কিন্তু তবু আভাসে ইঙ্গিতে সুযোগ-মতো ওকে বাজিয়ে নিতাম। কোনো আকস্মিক আঘাতে আচমকা বেরিয়ে আসতে হয়তো ওর না-বলা কাহিনির এক টুকরো।
কিন্তু সেরকম পরীক্ষা চালাতেও ইচ্ছে হলো না। নিজের অজান্তেই আমি যে ভুলে গেছি সব! কারণ মাসখানেকের মধ্যেই ছবির দেহে ভুবন ভোলানো রূপ ফুটে উঠেছে। ঠোঁটজোড়া মেদুর কোমল, গায়ে আপেলের রং চোখে যেন স্বপ্নের ঘোর। কণ্ঠস্বর মিষ্টি মধুর। ধীরস্থির চলনে বিজয়িনীর অব্যর্থ গরিমা। দেবীর মতো অভ্রান্ত পদক্ষেপে সে আমার ছোট্ট ঘরটিকে এবং ততোধিক অকিঞ্চিৎকর জীবনটিকে আলোকিত করে তুলেছে। এক অঙ্গে এত রূপ জানতাম না, চাইলে চোখ ফেরানো যায় না, এমনি।
বৌদি সেদিন ঠাট্টা করে বললেন, আবার আসবার সময় দোলনা কিনে আনব একটা। আগেভাগেই তৈরি হয়ে থাকা ভালো কি বলো?
প্রাচুর্যের ধারা খুলে গেছে, মনটা সারাক্ষণ তাই শিহরিত থাকে। ঘরে নবজাতকের পদধ্বনি, বাইরে ফসলের আগমনী। শারদীয় ছুটিটা কাজের মত্ততা দিয়ে ভরে তুলি। মাঠে মাঠে ধান, গাঁয়ের পথে কৃষকদের ব্যস্ততা, ঘরে ঘরে একটা উল্লাসের রেশ। যাদের জমি নেই তাদের কাজ মিলছে, বগলে কাস্তে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হলো। সপ্তাহে একদিন আমরা বেরোই বাইরে; আমরা ছয়জন-দাদা বৌদি ছেলেমেয়ে এবং আমরা দু’জন। যেদিন যেদিকে ইচ্ছে চলে যাই রাজধানী ছাড়িয়ে অনেক দূরে পয়সাকড়ি কিছু থাকে সে জায়গাতেই খাবার জোগাড় করে খাই। দু’দিন তো গেরস্থ বাড়িতে দাওয়াতই মিলেছে। সে কি আদর যত্ন। দুধ-গুড় পিঠা পায়েস!
বাইরে বেরিয়ে জামিল ভাই অনেকগুলো ভালো ওয়াটারকালার করেছেন সেটাই বড় কথা। আমিও কম আঁকিনি। কিন্তু আঁকাটাই বড় কথা নয় বরং বৈচিত্র্যের স্বাদ। শহরের বদ্ধ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এক অপূর্ব মুক্তি। পৃথিবীর কবিতা মরে না কখনো এই সত্য নতুনভাবে উপলব্ধি করি। শালিক টুনটুনি ধানের শিষ ঘাসফড়িংকে কতকাল ভুলে ছিলাম কিন্তু এরা যে পরম আত্মীয়! তাই বোধ হয় নতুন করে পেলাম।
সেদিন সকালে খাওয়া-দাওয়া করে বাইরে বেরিয়েছিলাম একলা, সন্ধ্যের সময় ফেরার কথা। কিন্তু পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেল। ছবি কিনবেন বলেছিলেন, বিদেশি দ্রলোকের সঙ্গে দেখা হওয়ায় চলে আসব ঠিক করলাম। রাশেদ বলছিল বাসায় যখন বলে এসেছি ওর ওখানে গিয়ে বিকেলটা কাটিয়ে দিতে, এমনকি, ইংরেজি ছবির মেটেনি শো দেখবার অফারও ছিল। কিন্তু মনটা বাসায় আসার জন্য রুখে উঠেছে।
বললাম, নতুন একটা অয়েল শুরু করেছি, এখন সেটার ওপর কাজ করতে ইচ্ছে হচ্ছে বড়।
আরে রাখ। রাত্রে কাজ করলেই চলবে! আর এত এঁকে কি হবে? জীবনে দুতিনটে কাজ করবি এরপর দাড়ি রেখে গম্ভীর হয়ে বসে থাকবি ব্যস নির্ঘাৎ বিখ্যাত! আসল শিল্পীরা আঁকে না, আঁকার ভান করে!
