জানা নেই শোনা নেই একেবারে তুমি সম্বোধন! বয়সে না-হয় একটু ছোটই হবো কিন্তু ভদ্রতা বলে একটা জিনিশ তো আছে? তবু ঝগড়া করা বৃথা। বললাম, এই কিছু কিছু।
খাসা জবাব। কিন্তু জানো হোড়াই হোক বেশিই হোক সেই একই ব্যাপার! বসে বসে ভেরেণ্ডা ভাজা! চুরিচামারিরও একটা দাম আছে, কিন্তু ছবি আঁকার নয়।
নাম বলতেই শো-কেসের ওপর থেকে আমার হাতটা টেনে নিয়ে করমর্দন করলেন। লোকটা খ্যাপা নাকি?
জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে চেনেন আপনি?
কিছুটা! স্কুলের গত একজিবিশনে ছাত্রদের মধ্যে তোমার কাজই আমার সবচে ভালো লেগেছে, তোমার কম্পোজিশন আর ডাইমেনশন জ্ঞান চমৎকার, ড্রয়িং ভালো রং এখনো বোঝনি তবে আস্তে আস্তে হয়ে যাবে। একটানা কথাগুলো বলার পর দোকানির চোখের সামনেই দুটো টিউব তুলে নিয়ে বললেন, চল একটু তোমার সঙ্গে কথা আছে!
ছবির দাদা জামিলের সঙ্গে এই ভাবেই পরিচয়। প্রথম দিনেই গলির ভিতরে তার ভাঙাচোরা বাসার অন্দরে নিয়ে গিয়েছিলেন। দুকামরার বাড়ি ইট সুরকি ভেঙে পড়েছে
কেমন স্যাঁতসেঁতে, একটি ঘর কিছু বড় আরেকটি ছোট। সেটার মধ্যে তার স্টুডিও তার একধারে ছোট্ট একটা চৌকি! রাত্রে হয়তো থাকে কেউ।
স্টুডিওটা মূর্তিমান জঙ্গল। ফ্রেম রং কালি তুলি কাগজ বিড়ির টুকরো বিজ্ঞাপনের ছবি গাদাগাদি ছড়াছড়ি। ঘরটা বছরেও একবার গুছানো হয় কিনা সন্দেহ। গুছিয়ে দেয়ার কেউ নেই এমন নয় তবে পরে জানতে পেরেছিলাম। জামিলই তা করতে দেন না। পরিপাটি দেখলেই নাকি প্রায় পাগল হয়ে যান এবং হাতের কাছে যা পান তাই নিয়ে মারতে আসেন।
ছবি! ছবি! স্টুডিও ঘরে ঢুকেই জামিল ডাক দিলেন, একটা প্যালেট টেনে নিয়ে আমাকে বললেন, একটু ধরো।
তখন হালকা সবুজ রঙের সস্তা শাড়ি পড়া আলুথালু বেশ একটি মেয়ে চৌকাঠে পা দিচ্ছিল কিন্তু আমাকে দেখতে পেয়েই আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।
লজ্জা পাচ্ছিস কেন রে! এদিকে আয় পরিচয় করিয়ে দিই, জাহেদুল ইসলাম, আর্ট স্কুলের ফাইনাল ইয়ারের ফার্স্ট বয়, খুব ভালো ছেলে!
কিন্তু ছবি আড়াল ছেড়ে এলো না। আমি ওর মনটা যেন বুঝতে পারলাম, বললাম, ঠিক আছে আস্তে আস্তে পরিচয় হবে।
জামিল এটা সেটা নাড়াচাড়া নিয়ে ব্যস্ত, কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ছবি! চুলায় আগুন আছে রে?
না! মিষ্টি গলার ছোট্ট একটা শব্দ।
আগুন জ্বালাতে অসুবিধে হবে?
