ছবি আঁকায় মগ্ন কিন্তু মনের হদিস মিলছিল না বলে নীল আকাশে হেমন্তের লঘুমেঘের মতো ধীরে ক্ষোভ জমে উঠল। তুলি রেখে দিই, ইজেলটা গুটিয়ে ফেলি। রান্নাঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। অগোছালো বেশ ছবি কাঠের চামচেটা ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ির ভেতরে দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়ছিল। আমার উপস্থিতি ওর গোচরে এলো না। একটু উচ্চেঃস্বরেই জিজ্ঞেস করলাম, দাদা কোথায় গেলেন ছবি?
আচমকা ফিরে চাইল সে। বলল, বাইরে।
কান্নার রেখায় স্নান ওর স্নিগ্ধ মুখখানা, কিন্তু তবু সুন্দর। আমি বললাম, আমি আসি এখন ছবি, দাদাকে বলো।
খেয়ে যেতে বলেছে, ফিরে এসে না দেখলে রাগ করবেন।
তুমি বলো একটা জরুরি কাজ ছিল তাই চলে গেলাম। কথাটা বলতে ইচ্ছে হয়েছিল; কিন্তু আর মুহূর্তমাত্র দেরি না করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ছবি বুঝুক আমারও খানিকটা তেজ আছে।
জেদ জিনিসটা ভালো নয় শুনতাম! এবং সেজন্যই তাকে ভালো করে ধরলাম। এদেশে ভালো হওয়ার সব পথই বন্ধ কিন্তু খারাপ হওয়ার জন্য রাস্তার অভাব নেই। এতদিন সে রাস্তা মাড়াইনি। মনে হয়েছে অর্থহীন, অনাবশ্যক। কিন্তু অন্ধকার মেসের ছোট্ট চৌকিটার ওপর শুয়ে আজকে ভাবি, শিল্পী হতে চাইলে শুধু স্বর্গ নয় নরককেও দেখা দরকার।
স্যাঁৎসেঁতে একটা বড় রুমের চারধারে চারটি চৌকি আমরা চারজন থাকি। একজন ডাক্তার একজন সাংবাদিক এবং মুজতবা আর আমি চিত্রী। চারজনই শিক্ষানবীশ; কিন্তু সেই শিক্ষা যে কোন লাইনে গড়াচ্ছে সেটাই বিবেচ্য। ডাক্তার করিম এক নার্সের পেছনে লেগে আছে, সাংবাদিক আবার কবিতাও লেখে বিশেষ করে বাচ্চাদের ছড়া। সেই সূত্রে একটি নাচিয়ে বালিকার সাথে পরিচয় আর তারই তাপে সে দগ্ধ নিয়ত এবং মুজতবা তো একাই এক শো। কোথায় ঘোরে কোথায় খায় সেই জানে। রাত একটা-দুটোর আগে কদাচিৎ ফিরে আসে।
একটা জিনিস শুধু জানি ওরসে হলো ন্যড আঁকতে সে পারদর্শী। ওর মতে দেহ বিশেষ করে নারীদেহই হচ্ছে সবকিছুর গোড়া, সৃষ্টির নাড়িনক্ষত্র জানতে চাইলেও এখন থেকেই শুরু করতে হবে। ভাস্কর আর চিত্রী তো এক মুহূর্তের জন্যও তা বাদ দিতে পারেন না।
ওর বড় বেতের বাক্সটা এমনি সব উলঙ্গ ছবিতে ভর্তি। তারা বন্ধ করে রাখে। বন্ধু-বান্ধব চাইলেও দেখায় না। কারণ এগুলি হজম করা যার তার পক্ষে সম্ভব নয়।
শিল্পী মাত্রই অহঙ্কারী এবং আত্মপ্রচারে উৎসাহী। দ্বিতীয়টা সম্বন্ধে মুজতবা আপাত উদাসীন হলেও তার মধ্যে প্রথমটার উচ্চতা এত বেশি যে প্রথম পরিচয়ের ক্ষণে রীতিমতো ধাক্কা খেয়ে ফিরতে হয়; নিজের চারপাশে সর্বদাই সে একটি দুর্ভেদ্য রহস্যের পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে রাখে এবং এখানেই যেন তার আত্মতৃপ্তি। কোথায় কাজ করতে যায় বহুবার জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু জবাবে মিলেছে কুঞ্চন। এসব জানা সত্ত্বেও একবার অনুরোধ করেছিলাম, আমাকে নিয়ে যাও না ভাই তোমার সঙ্গে একদিন কাজ করে দেখি!
