ও খানিকক্ষণ নীরব থাকে এরপর কথা না-বলার মতো করে একটি ধ্বনি উচ্চারণ করে, কি-!
দুই হাত বুকের কাছে আলগোছে জড়িয়ে ধরে বললাম, তুমি সুখী হয়েছ?
আমার মুখ ওর মুখের কাছে। সে চোখজোড়া বাইরে থেকে ফিরিয়ে এনে চাইল। আস্তে করে বলল, হ্যাঁ।
একি! তোমার চোখে পানি! দুইবিন্দু অশ্রু ওর দুই চোখের কোণে চিচিক করছে। আমার মাথার চুলে একটা হাত, ও বলল, তোমাকে পেয়েছি। কাঁদবো না?
এত সুখ। তবে কান্না কেন?
প্রকৃত সুখের নামই তো কান্না! ছবি এত সুন্দর করে কথা বলতে শিখেছে! আমি হাতের আঙুল দিয়ে চোখজোড়া মুছে দিই। সে বলল, প্রথম দিন প্রত্যেক মেয়েই একবার কাঁদে সে জানো? এ কান্না কান্না নয়।
আমি বললাম, সত্যি ছবি আমি আশ্চর্য হচ্ছি তোমাকে পেয়েছি একি সত্যি অথবা স্বপ্ন?
জনমে জনমে আমি যে তোমারই ছিলাম। আমাকে পাবে সে তো নতুন কিছু নয়।
তোমার কথাই বোধ হয় ঠিক। নইলে মেয়ে তো কম দেখিনি কিন্তু তোমাকে পাওয়ার জন্য পাগল হলাম কেন।
আমার চোখের পানি তুমি মুছিয়ে দিয়েছ, সারাজীবন তোমার এই আদর থেকে যেন বঞ্চিত না হই।
কী যে বলো তুমি!
অনেকক্ষণের জন্য আমাদের মুখে চাঁদের আলো নিভে গেল, বদলে সেখান থেকে সারাদেহে মধুর উত্তাপ শিশির করে সঞ্চারিত হতে থাকে।
এরপর বিছানার দিকে নিয়ে আসতে চাইলে ছবি মিনতি করে বলল, থাক না লক্ষ্মীটি। এখানেই ভালো লাগছে।
বললাম, সারারাত এখানে দাঁড়িয়ে কাটাবে?
সারারাত কোথায় মাত্র দশটা বাজলো, একটু থেমে ছবি বলল, তা নাই বা হলো, একটি রাত কাটাতে পারব না?
সারারাত জেগেই তো কাটাবে। কিন্তু তাই বলে এখানে দাঁড়িয়ে নয়।
কোলপাঁজা করে তুললে ছবি দুহাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো।
এতদিন এসব দুষ্টুমিই বুঝি শিখেছ?
হ্যাঁ শিখেছি এবং তা তোমারই জন্য।
একি তোমার চোখ লাল হয়ে গেছে দেখি, রাখো লক্ষ্মীটি! একটুখানি! ছবি উঠে দাঁড়িয়ে সুইচটার দিকে এগিয়ে গেল।
আমি বললাম, আলো থাক না!
ছবি ওখান থেকেই প্রায় তেড়ে উঠে বলল, না, না!
সুইচটা অফ করে দিয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল ছবি। ভেবেছিল বোধ হয়, বাতি নিভিয়ে দিলে ঘরটা একেবারে অন্ধকার হয়ে যাবে। কিন্তু তা হলো না। বাইরে জোছনা ও জানালা খোলা থাকার দরুন আলোর আভাসটুকু আছে। ঘরটা সম্পূর্ণ মসীবর্ণ হয়ে গেলে হয়তো সে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে লুকোচুরি খেলার চেষ্টা করত। কিন্তু দেয়ালের কাছে ওর আবছা মূর্তিটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
দাঁড়িয়ে রইলে কেন। আমি কোমল স্বরে ডাকলাম, এসো।
ছবি কোনো কথা বললো না। কেবল ওর হাতের চুড়ির অস্পষ্ট রিনিঠিনি বোল শোনা গেল।
আমার ওঠা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সেও যে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সামনা-সামনি এগুতে থাকলে একদিকে সরে গেল। বুঝলাম ওর মনে দুষ্টুমি বুদ্ধি। আমিই বা কম কিসে? চোখের পলকে ধরে ফেললাম। আর এখন যখন স্পষ্ট আলো নেই তখন সংকোচকে বিদায় দিতেও বাধা নেই।
প্রথম বাসর, ওর বাধাকে জয় করাই তো আজকে আমার কাজ।
চাঁদটা আরো একটু সরে গেছে আকাশের কোলে- গাছের পাতাগুলো লুকোচুরি খেলছে জোছনার সঙ্গে। ধীরে ধীরে একখণ্ড বেগুনিমেঘ এসে চাঁদকে গ্রাস করে ফেলে, চাঁদ ডুবে গেলে ঘরের ভেতরটাও আরো একটু অন্ধকার হয়ে এলো!
