না, না। সে কেন হবে! ছেলেটিকে দেখিয়ে বলল, ওর মা একটু রাখতে দিয়েছিল! রাখ ওকে দিয়ে আসছি!
ছবি আর অপেক্ষা না করে ঘর থেকে বেরুবার পর তাড়াতাড়ি সিঁড়ি মাড়িয়ে ওপরে গেল।
আমি ওঠে গিয়ে এলবামটা আনি। ছবির বহু যত্নে করা জিনিসটা, চকচকে কোণ দিয়ে প্রত্যেকটি ছবি লাগানো। প্রথমদিকের পাতাগুলোতে আমাদের ছবি দু’জনের নানা ভঙ্গিমার। ম্যারাজ গ্রুপটা প্রথম পৃষ্ঠায়। বেনারসি শাড়ি, নেকলেস, টিকলি-পরা আধো ঘোমটার মাঝে ছবি লাজুক লতাটি, আমি তার পাশে স্বমূর্তিতে বিরাজমান। রাশেদ ক্যামেরা এনে অনেকগুলো ম্যাপ নিয়েছিল একদিন, সে সমস্তই আছে। একটাতে আমি আঁকছি ছবি সিটিং দিচ্ছে; আরেকটা, ছবির মাথায় ফুল গুঁজে দিচ্ছি। অন্যটাতে দাঁত বার করে হাসছি দু’জনেই। জীবনের একেকটি মুহূর্ত কিন্তু কোনটাই তো কৃত্রিম নয়? অ্যালবামে আর আছে দাদার ছবি বৌদির ছবি। নোটন-শিউলির ছবি। কলকাতার কিছু দৃশ্যও আছে।
ছবি নেমে এলো। কাছে এসে বলে উঠল, একি! হঠাৎ অ্যালবাম দেখার শখ?
এই এমনি! আমি বললাম, আর শখ জিনিসটা তো হঠাই জাগে!
তাই নাকি? এত সূক্ষ্ম দর্শন আমি বুঝিনে, বাপু। ছবি আমার কাঁধে ভর দিয়ে রহস্যপূর্ণ স্বরে শুধাল, একটু যেন গম্ভীর মনে হচ্ছে? ব্যাপার কি?
বয়স হচ্ছে, মাঝে মাঝে একটু গম্ভীর হওয়া দরকার।
আরে বাব্বাহ্! সত্যিই দেখি রাগ করেছ! ছবি দু’হাতে আমার গলা জড়িয়ে আবদারের সুরে বলল, কি হয়েছে বলো না?
কিছু হয়নি! আমি হাসবার চেষ্টা করে বললাম, ছবি বিক্রির ব্যবস্থাটা করতে পারলাম না, খুব খারাপ লাগছে।
সত্যি? ছবি উচ্ছল হয়ে বলল, তাহলে তোমাকে একটা জিনিস খাওয়াব!
কি জিনিস?
এখন বলবো না। খোলা আঁচলটা কোমরে জড়াতে জড়াতে ও বড়ঘরে চলে গেল।
একটু পরে এসে মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, চোখ বোজ এবং হা করো।
কি জিনিস দেখিই না একটু!
না। আমার কথা না শুনলে দেব না! বেশ এই নাও।
চোখ বুজে হা করতেই ও গোলমতো একটা খাদ্যবস্তু টুপ করে ছেড়ে দিল। চিবিয়ে দেখি নারকেলের নাড়।
এরপর বাঁ হাতে ধরা পিরিচটা ডান হাতে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেমন হয়েছে!
চিবোতে চিবোতে বললাম, বেশ!
