ও আবার নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলে আমি বললাম, আর একটু থাক! তুমি জানো ছবি আমার জীবন সার্থক হলো! এরপর যদি মরেও যাই কোনো ক্ষোভ থাকবে না। আমি এখন পূর্ণ, আমি সুখী। সুখ পেলাম কয়েক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু এইটুকু সুখ নিয়েই চিরকাল বাঁচতে পারি!
ভেতরটা সত্যি প্লাবিত হয়ে গেছে শরবনে নিশুতি রাত্রির নিঃশব্দ জোয়ারের মতো। আলতোভাবে ওকে ছেড়ে দিলাম।
ছবি তৎক্ষণাৎ উঠে গেল না। সে কাঁদছে। দুই গাল বেয়ে দরু গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। ওর চুলে হাত দিয়ে আদর করতে করতে বললাম, এত কাঁদছ কেন তুমি? আমি অপরাধী; কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো এর ওপর আমার কোনো হাত ছিল না!
ও তেমনি নিমগ্ন তেমনি নতমুখ।
ছি! আর কেঁদো না লক্ষ্মী! তুমি যা বলবে এখন আমি তাই মেনে নেবো!
ছবি ঝট করে ফিরে চাইল! বলল, তুমি আর এসো না এখানে, কখনো এসো না!
কথাটা শেষ করা মাত্র উঠে দাঁড়িয়ে সে চলে যাচ্ছিল, আমি ডাকলাম, ছবি! ছবি!
না! না! না!
উঠে গিয়ে দেখি ছোট রান্নাঘরটার মেঝেতে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কাঁদছে।
পেছনে-পেছনে ওর কাছে গিয়ে আমি বললাম, ছি ছি ছবি! এমন করো না!
তুমি আর এখানে এসো না জাহেদ ভাই, সত্যি বলছি আর এখানে এসো না!
আমার ব্যবহার ওর কান্নার উৎসকে এমনভাবে নাড়া দেবে তা ভাবতে পারি নি। কেমন অপ্রস্তুত হয়ে যাই। ওর মনে কি এমন দুঃখ যে ক্রোধের বদলে রোদনই হলো। আত্মরক্ষার অস্ত্র? আমি তো এমন কিছু চাইনি যা দেওয়া ওর পক্ষে অসম্ভব? অবশ্য বিয়ের ব্যাপারে একেকজন মেয়ের এক-একটি আদর্শবোধ থাকে এবং পাত্র হিসেবে আমি নিকৃষ্ট তা স্বীকার করি। কিন্তু সে যে আমার সঙ্গে কোনরকম সম্পর্ক গড়ে তুলতে নারাজ, তাতে অন্যভাবেও প্রকাশ করতে পারত?
সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা বৃথা। যে কোনো কারণেই হোক, অশ্রুর বাঁধ যখন একবার ভেঙেছে, তখন সমস্ত বেদনার ভার কমিয়ে না দিয়ে শান্ত হবে না।
স্টুডিওতে ফিরে এলাম। কয়েকটি ছবির কল্পনা বিজলি চমকানোর মতো একসঙ্গে মাথায় খেলে গেল। শায়িতা রমণী, ক্রন্দসী যৌবন, বিষের পেয়ালা হাতে একটি তরুণী। অপেক্ষার সময় নেই। ইজেলে ক্যানভাস চাপিয়ে দিয়ে রঙের প্যালেট ও তুলি টেনে নিলাম। শায়িতা রমণী ছবিটাই প্রথম আঁকব। ডান হাঁটুটা ত্রিভুজের মতো উঁচিয়ে রাখা কপালের উপর উপুড়-করা বাঁ হাতখানা, চিত হয়ে শুয়ে আছে। পটভূমিতে আবছা-মতো একটি শিউলি গাছের ডালপালা, ফুলের সম্ভার।
কতক্ষণ কাজ করেছি খেয়াল ছিল না, জামিলের কণ্ঠস্বরে ফিরে চাই! উনি ঘরে ঢুকতে বললেন, এই যে তুমি এখানে! ছবি আঁকছ নাকি?
হ্যাঁ, চেষ্টা করছি। তার মুখের রেখাগুলো পাঠ করতে করতে বললাম, কোথায় গিয়েছিলেন?