কিন্তু আমি তো অন্ধকার চাই না। আমি চাই আলো, আরো আলো। স্পষ্ট দিবালোকের মতো উজ্জ্বল। যে আলোতে আমার এতকালের স্বপ্নের স্বর্গ মোহন-মহিমায়। উন্মোচিত হবে। বিদ্যুতের শিখা অন্তত একবার সেই স্বর্গের শিখর বেদী অলিন্দ ফোয়ারা পুষ্পবন আমার দু’নয়নে মুদ্রিত করে দিয়ে যাক্, এরপরে তাকে ছায়ার স্বপ্ন দিয়েই রচনা করব। পাব তাকে ষড়ঋতুর বিচিত্র লীলায়, আলো আঁধারিতে প্রতিদিন প্রতিরাত।
আমি উঠে যেতে চাইলে ছবি তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠল, না, না।
কি?
তুমি কিছুতেই আলো জ্বালাতে পারবে না।
ওর কণ্ঠস্বরের তীব্রতা বিস্মিত হওয়ার মতো। কিন্তু এখন কিছু হওয়ারই সময় নয়! ফেনিল ঢেউ আছড়ে পড়া সমুদ্রে দাঁড়িয়ে বাজে ভাবনার অবসর কোথায়?
ছবি নেতিয়ে পড়েছিল। সে শ্রান্ত, পরিপুত। হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসল। বলল, শোনো!
আমিও চুপচাপ শুয়েছিলাম! বললাম, কি?
শিশুর কান্না না?
ওপরতলা থেকে সেই শব্দ শোনা গেল বটে, কিন্তু আমি বললাম, কাঁদছে তাতে কি? শিশু তো কাঁদবেই! শুয়ে থাকো।
কিন্তু ছবি খাট থেকে নেমে নিচে দাঁড়িয়ে গোছগাছ করতে থাকে। মৃদু রিনরিন করে বাজে ওর হাতের চুড়ি। এরপর ডাকল, এই শুনছ? আমি একটু বাইরে যাই?
বাইরে কেন? শুয়ে থাক না? অনেক রাত হয়েছে।
কোথায় অনেক রাত? বালিশের কাছে হাতঘড়িটা তুলে নিয়ে রেডিয়াম কাঁটা দেখবার পর বলল, মাত্র সাড়ে এগারটা।
মেঘের পাহাড় সরে গিয়েছিল হয়তো, জানালাটা আবার আলোকিত হয়েছে। ছবি একটা শিক ধরে দাঁড়াল। পিঠে খোলা চুলের ঝাকড়া।
শিশুর কান্না থেমে গেল বলেই কিনা জানি না, ছবি আর বারান্দায় যেতে পীড়াপীড়ি করল না। সে দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে চেয়ে, প্রবল জোছনা-ধারায় হালকা শাদা মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছে। ও চুপচাপ, জীবনের নতুর স্বাদই কি ওকে মূক করে দিয়েছে?
কিন্তু আমি ভাবছিলাম, শিশুর প্রতি ছবির এত টান কেন। মেয়েরা ছোটদের ভালোবাসে, তবু ওর ব্যবহারের মধ্যে একটুখানি আতিশয্য আছে নাকি? এবং সেটা শুধু নোট-শিউলি নয়, তাদের ছাড়িয়ে বাইরের দিকেও উনুখ। হয় এটা এক ধরনের খ্যাপামি; নয় অস্বাভাবিক। যাই হোক ওর কোলে একটা শিশু আসুক, এই মুহূর্তে এই আমার আন্তরিক কামনা। কিন্তু তা তো রাতারাতি সম্ভব নয়। আট দশটি মাস তো অন্তত দরকার। যেরকম ভাবসাব, এতদিন থাকবে কি করে? বৌদির ছেলেমেয়েদের কথা দু’একদিন পরে নিশ্চয়ই বলবে ও।