সিগারেটের টুকরোটা ওর নিজস্ব কায়দায় আঙুল ছটকে জানালার বাইরে ছুঁড়ে বলেছিল, আদার বেপারির জাহাজের খবর কেন। এমনিতেই তো ভালো আছি।
বন্ধুদের কোনো মর্যাদা তুমি দিলে না সেজন্য আমি সত্যই দুঃখিত!
একটা কথা বলি জাহেদ রাগ করিসনে। শিল্পীদের মধ্যে কখনো বন্ধুত্ব হয় না, এ আমি বিশ্বাস করি। একজন শিল্পী যখন অন্য একজনের কাজকে প্রশংসা করে তখন বুঝতে হবে সে মনের কথাটি বলছে না। এ নিছক প্রতারণা।
হতে পারে। আমি বললাম, তবু সবক্ষেত্রে একই সূত্র দিয়ে সবকিছুকে বাতিল করা বোধ হয় ঠিক নয়।
এখানে ব্যতিক্রম আমার চোখে পড়েনি। আমরা পরস্পর কুৎসা রটনাতেই এত ব্যস্ত যে এমন কি ছবি আঁকবার সময় পাচ্ছিনে। ছাত্র আছ এখনও ঠিক বুঝতে পারছ না। বেরিয়ে এসে দেখবে সব পরিষ্কার। সে জন্য যার যার কাজ করে যাওয়াই সঠিক পন্থা। আমি শিল্পী হিসেবে পরিচিত হতে চাই এবং নামও কিনতে চাই; কিন্তু তার জন্য জয়নুলের কাজকে খাটো করে দেখবার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। আমাদের চিত্রশিল্পের ভিত্তি গড়েছেন তিনি, তার কাকের পাখা থেকেই পরবর্তী উত্তরাধিকারের জন্ম এবং আগামীকাল সে বিচারে ভুল করবে না, তাকে পিতা বলেই স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু আজ? আজ তার সমালোচনা করতে পারাটাই যেন কৃতিত্ব! একটু থেকে মুজতবা বলল, কিন্তু সেই অন্ধদের জানা উচিত শুধু দুর্ভিক্ষের স্কেচের জন্যই জয়নুল চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন!
আমাদের সঙ্গে কাটা কাটা কথা বলাই ওর অভ্যেস কিন্তু সেদিন কেন জানি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল তাই বিস্তারিত সংলাপ।
আমি নরম হয়ে বললাম, তোমার কাজ সত্যি আমার ভালো লাগে এবং বন্ধু হিসেবেই এখন বলছি। আমাকে একদিন তোমার সঙ্গে নিয়ে গেলে কৃতজ্ঞ থাকব!
বেশ চলো এদিন! ও বলেছিল, কিন্তু ওখানে গিয়ে কাঁচুমাচু করলে চলবে না, বলে রাখছি।
ঠিক আছে। কাঁচুমাচু করব কেন। আমি একেবারেই নিরীহ প্রকৃতির, এ তোমার ভুল ধারণা!
দেখা যাবে! বলতে-মুজতবার ঠোঁটের তলে একটুখানি বাঁকা হাসি ফুটে উঠেছিল। ওর গর্ব অপরিমেয়।
এবং তা অকারণে নয় আজ ওর সঙ্গে এসে অনুভব করলাম। বেলা মাত্র আড়াইটে উজ্জ্বল দিন কিন্তু যেখানে আমাকে নিয়ে এলো, সেখানে অমন দিনে দুপুরে আসাটা যথেষ্ট সাহসের পরিচয়। ওর আত্মম্ভরিতার মতোই বলে উঠলাম, এখানে তুমি আস!
