্তটুকু মুঠোয় চেপে ধরে রাখতে চায়, আর আলবোলায় শেষ সুখটানটুকু দিতে দিতে বলে, এসব হচ্ছে কী আজকাল! সব যে রসাতলে গেল!
যারা দার্শনিক তারা উদাস হাসি হেসে বলে, যাবেই তো, সবই যাবে।
মুক্তকেশীও একদা তার ছোট্ট নাতনীর সঙ্গে বাক্যালাপ প্রসঙ্গে বলেছিলেন একথা, পালকি আর কই! ক্রমেই কমে আসছে। যাবে সবই উঠে যাবে।
তবু দেখা যাচ্ছে এখনো মুক্তকেশী। তাঁর বয়সের ভারে জীর্ণ দেহখানা নিয়ে চলেছেন পালকি চড়ে।
একাই চলেছেন!
খানিকটা গিয়ে একখানা গোলাপী রঙের দোতলা বাড়ির সামনে এসে মুক্তকেশী মুখ বাড়িয়ে বোহারাগুলোর উদ্দেশ্যে আদেশজারি করলেন, থাম্ মুখপোড়ারা, এই বাড়ি! চলেছে দেখো হুম্ হুম করে!
যেন বাড়িখানা তাদের চিনে রাখার কথা।
নিমেযে বোহারাগুলোর হুমহুম শব্দ থেমে গেল, পালকিও থামালো। চার-চাৱটে জোয়ানমার্দ লোক পালকিখানা নামিয়ে কোমরে বাধা গামছা খুলে গায়ের ঘাম মুছতে লাগলো।
চারটে দস্যিলোক, অথচ একটা বুড়ীকে বইতে হিমশিম খেয়ে গেছে! পদ্ধতিটা বুদ্ধিহীন বলেই। রিকশাগাড়িরা তখনও আসরে নামে নি, দেখিয়ে দেয় নি একটা লোকই টেনে নিয়ে যেতে পারে চারটেকে!
পালকির দরজা ঠেলে নামলেন মুক্তকেশী।
নড়বড়ে কোমরটা কষ্টে টান করে প্রায় সোজা হয়ে দাঁড়ালেন মুহূর্তকাল। তারপর আঁচলের খুঁট থেকে দুটি ডবল পয়সা বার করে চারটি বেহারার মধ্যে একজনের হাতে দিয়ে বললেন, নে যা, ভাঙিয়ে ভাগ করে নোগে যা!
কোমরটা দুমড়ে যাওয়া পর্যন্ত মুক্তকেশীর ধারণা হয়েছে, পূর্ব সম্মানের সবটুকু আর জুটছে না। তাই অপর পক্ষের মুখোমুখি দাঁড়াতে হলেই প্রাণপণ চেষ্টায় সোজা হন। অনেক সময় হাড়ের খিল ছেড়ে যাওয়ার একটা শব্দ হয়, শিরদাঁড়াটা কনকনিয়ে ওঠে, তবু সাধ্যপক্ষে হেঁট হওয়ার অগৌরব বহন করতে রাজী নন মুক্তকেশী।
তথাপি অপরপক্ষ সম্মান রক্ষায় উদাসীন হল।
বলে উঠলো, কেতো দিউছি?
যা দেবার ঠিকই দিয়েছি— বাৰ্ধক্য-মলিন পুরনো চোখের তারায় একটি সম্রাজ্ঞজনোচিত দৃপ্তভঙ্গী ফুটিয়ে তুলে মুক্তকেশী সদৰ্পে তাকালেন, আবার কিসের ট্যা-ফোঁ? চাস কত? পুরো তাঙ্ক?
লোকগুলো মুখের প্রত্যেকটি রেখায় অসন্তোষ ফুটিয়ে বলে, আটো পয়সা দিয়!
কী বললি? আট পয়সা? গলায় ছুরি দিবি নাকি? পয়সা গাছের ফল? মুক্তকেশী সদৰ্পে বলেন, আর এক আধলাও নয়। কার হাতে পড়েছিস তা জানিস? এখেন থেকে এখেন, আট পয়সা! হুঁ, যা বেরো!
আশ্চর্য!
আশ্চর্য বৈকি যে লোকগুলো সত্যিই পালকি তুলে নিয়ে চলে যায় নিতান্ত ব্যাজার মুখে।
তারাও জানছে। এ পেশার দিন শেষ হয়ে আসছে। ওদের। মুক্তকেশীর মত দু একটা বুড়ীটুড়ী ছাড়া এরকম শবযাত্রার ভঙ্গীতে মানুষের কাঁধে চড়ে শূন্যে দুলতে দুলতে আর যেতে চাইছে না মানুষ।