কত জায়গায় যেতে হয় সে কথা বলে লাভ কি? ইজেলটার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে কম্পপাজিশনটা দেখতে দেখতে জামিল বললেন, কিন্তু ভাই আজ মনটা বড় খারাপ হয়ে গেছে।
কেন কি ব্যাপার জানি না, আমার মুখটা হয়তো নিমেষে ফ্যাকাশে হয়ে গেল তাহলে ছবি কি সব বলে দিয়েছে। কিন্তু ওর কথার ধরনে তো তা মনে হয় না?
জানো তো ছবির খাতিরেই আমি বেঁচে আছি, এতো দুঃখ কষ্টের মধ্যেও নেতিয়ে পড়ি না। কিন্তু ওকে মনমরা দেখলে ঝুপ করে একেবারে নৈরাশ্যের খাদে পড়ে যাই।
কেন কি হয়েছে! আমার কণ্ঠস্বরে বিস্ময়ের ভাব। তুলিটা তুলে চেয়ে থাকি তার দিকে।
কি হয়েছে বলা মুশকিল। স্ক্রিয়াশ্চরিত্রম দেব ন জানন্তি। কোনদিন কিছু বলবে না। কিন্তু মাঝে মাঝে কাঁদবে। আজকেও তার সেই রোগ উঠেছে। আর এজন্যই তো
জামিল হঠাৎ একটা হোঁচট খেয়ে যেন চুপ হয়ে গেলো। আমি বললাম, কি বলুন না?
না। দরকার নেই। ছবির স্কেচটার ওপর দিয়ে চোখদুটো ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, বেশ হয়েছে তো। সুন্দর হবে! কি আঁকছ?
বললাম, শায়িতা রমণী।
নামটাও সুন্দর! হঠাৎ জামিল বলে উঠলেন, ও হ্যাঁ, আজকে কিন্তু না খেয়ে যেতে পারবে না। ইলিশ মাছ এনেছি। সর্ষে ইলিশ চমৎকার রান্না করে ছবি। খেলে ভুলতে পারবে না। অবিশ্যি আজকে মন খারাপ ওর!
আমি বললাম, কি দরকার খাওয়ার। প্রত্যেকদিন এমন জুলুম করতে ভালো লাগছে না!
জুলুম আবার কি হে? আমি যেমন তুমি তেমন। একবাড়ির লোক বৈ তো নয়। অবিশ্যি মেসে তোমাদের খাওয়ায় ভালো।
না, তা নয়। আমি সেদিক থেকে কথাটা বলছি না। এখনকার পান্তাও আমার ভালো লাগে। বিশেষত ছবির রান্না সত্যি চমৎকার!
হ্যাঁ এইবার পথে এসো। খেয়ে যাবে কিন্তু আমি একটু রান্নাঘর থেকে আসছি!
জামিল বেরিয়ে গেলো। তার সঙ্গে কথা বললেও সারাক্ষণ একই আলোড়ন আমার মনে জেগে ছিল, আমি সত্যি ছোটলোক এবং লম্পট, নইলে নিজের দুর্বলতার জন্য তার এমন জায়গায় আঘাত করতে পারতাম না।
কিন্তু আমি কতটুকু দোষী সেটাও তো অস্পষ্ট প্রেমে শুরু প্রেমে স্থিতি ও প্রেমেই বিলয়, আমার যখন এই ধারণা তখন কেউ এর কানা কড়ির মূল্য স্বীকার করতে না চাইলে তার দায়িত্ব আমি কি করে নেব? সামান্য স্পর্শ সে তো কিছু নয়। প্রেমের আগুনে নিঃশেষ, নিজেকে আত্মতি দেয়াই তো চিরন্তন রীতি? সব দিতে হবে, সব। বলতে হবে তা’কে, আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি। আমার যত বিত্ত প্রভুর আমার যত বাণী!
হায় রাধার মতো মেয়েরা ভালোবাসতে জানে না আর! একজনই জন্মেছিল আর জন্মাবে না কোনদিন! ক্লিওপাট্রা লুপ্তস্মৃতি, লায়লী শিরি উপাখ্যানমাত্র। নারী আসলে রক্ষিতা, প্রকৃতির রক্ষিতা; তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধা সন্তান-উৎপাদন করবে বলে, এর বাইরে ভুলেও এক পা বাড়াতে চায় না।
