একটা সিগারেট ধরিয়ে উঠে গেলাম। ওর কাছে গিয়ে কানে কানে বলি, ছেলে তোমার চাই একটা, না?
ছবি কি ভাবছিল, চোখ তুলে চাইল আমার মুখের দিকে, অস্পষ্টভাবে বিড়বিড় করল, তা কি আমি বলেছি!
সব কথা বলতে হয় না ছবি। আমি বললাম, তাছাড়া প্রথমে দু’একটার দরকার তো বটেই। পরে না-হয় অন্য কিছু ভাবা যাবে।
জানালার একটি কপাটে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল ছবি। আমার বুকে ওর মাথাটা আস্তে করে এলিয়ে দিল। এ যেন নীরব সম্মতি।
রাত ক্রমে বেড়ে চলে। ঝিমিয়ে আসে গাছপালা, সারা প্রকৃতি। রুপালি চাঁদ নিস্তব্ধ পৃথিবীতে তার মায়া বিছিয়ে হাসে। ছবি এসে শুয়েছিল, এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে ঘুমোতে চায়নি, তাই এ-ঘুম যেন ওর নিজের নয়। আকাঙ্ক্ষার আবেশ বেয়ে যে সফলতা এলো, তারই সোনার কাঠির স্পর্শে যেন সে সুপ্তির অন্তরঙ্গ প্রবাহে নিমজ্জিত হয়ে গেছে।
ফিনফিনে জালের নতুন মশারিটা নড়ছে একটু-একটু, আমার চোখে ঘুম নেই। বাজে চিন্তার সূত্রটা কিছুতেই ছিন্ন করতে পারছিনে। বরং সে ফেনিয়ে ওঠে। এই রাত তো আর আসবে না কোনদিন ফিরে? ঘুম আসছে না সে ভালোই, আমি শিল্পী এই রাত, আমাকে অনেক দিয়েছে, আরও কিছু দেবে।
চাঁদ ঢলে পড়ল পশ্চিম আকাশে, নারকেল গাছের পাতার ফাঁকে সে উঁকি মারছে। সে কি দেখতে চায় দুটি প্রাণীর লীলাখেলা? তার আলো কিছুক্ষণ সরাসরিই পড়ে রইল মশারির ওপর এবং পরে আস্তে আস্তে সরে গেল।
আমার মনে একটা বিদঘুঁটে ভাব জেগেছে। আস্তে আস্তে উঠে ছোট্ট হারিকেনটা খুঁজে নিয়ে জ্বালাই।
সলতেটা যথাসম্ভব কমিয়ে রেখে শিয়রের দিকে এসে মনোযোগ দিয়ে দেখি ছবি গভীরভাবে শ্বাস ফেলছে। সহজে ওর ঘুম ভাঙবে না এ নিশ্চিত। সাবধানে বিছানায় উঠলাম। বাতিটা একধারে রেখে ওর সমস্ত আবরণ খুলে ফেলতে থাকি। আমি দেখব ওকে। এতদিন যাকে ঘিরে আকাশ-কুসুম রচনা করেছি, এত কাছে পেয়েও তাকে দু’চোখ ভরে একবার দেখতে পারবো না? অনেকদিন পরে এ ঔৎসুক্য থাকবে না হয়তো, থাকলেও এমন করে থাকবে না সুতরাং যতক্ষণ আছে ততক্ষণ উচিত মূল্য দিই।
একটা চাপা উত্তেজনায় হাতটা কেঁপে কেঁপে উঠছিল, তবু বাতিটা তুলে আনলাম। সলতেটা বাড়িয়ে দিয়ে ধরি। পরিষ্কার আলোকের মধ্যে ছবি পড়ে আছে সত্যি বড় নিটোল ওর দেহখানি। অঙ্গের বাঁকে বাঁকে, ভাঁজে ভাঁজে কি সুন্দর সুষমা! বহু সাধনায় ছেনিয়ে তোলা মর্মরমূর্তির মতো।
কিন্তু একি! এ সব কিসের চিহ্ন! ভালোমতো দেখতে গিয়ে কপালের দু’পাশের রগ ছটফট করতে থাকে। বই পড়েছি, ভুল হতে পারে না, এযে স্পষ্ট মাতৃত্বের ছাপ! নুয়ে ওর শরীরটা কে শুঁকে দেখি এসেন্সের আড়ালে আরো একটি গন্ধ আছে, যা, কেবল মায়ের গায়েই থাকতে পারে; তা হলে ছবি কি এতদিন প্রাণপণে লুকিয়ে এসেছে কিছু?
