আমাদের দেশের মেয়েরা যা গোপন করে সে দেশের মেয়েরা কারুর প্রেমে পড়লে ছলনা দিয়ে তাকে ঢাকে না, এতে অপরাধ কোথায়?
না অপরাধ নেই! এক জায়গায় পচে মরার চেয়ে ফুলে ফুলে মধু খাওয়া বরং আনন্দদায়ক।
ছবি তেরছা কথা বলতে শিখেছে মন্দ নয়। নীরবতার দেওয়াল ভেঙে গেছে কিন্তু এখন পড়ছে ধরা-না-দেওয়ার কাঁটাতার।
খাওয়া-দাওয়ার শেষে বারান্দায় খানিকক্ষণ পায়চারি করে নিয়ে গিয়ে বিছানায় কাত হলে আমি বসে ওর চুলে আদর করতে থাকি। সিগারেটটা পুড়ে শেষ হলে আস্তে ডাকলাম ছবি।
কি!
একটা কথা জিজ্ঞেস করি জবাব দেবে তো?
কোন্দিন জবাব দিইনি বলতো? ঘাড়ের কাছে হাত ভর দিয়ে পাশ ফিরে শুল!
ওর মনটা হালকা হয়ে গেছে দেখে আশ্বস্ত হলাম। বললাম, কথাটা বলবো কি ভাবছি।
আমার গলা গম্ভীর এবং গুরুতর; ছবি এবারে একেবারে উঠে বসল। জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার! মনে হচ্ছে সাংঘাতিক কিছু
মিথ্যে বলনি, একে সাংঘাতিকই বলা যায়! আমি অনেকক্ষণ চুপ হয়ে থাকি।
ছবি অধীর হয়ে বলল, কি ব্যাপার বলো!
হঠাৎ মগজের একটি কোষে যেন এক ঝলক দুষ্টরক্ত উজিয়ে গেল। আর তৎক্ষণাৎ বলে উঠলাম, তোমার একটা ছেলে হয়েছিল একথা সত্য কিনা?
তার মানে? ছবির মুখখানা একটি ফুকারে বাতির শিখা নিভে যাওয়ার মতো একেবারে রক্তহীন, সে যেন কাঁপছে মৃগীরোগীর মতো। ফিসফিস্ করে কোনো মতে উচ্চারণ করল, তুমি কি বলছ এসব?
সত্য বলছি, তুমি সন্তানের জননী! আমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার মাস ছয়েক আগে তোমার ছেলে হয়েছিল!
মিথ্যে! মিথ্যে! সব দুষ্টলোকের কারসাজি। আমাদের সুখ সইতে পারছে না। কে বলেছে একথা? বলল, বলো কে বলেছে?
কেউ বলেনি আমি নিজেই বুঝতে পেরেছি।
ছবি অপ্রকৃতিম্ভের মতো বলল, তুমি ভুল বুঝেছ, সব ভুল!
না, না, ভুল নয় এ সত্য। আমি ক্ষিপ্তের মতো ওর দু’ কাঁধে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলতে থাকি, কেন, কেন? কেন এমন প্রতারণা করলে! বল নইলে গলা টিপে মেরে ফেলব!
ছবির দু’চোখ দিয়ে দর্দ করে পানি বেরিয়ে এলো। বলল, আমাকে মেরে ফেল তুমি, সেই ভালো! সেই অনেক ভালো।
হিংস্ৰচোখে চেয়ে আরো দৃঢ়স্বরে আমি বললাম, যা ভেবেছ সহজে তোমাকে ছাড়ছিনে। বলতে হবে! সব বলতে হবে! বলো!
আমার চিৎকারে দরোজা-বন্ধ ঘরটা কেঁপে উঠল, ছবি বাঁ হাতে আমার মুখ চেপে ধরে! সে কাঁপছে আমিও কাঁপছি।
ছিঃ ছিঃ! এমন করো না। লোক জড়ো হবে! বলবো সব বলবো শুনতে যখন চাও নিশ্চয়ই বলবো!