আমি তো আঁকছি না, রং তুলি দিয়ে হাতের চুলকানো মেটাচ্ছি মাত্র! বুঝলে কিনা?
রাশেদকে এককাপ চা খাইয়ে বিদায় নিয়ে এলাম। আসবার সময় ও পরিহাস করে বলল, আরে শালা লঙ্কায় গেলেই হনুমান। এদ্দিন হয়ে গেল এখনো এত টান, ভীমরতি আর কাকে বলে!
এর জবাবে কিছু না বলে শুধু একটু হেসেছিলাম। বালখিল্যতার কাছে চুপ থাকাই বাঞ্ছনীয়। পুরুষের সংস্পর্শে না এলে নারী পূর্ণ হয় না, আবার নারী সংসর্গহীনতায় পুরুষও থাকে অপূর্ণ। গাছের মতো পাশাপাশি না বাড়লে উভয়ের খর্ব অবশ্যম্ভাবী। এদেশে মেয়ের সঙ্গে ছেলের দেখা হয় একবারই বাসরঘরে আর সে দেখা দুজনকে কদাচিৎ সমৃদ্ধ করে। তাতে দেহের ক্ষুধা মেটে কিন্তু মেটে না মনের দাবি। দৌড়-ঝাঁপ, খেলাধুলা, হাসিকান্নায় পরস্পরের গন্ধ শুঁকে বড় হতে না পারলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ধারা চোরাবালিতে মুখ গুঁজে থাকবেই!
একটি সাধারণ মেয়েরই সংস্পর্শে এসে আমি কতটা বিস্তৃতিলাভ করেছি বন্ধুরা তা জানে না। উপলব্ধি করার ক্ষমতাও তাদের নেই। তাই সময়ে অসময়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ।
বাসার কাছে এসে একটা দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলে মাথায়। আমি সন্ধ্যায় ফিরব এ বিষয়ে ছবি স্থিরনিশ্চিত; কাজেই কাছে গিয়ে হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করে ওকে চমকে দেওয়া যাবে।
দোরের পর্দা ফাঁক করে পা টিপে ঘরে ঢুকলাম। ছবি কোণার জানালার ধারে বসে আছে পেছন ফিরে খোলাচুলের মাথাটা কোলের দিকে নিচু করা। কিন্তু আশ্চর্য, ওর ডানহাতের কনুইয়ের কাছে দু’টি ছোটো ছোটো পা, মাঝে মাঝে নড়ছে নিশ্চয়ই শিশুর পিঠের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে দেখি সত্যই বাচ্চা। চিনতে পারি অধ্যাপকের ছেলে, মুষ্টিবদ্ধ হাতদুটো মাঝে মাঝে তুলছে। আমি হতভম্ব নির্বাক; আস্তে আস্তে বরফের মূর্তির মতো জমে যেতে থাকি।
যেভাবে ঢুকেছিলাম তেমনি চুপি-চুপি উঠে বেরিয়ে এলাম। স্টুডিও ঘরে ঢুকে ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দিই। ছবি সন্তানের জননী এ বিষয়ে আজ আমি একেবারে নিঃসন্দেহ।
ওর উৎকট শিশুপ্রীতির একটা হদিস পাওয়া গেল।
কিছুক্ষণ পরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরতলায় যাওয়ার আগে ছবি স্টুডিওতে একটু উঁকি মারল। আমাকে দেখতে পেয়ে একেবারে তাজ্জব। ঘরে ঢুকে বলল, ওমা! তুমি যে!
স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে বললাম, হ্যাঁ আমি। অবাক হয়ে গেলে বুঝি?
তা নয়তো কি? আমি আশাই করিনি। কেন গিলবার্ট সাহেবের কাছে যাওনি?
গিয়েছিলাম। পাইনি তাকে। কেন, চলে আসায় তোমার কোনো অসুবিধা হলো নাকি?