আমি সব দেখেছি, ছবি টের পায়নি, তাতে একটু সুবিধে হলো বটে, কিন্তু বুকের ভিতরে যে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে তাকে কতদিন ঢেকে রাখব? তা’তে জমবেই বাষ্প, নীলবিষের মতো কুটিলস্রোত, আর তা বাড়তে থাকবে ক্রমেই এবং কোনো দুঃসময়ে অগ্নিগিরির জ্বালামুখ ফেটে যাওয়ার মতো প্রবলবেগে উৎক্ষিপ্ত হবে। যে সুখ স্বর্গ গড়ে তুলেছি, নিজের হাতে তা ভাঙতে যাওয়া মহাপাপ; অথচ এখন মনের যে অবস্থা বোঝাঁপড়া না করেও উপায় নেই।
বিকেলে ছবি সেজেগুজে তৈরি হলো। বৌদির ওখানে যেতে চাইলে বললাম, আমি না গেলে হয় না? একটু কাজ করব ভেবেছিলাম।
ছবির অভিমান হওয়া স্বাভাবিক। কারণ আমার মুখ থেকে এমনি সময়ে এই ধরনের কথা এ পর্যন্ত শোনে নি। ও কোথাও যেতে চাইলে শত কাজ থাকলেও ফেলে গিয়েছি। ও ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, বেশ, তবে কাজই করো। আমাকে একটা রিকশা ডেকে দাও।
একলাই যাবে? জিজ্ঞেস করলাম।
ও বলল, কি আর করব। গুণ্ডায় যদি ধরে তোমার জিনিসই নিয়ে যাবে, আমার কি? নিজের জন্য আমার কোনো চিন্তা নেই।
আমি কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে, নিজের জন্য তুমি বাঁচতে চাও? বেঁচে আছ শুধু আমার জন্য?
ছবি কি ভেবে নিয়ে বলল, যদি বলি তাই?
বললাম, প্রমাণ চাইব।
এত কিছুর পরও প্রমাণ? ছবি ক্ষণকাল নীরব থেকে বলল, না, তোমাদের সত্যি নির্ভর করা যায় না!
আর তোমাদের বুঝি খুব যায়? আমার কথায় উষ্মর রেশ লাগলো, সে বিষয়ে সচেতন হওয়ায় শান্তস্বরে বললাম, বেশ চলো। তোমার সঙ্গে গেলেই তো আর কোনো ক্ষোভ থাকবে না?
না, থাক্। ছবি হাতব্যাগটা টেবিলে ফেলে দিয়ে বলল, যাব না আজকে।
কি ব্যাপার। উল্টো রাগ করলে নাকি? ও বেতের মোড়ায় বসে পড়েছিল আমি কাছে গিয়ে বললাম, আমি তো খারাপ কিছু বলিনি?
ছবি আমার হাতটা ওর কাঁধের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল, না তা নয়। যাবোই না আজকে। কোনো কাজ তো নেই।
শার্ট গায়ে দিতে দিতে বললাম, এমনই যখন করছ যেতেই হবে। না গেলে এখন আমি রাগ করব। তবে বৌদির ওখানে যাব না! চলো একটা ছবি দেখব।
ছবি আমার কথার জবাব না দিয়ে আঙুলের নখ খুঁটতে থাকে। ওর ভিতরে একটা আলোড়ন চলছে বুঝতে পারি। গুরুতর কিছু নয়। আলোছায়ার খেলা একটুখানি। সত্যি মেয়েদের মন অতি সূক্ষ্ম জিনিস।
আমি চটপট তৈরি হওয়ার পর রাস্তায় গিয়ে একটা রিকশা নিয়ে এলাম।
হয়তো কেউ চাইনি। কিন্তু তবু দু’জনের মাঝখানে ধীরে ধীরে নেমে এসেছে নীরবতার দেয়াল, দু’একবার কিছু বলবার চেষ্টা করেছি কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে একান্ত অপ্রাসঙ্গিক। আলাপে সুর লাগেনি। পৌনে দশটায় বাসায় ফিরে কাপড় বদলাতে বদলাতে শুধোলাম, কেমন লাগছে ছবিটা কিছু বললে না তো?
কি আর বলবো! আলনা থেকে একটা ব্যবহারি শাড়ি তুলে নিয়ে ছবি বলল, ইংরেজি ছবি আমার কখনো ভালো লাগে না। বড্ড বেশি উলঙ্গ!
উলঙ্গ নয়, বল বলিষ্ঠ। জীবনটাকে ওরা বলিষ্ঠভাবে নিতে জানে বলেই তার প্রকাশটাও বলিষ্ঠ।
তা বটে। একজনের বৌ হয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে ঢলাঢলি মাখামাখি করার মধ্যে বলিষ্ঠতা আছে বৈকি!