আমার মুখ ছেড়ে দিয়ে ও কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। ঘন ঘন ভারি নিঃশ্বাস পড়ছিল, আস্তে আস্তে কমে। স্থির হয়ে বসে স্বগতোক্তির মতোই বলল, আমি জানতাম এমন হবে একদিন। আর সেজন্যই তোমাকে বারণ করেছিলাম। কিন্তু আমার মানা তো তুমি শোননি? দেখলাম সত্যিই তুমি আমাকে ভালোবাস, সব দোষ ঢেকে দেবে, সব ক্ষতি সব বঞ্চনা। তবু তোমাকে বলতাম। কিন্তু বড্ড ভয় হলো। হতভাগী আমি, তোমাকে পেয়েছি হয়তো অনেক জন্মের পুণ্যের ফলেই। তাই বড্ড ভয় হয়। বললে যদি তোমাকে হারাই। দুর্ঘটনা একটা ঘটেছিল, সেটাই তো জীবনে চরম সত্য নয়। তোমাকে পেয়ে তার শেষ দাগটুকু পর্যন্ত মুছে গেছে, তাহলে মিছে পীড়িত হয়ে থাকি কেন। ভাবলাম ঐটুকু থাক্, কোনদিন সুযোগ এলে বলবো। কিন্তু সেই সুযোগ যে এত তাড়াতাড়ি এমনভাবে আসবে তা বুঝতে পারিনি!
আমি বিপর্যস্ত ভস্মীভূত, শুধু বিহ্বলের মতো তাকিয়ে থাকি। আঁচলে চোখ মুছে ছবি বলে চলল, আজ আমি কিছু লুকোবো না। সব বলবো। তুমি বিশ্বাস করতেও পারো নাও পারো। একটি মিনতি শুধু জানাব, তোমাকে একবিন্দু ফাঁকি আমি দিইনি এইটুকু যেন বোঝবার চেষ্টা করো। সেরকম কিছুর সম্ভাবনা আছে বুঝলে আমি প্রথমেই এই ঘটনাটি বলে নিতাম। আমি একবারই ভালোবেসেছি এবং সে তোমাকেই। মরি আর বাঁচি এটাই আমার জীবনের পরম সত্য! এ সত্য পদদলিত হলেও হতে পারে। কিন্তু সত্যের মৃত্যু নেই।
ছবি একমনে প্রায় ফিসফিস্ স্বরে আরো কত কি বলে যাচ্ছিল। এক সময় গিয়ে কিছুই আমার কানে ঢুকল না। সারাদেহে মৃত্যুর মতো ক্লান্তি, ঝিমিয়ে এসেছে চোখ। শরীরটা কখন এলিয়ে পড়ল তাও বলতে পারবো না। বাইরের জগৎ নিমজ্জিত হয়ে গেল। তা একরাত্রির জন্য বটে কিন্তু আমার চেতনায় অনন্তকালের মতো।
সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি ছবি আলুথালু বেশে আমার বুকের ওপর। আমার চোখেমুখে ছড়িয়ে আছে ওর চুলের রাশ এবং আমি তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আছি।
০৮. দুটি অন্তঃস্রোত
দুজনের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে দুটি অন্তঃস্রোত, এক মোহনায় গিয়ে কোন্ মুহূর্তে মিলবে জানি না; এখন সারাদিন শুধু মূক করে রাখল।
রাত্রে আবার খুলে যায় একটি ধারার মুখ। আমি বালিশে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছি, ধোঁয়াগুলো উড়ে উড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। কাছে বসে ছবি শুরু করল, আমাকে তোমার কাছে আর থাকতে দেবে কিনা জানি না, তবে বলে শেষ করতে দাও আমার কাহিনি। তখন বৌদি সবে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। দাদা একদম উদভ্রান্ত। সারাদিন বাইরে থাকেন। ঘরে চাল বাড়ন্ত সেদিকেও খেয়াল নেই। পান্নাদের বাসা থেকে ধারকর্জ করে চালাচ্ছি। একদিন দাদা একটি লোককে নিয়ে এলেন। স্যুট টাই পরা বেশ ধোপদুরস্ত। দেশি লোক কিন্তু ইংরেজি কথা বলেন। নাকি বিরাট মার্চেন্ট! পৃথিবীর বড় বড় শহরে তার কারবার। মাসের পনেরোদিনই উড়োজাহাজে থাকেন। দেদার টাকা। দাদার কাছে এসেছেন তার ফার্মের একটি মনোগ্রাম করবার জন্য। একহাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছেন। টাকা পেয়ে দাদার খুব ফুর্তি। আমাকে চা করে নিয়ে যেতে বললেন। আমার না করবার উপায় ছিল না। লোকটি খুব জবরদস্ত, ভারি গোঁফ তার। ঘরে ঢুকে তার চোখ দেখে আমি ভেতরে-ভেতরে শিউরে উঠি। দাদা তো আপনভোলা লোক, এসব তার নজরেই পড়বার কথা নয়। অথবা পড়লেও বিশেষ আমল দিলেন না।
