হ্যাঁ, ঘরে কিছু নেই, চা, চিনি কিনতে গিয়ে আমার মনে হলো ঘরে চাল-ডাল কিচ্ছুই হয়তো নেই।
পকেটে পাঁচটি টাকার একটি নোট ছিল। রং কেনবার পয়সা। সবটা খরচ করে ফিরে এলাম।
বড় কামরার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় ডাক দিলাম, ছবি! ছবি!
ছবি প্রথম বুঝতে পারেনি, বারান্দায় পা দিয়েই হকচকিয়ে উঠল। কিন্তু আমাকে দেখতে পেয়ে সরে গেল না। আমি দ্রুতপদে কাছে গিয়ে চটের থলেটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, এই নাও। ছবি থলেটা হাতে নিয়ে বলল, এসব কেন। দাদা জানতে পারলে খুব রাগ করবেন।
সে জন্যই তোমাকে দিচ্ছি। ওকে জানিও না, আর কিছু মনে করো না তুমি লক্ষ্মীটি!
ছবির চোখের মণি আমার দিকে হঠাৎ দপ্ করে জ্বলে উঠল; কিন্তু সে এক মুহূর্তের জন্য। মাথাটি নিচু করে চলে এলাম। আমি তো সজ্ঞানে এই কথাটি উচ্চারণ করতে চাইনি? তবে কেন এমন হলো? ও নিশ্চয়ই তা বুঝতে পেরেছে, নইলে প্রতিবাদ করত।
এরপর বিজ্ঞাপনের ডিজাইন আঁকতে আর বলতে হলো না-জামিল কাজ করছিলেন; আমিও তুমি টেনে নিয়ে বসে যাই। আশ্চর্য, এটি হয়ে গেল। আমি তো চাইনি এমন কিছু? আমি জানতে পারিনি অতি সাধারণ শাড়িপরা দুঃখের দুলালী এই নিরাভরণ মেয়েটি কখন আমার অন্তরে প্রবেশ করেছে। অল্পক্ষণের পরিচয়, তাতেই যে বেদনার সরোবর টলমল করে উঠল, আমার ছোট্ট সম্বোধনটি হয়তো তার থেকে জন্ম নেওয়া লাল পদ্ম!
স্বপ্নচ্ছন্নের মতো একমনে কাজ করে চলেছি, সারাক্ষণ মনের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন আলোড়ন!
ছবি চা নিয়ে এলে আমি আর চোখ তুলে তাকাতে পারলাম না। একটা চুমুক দিয়ে জামিল বললেন, প্রথম দিনেই আমাকে ঋণী করে ফেললে জাহেদ। এ আমি সাধারণত স্বীকার করি না। কিন্তু তোমার প্রতি একটা দুর্বলতা জাগল, ভালোমতো বাধা দিতে পারিনি।
আমি বললাম, আপনি বড় বেশি ভাবেন, নইলে বুঝতেন এ ব্যাপারটাকে ঋণ বলা যায় না কিছুতেই।
এরপর নীরবতা। হিমানী কেশতৈলের লেবেল, চৌকোণা ঘরে স্বদেশী চিত্রতারকার ছবি থাকবে, অবশ্যি চেহারার একেবারে কপি নয়, অনেকটা মিল শুধু। ফটোগ্রাফ থেকে হুবহু মেরে দিলে আইনের আওতায় পড়তে পারে, অথচ ক্রেতাদের আকর্ষণ করবার জন্য দেওয়াও প্রয়োজন। তাই দুইয়ের মধ্যে একটা সমঝোতা। এটা আমিই করছি। আর উনি করছেন একটা সিনেমার বিজ্ঞাপন।
ছবির ডাকে মাঝখানে একবার উঠে গেলেন জামিল, খানিকক্ষণ পরে হাসিমুখে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, তোমাকে আজকে এখানে খেতে হবে। অবশ্যি দাওয়াতটা। আমার নয় ছবির। কাজেই বুঝতে পারছ না বলার কোনো মানে নেই!
আমি বললাম, ভোজন জিনিসটা সর্বদাই আমার কাছে লোভনীয়, কাজেই সে আশঙ্কা বৃথা!
