তুই আসবি?
যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। তর সয় না একটু, সবাই যেন ঘোড়ায় জিন দিয়ে আছে। নাও চল। একটা মনোকষ্টওলা মানুষ এই আঁধারপুরীতে একলা পড়ে থাকবে, এই যখন তোমাদের বিচের তো তাই হোক! কোন্ মুখেই যে তোমরা ধম্মকথা কও, তাও জানিনে বাবা!
আটহাত শাড়িখানার হাততিনেক অংশমাত্র কাজে লাগিয়ে, আর বাকী হাতপাঁচেক বিড়ে পাকিয়ে কুক্ষিগত করে নিয়ে মায়ের পিছু পিছু চলল সত্যবতী অনিচ্ছামন্থর গতিতে। সত্যিই তার আজ সারদার কাছে শুতে ইচ্ছে ছিল। প্রধানত সারদার প্রতি সহানুভূতি, দ্বিতীয়ত মনে আশা করছিল, যদি শুয়ে শুয়ে গল্প করতে করতে ভয়ঙ্কর শব্দগুলোর অর্থ উদ্ধার করে নিতে পারে!
শব্দগুলো যে ভাল নয়, বড়দের কাছে প্রশ্ন করলে যে সত্যি উত্তর পাওয়া যাবে না, ঠেলামারা একটা ভুলভাল উত্তরের সঙ্গে হয়তো বা খানিকটা ধমকই জুটবে– এ বিষয়ে যেন নিশ্চিত হয়ে রয়েছে সত্যবতী।
অথচ ভয়ঙ্কর অদম্য একটা কৌতূহল ভিতর থেকে চাড়া দিচ্ছে। শব্দগুলোর অর্থ সংগ্রহ করতে পারলেই যেন অনেক রহস্যের ঘরের চাবি খোলা যায়। অন্তত শঙ্করী কেন চব্বিশ ঘণ্টা ‘মরব’ ‘মরব’ করে, আর বাড়ির সকলে কেন তার প্রতি এককড়া সদ্ব্যবহার করে না, এটুকু যেন ওর থেকেই ধরা যাবে।
কিন্তু সকল গুড়ে বালি দিল মা।
তা নতুন কিছুও নয় অবিশ্যি! জন্মাবধি তো দেখে আসছে সত্যবতী, বড়দের কাজই হচ্ছে ছোটদের সকল ইচ্ছের গুড়ে বালি দেওয়া।
দীনতারিণীর ঘরে বাড়ির সব কটা সোমত্ত মেয়ের শোবার ব্যবস্থা। ঘরটা প্রকাণ্ড বড় বলেও বটে তাছাড়া বড় বড় মেয়েরা এখান ওখান ছড়িয়ে থাকে এটা বিধি নয়। এই বয়স্থা মেয়েদের মধ্যে ন বছরের সত্যবতী সব চেয়ে বড়, আর তার বিয়েও হয়ে গেছে, তাই সে হচ্ছে দলনেত্রী। পুণ্যি রাজু নেড়ী টেপি পুঁটি রাখালী সক্কলেই তাকে ওপরওলার সম্মানটা দেয়।
আজ ওরা সত্যর জন্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সত্য এসে দেখল ঘুমন্ত পুরী। যে যেমন ইচ্ছে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়েছে, জায়গা বিশেষ নেই, ওর মধ্যেই ওদের হাত-পা ঠেলেঠুলে জায়গা করে নিতে হবে।
সত্য বিরক্তভাবে আর একবার বলে উঠল, একদিন অন্যত্তর শুলে যে কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত মা মঙ্গলচণ্ডীই জানে!… নে, সর দিকি, এই পুঁটি, ঠ্যাঙটা একটু গুটো।
বলা বাহুল্য পুঁটির সুপ্তির গভীরতায় এ স্বর পৌঁছল না। অগত্যাই সত্যবতী বাক্যবলের সাহায্য ছেড়ে বাহুবলের শরণ নিল। পুঁটির পা আর রাখালীর হাত সরিয়ে নিজের মতন একটু জায়গা করে শুয়ে পড়ল বিছানায়। দীনতারিণী এখনো আসেন নি, তাঁর শুতে আসতে দেরি হয়। বিধবাদের দিকের রাতের জলপান চালভাজা তিলের নাড়ুকে বড়ো দাঁতে জব্দ করতে সময় লাগে।