না।
তাহলে আমাদের দুকাপ চা দে না! জামিলের কথা বলার ভঙ্গিটা লক্ষ্য করার মতো, যেন দীন হীনের কাতর প্রার্থনা। ছবি দরজার কাছে থেকে চলে গেলে আমাকে বললেন, কিছু মনে করো না ভাই জাহেদ, আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে। দুটো বিজ্ঞাপন একটি ডিজাইন তুমি করে দাও। ডিজাইন দুটো ঠিক সময়ে দিয়ে কিছু টাকা না নিতে পারলে সত্যিই বিপদ।
উত্তম পরিচয়! এ না হলে কি আর শিল্পী! জীবনকে ইতিমধ্যেই কিছু দেখেছি কাজেই অবাক হলাম না। একটু ইতস্তত করে বললাম, কিন্তু আমি যে কমার্শিয়াল আর্ট করি না।
করো না? খুব ভালো কথা। জামিল বললেন, হ্যাঁ কমার্শিয়াল ঢুকে গেলে আর্টকে ভুলে যেতে হয় অনেক সময়। কিন্তু এদেশে শুধু আর্ট নিয়ে থাকতে পারবে কি না সন্দেহ। পাস করে বেরোও সব দেখতে পাবে। তোমাকে আজ এ-কাজটা করতেই হবে। এরকম তো আর করতে যাচ্ছ না তুমি? একটা ড্রয়িং শুধু কপি করে দেওয়া।
ঠিক আছে বলে দরজার দিকে চাইতেই দেখি ছবি, এবারে সে ওর মুখের অর্ধেকটা ও একটি চোখ আড়াল থেকে নিয়ে এসেছে এবং আমি চাইলেও তা সরিয়ে নিল না। তেল না দেওয়া অবিন্যস্ত চুল কেমন করুণ চেহারাটি যেন নীরব অশ্রুজলে মলিন হয়ে যাওয়া। আমার দিকে সে চাইল, একেবারে শূন্য, ভাবলেশহীন দৃষ্টি। পরে আস্তে করে ডাকল, দাদা!
জামিল প্যালেটে রঙ তৈরি করছিলেন, আমি ধাক্কা দিয়ে বললাম, আপনাকে ডাকছে।
কে? বলে মুখ তোলার সঙ্গেই বললেন, ছবি? কি ব্যাপার?
জামিল উঠে যেতে ছবি তাকে ডেকে ভেতরে নিয়ে গেল।
একটু পর ফিরে এসে চৌকাঠের কাছে থাকতেই সশব্দে হেসে উঠলেন। আমি বললাম, কি ব্যাপার! হাসছেন কেন?
কারণ ঘটেছে তাই। আমাদের সম্বন্ধে কি ভাববে তুমি, তাই ভেবে আমার হাসি পেল। এই প্রথম দেখ, অথচ কি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা!
না, না, সে কিছু নয়! আমি বললাম, আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে বরং আমার লাভই হলো। অনেক কিছু শিখতে পারব। কলকাতা আর্ট স্কুলের ছাত্র আপনি, বড় বড় গুণীর সঙ্গে কাজ করেছেন।
হ্যাঁ তা বটে। তা বলতে পারো! জামিলের কণ্ঠস্বর হঠাৎ ভারি হয়ে এলো, বললেন, টিচাররা আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। আমি কাজও করতাম মন্দ নয়। যাগগে, ওসব কথা। বলছিলাম কি প্রথম পরিচয়, তোমাকে ডেকে এনে কাজে লাগালাম তারপর দ্যাখ চা খাওয়াতে বললাম, ছবি বলে চায়ের পাতা নেই- কেনার পয়সাও যে নেই। তাই হাসছিলাম, পরিচয় যখন হয়েছে দেখে যাও আমাদের অবস্থা।
অজান্তেই আমার মুখটা লজ্জায় ছেয়ে গেল না। বললাম, যদি কিছু মনে না করেন, আমার কাছে পয়সা আছে। চা কিনে নিয়ে আসি।
না তুমি যাবে কেন, আমার কাছে দাও।
না-না আমিই যাই। কোনো অসুবিধে হবে না। আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
দারিদ্রকে ঘৃণা করি কিন্তু অন্যের দারিদ্র মোচনের ক্ষমতাও নেই। এক পয়সা দু’পয়সা সাহায্য দিয়ে সে অসম্ভবও বটে। সমাজের কাঠামোটাকেই পাল্টে দিয়ে দারিদ্র্যের অবসান ঘটানোই আমার সংকল্প। সেজন্য ভিক্ষে কখনো দিইনে। ভিক্ষুককে কিছু দেয়ার মানে ভিক্ষাবৃত্তিরই পোষণ এবং ভিক্ষুকের জাতি দুনিয়ার বুকে টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু এখানে সে ব্যাপার নয়। অবস্থাটা এত স্পষ্ট ছলনার প্রয়াসটুকু পর্যন্ত অনুপস্থিত। কেউ হয়তো বলবেন এ অন্য ধরনের প্রতারণা। ভদ্রতার আবরণে না ঢেকে খোলাখুলি হয়ে যাওয়ার মধ্যে একই উদ্দেশ্য সিদ্ধির অধিকতর জোরালো ভঙ্গিটাই বর্তমান। কিন্তু আমি বলি ঘরে যে কিছু নেই এটা তো আর ছলনা নয়? জামিল যে ক্ষুধার্ত এটাও ছলনা নয়? ছবির মুখটা গভীর করুণ এখানে কোথায় ছলনার চিহ্ন?