জামিল হেসে বললেন, আমার সঙ্গে তোমার বেশ মিল দেখছি! খাদ্যবস্তুর প্রতি আমারও ভয়ানক দুর্বলতা। একদিন ছিল
হঠাৎ থেমে গেলেন। কেন জানি মুখে বিষণ্ণতার ছায়া নেমে এসেছে। আমি তাকে লক্ষ্য করে বললাম, থামলেন কেন, শেষ করুন।
না ভাই! আজ নয়। সব জিনিস, আস্তে ধীরে জানাই ভালো। তাতে অন্তত কৌতূহলটা বজায় থাকে এবং তার দাম কম নয়।
এভাবেই ভাইবোনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল খানিকটা অস্বাভাবিক কিন্তু অসাধারণ কিছু ছিল না। খেতে বসে জামিল বলেছিলেন, জানো জাহেদ, ছবি সত্যিই ভালো মেয়ে। ও না থাকলে আমি রাস্তায় পড়ে মরতাম। তোমার কাছে লুকিয়ে লাভ নেই, দুদিন বাজার করতে পারিনি কিন্তু তবু ঠিক সময়ে খাবার পেয়েছি। কোত্থেকে যে সে জোগাড় যন্ত্র করে আনে আমি বুঝি না।
ছবি এতক্ষণ কপাটের কাছে দাঁড়িয়ে তদারক করছিল, নিজের সম্বন্ধে কথা শুনতে পেয়ে আড়ালে চলে গেল।
ও কোথাও চলে গেলে আমার কি অবস্থা হবে মাঝে মাঝে তাই ভাবি।
এতক্ষণ কথা বলতে পারছিলাম না, এবার সুযোগ পেয়ে বললাম– চলে যাবে কেন?
জামিল সশব্দে হেসে উঠলেন। বললেন, তুমি দেখছি সত্যি ছেলেমানুষ। চলে যাবে কেন! আছে যে এটাই বিচিত্র। মেয়েদের বিশ্বাস নেই রে ভাই!
উনি যখন কথা বলছিলেন সামনের দেয়ালে টাঙানো ফটোটার দিকে চেয়ে ছিলাম। নিঃসন্দেহে জামিল এবং তার বৌ। বিয়ের পোশাকে তোলা ছবি। মেয়েটার কপালে টিপ। বেনারসি শাড়ির ঘোমটা টানা সলজ্জ মধুর মুখোনি। কাটা সুন্দর চেহারা। জামিলের গায়ে পাঞ্জাবি, মাথার চুল বড়-বড় ঘাড় অবধি নেমেছে। প্রশস্ত কপালের নিচে চোখজোড়া উজ্জ্বল। গাল তোবড়াননা নয়। ছবিটা নষ্ট হয়নি। খুব জীবন্ত মনে হচ্ছে।
কোনদিন প্রকাশ না করলেও আমার জানতে দেরি হয়নি। কলকাতা আর্ট স্কুলের ছাত্র জামিল চৌধুরী সহপাঠিনী মীরা দাশগুপ্তার প্রেমে পড়েছিলেন। অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে আউটডোর স্কেচ আর পিকনিকের আড়ালে চলত তাদের মন দেওয়া-নেওয়া। সুযোগ মতো লম্বা লম্বা-চিঠির আদান-প্রদান। আগুন কখনো ছাই চাপা থাকে না। এ ব্যাপার নিয়ে সে কি কানাঘুষা হৈ চৈ! জামিলের প্রাণই বিপন্ন হয়েছিল। কিন্তু একমাত্র মীরার গুণে শেষ পর্যন্ত আদালতে দুজনের বিয়ে হতে পারল। দিনটা ছিল সতেরোই আগস্ট উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সন; লোকের প্রবাহের সঙ্গে সেদিন বিকেলের ট্রেনে ওরা চলে এসেছিলেন ঢাকায়।
অথচ এখন দু বছর ধরে ছাড়াছাড়ি! ছবি হাতের নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল, বৌদির একটা অদ্ভুত ধারণা জন্মে গেছে। তার ফলেই এই কাণ্ড। দুটি ছেলেমেয়ে আছে। দাদার সঙ্গে থাকলে নাকি ওরা মানুষ হতে পারবে না!
