তাই নাকি? আমি বিস্মিত স্বরে জিগগেস করলাম।
ছবি বলল, হ্যাঁ তাই। সেজন্যই তো আলাদা থাকেন। বৌদি মেয়েদের স্কুলে ড্রয়িং টিচার।
কোনদিন এখানে আসেন না উনি?
দাদা না থাকলে মাঝে মাঝে আসেন। বিছানাপত্র গুছিয়ে দিয়ে যান।
ছবি একটু থেমে বলল, কিন্তু সেটা আরো বিশ্রী। দাদা বুঝতে পারেন তো? একদম লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে তোলেন।
সেদিন দুর্বল মুহূর্তেই যেন ছবি কথা বলতে শুরু করেছিল, হঠাৎ সচেতন হয়ে একদম চুপ হয়ে গেল।
০৩. শুধু সেদিনই নয়
শুধু সেদিনই নয়। ছবি এমনি, কেমন মায়াময়ী; চোখজোড়া স্বপ্নাচ্ছন্ন, গতি ধীর মন্থর। অতি কাছে থাকলেও অনেক দূরে। দেখলে মনে হয় চেতনাজগতে তার বাসস্থান বটে কিন্তু এক অদৃশ্য অচেনা লোকেরই সে বাসিন্দা। যখন একলা থাকে কি এক ভাবনায় নিমগ্ন, কাছে গেলেও টের পায় না। এক ডাকে শোনে না। হঠাৎ স্বরটা কানে গেলে হকচকিয়ে যেন জেগে ওঠে। কথা বলে কদাচিৎ কিন্তু বলতে শুরু করলে নিজের কথাগুলো শেষ করে চুপ হয়ে যায় একদম। মুখ নিচু করে রাখে, নয় স্থিরদৃষ্টিতে থাকে চেয়ে। সরল বোকা-বোকা চাউনি।
কাছে যাওয়ার সুযোগ আছে অথচ কাছে গেলেও নাগাল পাওয়া যায় না, এর আকর্ষণ বড় তীব্র বড় মধুর। সেই সোনার শেকলে কখন বাঁধা পড়ে গেলাম বলতে। পারব না। প্রতিদিন অন্তত একবার ওখানে না গেলে ভালো লাগে না এইমাত্র বুঝি। ছবি কখন নিঃশব্দ পদে আমার স্কেচে আমার ড্রয়িংয়ে অলস মুহূর্তের হিজিবিজি আঁকাবুকির মধ্যে প্রবেশ করেছে, সেও বহুদিন অজ্ঞাত ছিল।
একদিন দেখি পরিচয় হওয়ার পর থেকে যত নারীমূর্তি এঁকেছি, প্রত্যেকটিতেই ওর আদল, কোনোটায় মুখের গড়ন, কোনোটায় দেহের ভঙ্গি, কোনোটায় চোখের দৃষ্টি। আমি সজ্ঞানে কোনোদিন ওকে আঁকতে চেয়েছি বলে মনে পড়ে না। অথচ এমন, এর অর্থ কী। অলৌকিক কিছু নয়, হবে নিশ্চয়ই রহস্যময়।
এ রহস্য যন্ত্রণারও জন্ম দেয় তা একদিন বুঝলাম। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল চৌকাঠের পাশের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে চাপানিটা খুলে ভেতরে যাই। কুয়োর কাছের ডালিম গাছের কয়েকটি কাক তাছাড়া বাড়িটা নিরলা নিঝুম। অনেক সময়ই এরকম থাকে কাজেই তা অস্বাভাবিক কিছু নয় কিন্তু আজকে বারান্দার সিঁড়ি মাড়িয়ে উঠতে আমার হৃৎপিণ্ডটা ঢিঢ়ি করতে থাকে। আশ্চর্য এ কি অভিজ্ঞতা! আমার মস্তিষ্কের শিরা বেয়ে শিরশির করে রক্ত উঠছে কেন? চোখদুটো ক্রমে ঝাঁপসা হয়ে আসছে! তাড়াতাড়ি স্টুডিওতে গেলাম, হাতের কাগজপত্রগুলো রেখে দাঁড়িয়ে পড়ি, এ কি আমি কাঁপছি! কম্পিত বুকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখি মেঝের ওপর ছবি ঘুমোচ্ছে! শিথিল বসন গভীর ঘুমে সে মগ্ন! সুডৌল পরিপূর্ণ দেহ! সুন্দর ঠোঁটজোড়া!