ঠাকুমার বিছানাটা ঠিক আছে কিনা একবার দেখে নিল সত্যবতী। আছে বটে একফালি ঠাই। অবিশ্যি বিছানা আর কি, ঘরজোড়া একখানা শতরঞ্জির উপর বড় বড় মোটা মোটা খানকয়েক কাঁথা পাতা, আর তারই মাথার দিকে দেয়ালজোড়া টানা লম্বা মাথার বালিশ।
একসঙ্গে যাতে সারি সারি অনেকগুলো মাথা ধরানো যায় তার জন্যেই এই অভিনব মাথার বালিশের আয়োজন। এক-একটা বালিশ বোধ হয় লম্বায় চার হাত আর ওজনে আধ মণ, যারা গোয় তারা নিজেরা তাকে এক ইঞ্চিও নড়াতে পারে না। নিজের বালিশকে নিজের ঘাড়ের তলায় ইচ্ছেমত ভঙ্গীতে রাখতে পারার সুখ ওরা জানে না।
বালিশগুলো যে শুধু মাপেই বড় বলে ভারী তাও তো নয়, তুলোগুলোও যে পুরনো। জিনিস যত সস্তাই হোক আর যত বেশীই প্রাচুর্য থাক–অপচয় করার কথা কউ কল্পনাও করতে পারে না। তাই কর্তাদের বড় বড় তাকিয়াগুলো ছিঁড়ে গেলে যখন তাদের জন্যে নতুন ‘খেরো’ দিয়ে নতুন তুলোর তাকিয়া বানানো হয়, তখন পুরনো তুলো আর ছেঁড়া খেরোগুলো কাজে লাগানো হয় বাড়ির নাবালকদের জন্যে।
সব বাড়িতেই একই অবস্থা। ছেলেপুলে কাচ্চা-বাচ্চা ছাড়া সংসারের যত ওঁচা মালের গতি হবে কাদের উপর দিয়ে? তবু তো কবরেজ-বাড়ির অবস্থা উত্তম। বাৎসরিক বৃত্তি দিয়ে সাজো-ধোবা ঠিক করা আছে, নিয়মিত সব ফর্সা করে দিয়ে যায় সে। মানে আর কি, কেচে শুকিয়ে পাট করে দিয়ে যায় কি আর? কাঁচার পুকুরে কেচে ভিজে কাপড়-চোপড়ের উঁই খিড়কির পুকুরের পৈঠেয় নামিয়ে রেখে যায়। তার পর তো আছেন মোক্ষদা। ভাল পুকুরের জল দিয়ে শুদ্ধ করে সেই ভিজের বস্তা রোদে মেলে দেওয়ার দায়িত্ব তার। তার পর আছে বৌ-ঝিরা। শিবজায়ার ছেলের বৌরা, কুঞ্জর বৌ, বনেশ্বরী–পরবর্তী ডিউটি এসে পড়ে এদের ওপর।
নিত্যি বিছানা কাথার ওয়াড় খোলা আর ওয়াড় পরানো কম ঝামেলার ব্যাপার নয়, কিন্তু–রামকালীর যে ধোবার উপর এবং সংসার–পরিচালিকাদের উপর কড়া হুকুম দেওয়া আছে, অনত্ত মাসে দুক্ষেপ সব সাফ করতে।
আজই বোধ হয় সব সদ্য কাচা। কলা-বাসনার ক্ষার আর সাজিমাটির গন্ধ ছাড়ছে। সত্যবতী নাকে কাপড় দিয়ে শুয়েছে, এই গন্ধটা তার ভারী বিশ্রী লাগে। ও শুয়ে শুয়ে ভাবে, এই বিচ্ছিরি গন্ধটা বাদ দিয়ে কাপড় কাচা যায় না? ওটা ভাবতে ভাবতে আরও অন্য ভাবনায় চলে গেল সত্যবতী।…
বড়বৌ তো একা শুলো, মাঝরাতে উঠে যদি জলে ডুবতে যায়? বৌটা তো যাবেই, বাবাকে কি জবাব দেবে সত্য? তারপর গিয়ে রাত পোহালেই বাড়ি কুটুমে ছেয়ে যাবে, তার মাঝখানে সেই বড়বৌয়ের ডুবে মরার র্যালা। আচ্ছা বিপদ হল বটে!