ও একটু নড়ে উঠতেই তাড়াতাড়ি বাতিটা কমিয়ে খাটের নিচে রেখে দিলাম।
পাশ ফিরতে গিয়েও হঠাৎ ধড়ফড় করে জেগে উঠল। আমাকে স্পর্শ করে বলল, একি! তুমি এখনো ঘুমাওনি?
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে একেবারে অনাবৃত দেখে ঝট্ করে উঠে বসে। আমি শুয়ে পড়েছিলাম। ঘুমজড়ানো স্বরে বললাম, কি হয়েছে!
ছিঃ ছিঃ, এ নিশ্চয়ই তোমার কাণ্ড; এতক্ষণ এসব পাগলামিই তুমি করেছ?
কই কিছু করিনি তো?
নাহ্ একেবারে সাধুপুরুষ। ছি ছি। লজ্জায় বাঁচিনে।
নিচে নেমে কাপড় পরবার পর ও জানালার কাছে গেলো চাঁদ হয় অস্ত গিয়েছিল নয় অনেক আড়ালে জানালাটা, তাই অন্ধকার। গাছপালায় ভোর হওয়ার আগেকার ঘোর লাগা ছায়া। শেষ রাতের হাওয়া বইছে। একদল পাখি কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে গেল। একটু পড়ে শোনা গেল বহুদূরের মিনারের প্রথম আজান।
জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছবি মাথায় কাপড় দেয়। পরম রজনী শেষ হয়ে এলো, এখন সে পরিতৃপ্ত।
এবং আমিও যা পেয়েছি জগতের মাপকাঠি দিয়ে তার পরিমাপ অসম্ভব। সে গোপনচারী তাকে ধরা যায় না। কেবল দেহের প্রতি আনাচে কানাচে অস্থির অভ্যন্তরে শিরায় শিরায় প্লাবনের মতো এসে কিছুক্ষণের জন্য মৌন মূক করে রাখে, তারপর চলে যায় কিন্তু বর্ষার শেষে পলিমাটির মতই রেখে যায় অমৃতের স্বাদ! আমিও তাকে তেমন করেই পেয়েছি।
কিন্তু তবু কাঁপ ভরে অনেক ফুল তোলার পর আঙুলের একটি কাঁটা ফোঁটার মতো মনের অতলে একটুখানি সন্দেহ খচখচ্ করতে থাকে। ছবি আমার কাছে লুকিয়েছে কিছু?
০৭. পর্যালোচনা করে বুঝতে পারি
মনে মনে পর্যালোচনা করে বুঝতে পারি এ এমন একটা ব্যাপার যা নিয়ে হৈ-চৈ করা চলে না। শাঁখের করাত আসতেও কাটে যেতেও কাটে। এও তেমনি উভয় সঙ্কট। যদি কিছু ঘটেও থাকে তবু সে সম্পর্কে প্রশ্ন করতে যাওয়ায় বিপদ আছে; কারণ তার প্রতিক্রিয়া কি হয় বলা মুশকিল। ও সাবধান হয়ে নিজেদের মধ্যে আরও গুটিয়ে যেতে পারে নয়তো পেতে পারে দুঃখ। আবার কিছু না বললেও মানসিক যন্ত্রণা।
তার চেয়ে ব্যাপারটা আস্তে আস্তে ভুলে যাওয়াই বোধ হয় ভালো। মেয়েমানুষের শরীর তার ওপর বিশ্বাস নেই বিনা কারণেও এমন হতে পারে। তাছাড়া নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকির খাতা শূন্য থাক, এইতো উত্তম পন্থা। যেমন করে পেয়েছি এ পাওয়ায় কোনো ফাঁকি নেই। এটুকুনই সত্য হোক না কেন। আসলে তো প্রত্যেকটি মানুষ একেকটি স্বতন্ত্র দ্বীপ। কে কাকে পুরোপুরি জানে? জানা সম্ভব নয়। অন্তর বাহির কারুরই এক হতে পারে না। সে শুধু দোষ ঢাকবার জন্য নয়, বরং এমন জিনিসও আছে মঙ্গলের খাতিরেই যা গোপন রাখা সমীচীন। ছবি যদি তেমন কিছু গোপন রেখে থাকে। তাহলে তো ওর কোনো অপরাধ নেই?