এতক্ষণ যা টিটি করছিল এবার এক নিমেষে তা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
আমি কি করি এখন আমি কি করি? সারা দেহে উথলে ওঠা থরথর যন্ত্রণার ভার যে আর সইতে পারছিনে।
এক অদ্ভুত ঝড়ের ওপর আমার কোনো হাত নেই, সে জেগেছে হয়তো নিজের নিয়মেই কাজেই ভীরুতার প্রশ্ন অবান্তর। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম। ছবির শিয়রের কাছে বসে এবার আমি স্তব্ধ হয়ে থাকি। কিন্তু সেও কয়েক মুহূর্তের জন্য। ওর মাথার চুলের দিকে ডান হাতটা এগিয়ে নিতে চাইলে হৃৎপিণ্ডের তলা থেকে উঠে আবার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে সেই কাঁপুনি।
নারীর দেহ বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি কথাটা শুনেছি; কবিতায় চিত্রে সঙ্গীতে ভাস্কর্যে তার স্তবগাথা মনে মায়াজালের বিস্তার করেছে। কিন্তু সেই নারীদেহ যে নীরবে জ্বলতে থাকা গনগনে ধাতুর মতো অগ্নিপিণ্ড, বাইরে অনেকের সংস্পর্শে এলেও তা কোনদিন উপলব্ধি করিনি। মোহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়েছি শুধু। ছবিও তো অনেকবার কাছে এসেছে? কিন্তু অন্যের উপস্থিতিতে যা ছিল প্রচ্ছন্ন আজকের নির্জনতার সুযোগে তাই ফণা তুলে দাঁড়িয়েছে। একে কি করে দমিয়ে রাখব? অথচ ও টের পেলে নিমেষে আমার মুখোশটা খুলে পড়বে এবং যদি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হই সেই বিপর্যয়কে কি মেনে নিতে পারব?
পারি বা না পারি সেই হবে ভালো। ঝরনার উৎসমূলে যাওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণকে ভীরুতার জন্য হারালে অনুশোচনার অবধি থাকবে না।
শিয়র থেকে উঠে যাওয়ার পর ডানপাশে বসে ওর বুকের ওপর থেকে একটা হাত তুলে নিই। গোলগাল সাধারণ একটা হাত কিন্তু কি অদ্ভুত এর জাদু! আমার শিরায় শিরায় দ্বিগুণ বেগে বহ্নি ছড়িয়ে দিল। কিন্তু এটা হয়তো নয়। আমার চোখের সামনে উন্নত জগতের সেই পবিত্র যুগল তীর্থ যার অমৃতধারা মানবজাতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। একে নিপীড়িত লুণ্ঠন করাই প্রত্যেক পুরুষের ধর্ম, আমি কি একনজর দেখতেও পারব না? এতকাল ধরে শূন্য ছিলাম এই আশ্চর্য!
কাপড়ে টান লাগতেই ছবির চোখের পাতা খুলে গেল এবং আমাকে দেখতে পেয়ে ধড়মড় করে উঠে বসল।
ছি! ছি! জাহেদ ভাই তোমাকে আমি অন্যরকম, কিন্তু ওর কথা শেষ হতে দিলাম না, বুকের কাছে টেনে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরলাম।
ছবি কিছুক্ষণ নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করে কিন্তু, অসমর্থ হয়ে দুই চোখের পানি ছেড়ে দিল।
তোমার কোনো ক্ষতি করব না, লক্ষ্মী, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
ভালোবাসা! অনিরুদ্ধ জ্বালাময় কণ্ঠে ছবি বলল, এরই নাম ভালোবাসা! এ তো চুরি, ডাকাতি! ছাড় দাদা এক্ষুণি ফিরতে পারে।
