ছবি নিচু মুখটা তুলে আস্তে করে বলল, হ্যাঁ।
কিছু বললে না তুমি? কিছু শোনবার জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে থাকি।
কি আর বলব! ছবি তেমনি নিচু স্নিগ্ধস্বরে বলল, বিয়ে না হলেই নয়?
আমি আকুল হয়ে উঠি। বললাম, নতুন করে একথা কেন বলছ তুমি, লক্ষ্মী! কিছুই তো তোমার অজানা নেই!
তা নেই। কিন্তু আমার বড় ভয় হয়, যদি ভুল বুঝ কোনদিন, আমাকে ভালোবাসতে না পার-তাহলে আমি বাঁচাবো না যে!
ভবিতব্য সম্পর্কে কিছু বলা যায় না, তোমাকে আঘাত দেওয়া যে হবে আমার নিজেকেই আঘাত করা!
ওর হাত ধরে কাছে আকর্ষণ করছিলাম, ছবি মধুর শাসনের ভঙ্গিতে চাইল, বলল, হেই! কি কথা হয়েছিল মনে নেই?
আছে। আমি গভীরভাবে বললাম, তবে আর কাঁহাতক–!
আওতার দরজার কাছে মেয়েলি স্বর শুনতে পেয়ে ছবি বলল, এই ছাড় পান্না আসছে!
আচ্ছা বিপদ, সিগারেট ধরাবার জন্য আমি উনুনের কাছে গিয়ে বসলাম। ছবি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল।
যা ছেলে বাবা! বাপটা মনে হয় চাষা! কিছুতেই বাগ মানে না!
যা বলেছিস অন্যের কোলে থাকতে চায় না! তবু তো তোর কাছে অনেকক্ষণ রইল। ইস্ কি বিশ্রী বৃষ্টি!
দাঁড়িয়ে রইলে কেন? চলো বসি গে।
এবারে গিয়ে আত্মপ্রকাশ করা যেতে পারে। সিগারেট ধরিয়ে বেরিয়ে এলাম! ওরা স্টুডিও ঘরে বসেছিল, এমনভাবে গিয়ে উঠলাম যেন এইমাত্র এসেছি।
এই যে ছবি, দাদা কোথায়?
ওরা তো বাইরে গেছেন। পান্না ঘোমটা টেনে দাঁড়াতেই ছবি বলল, একি! এত লজ্জা পাচ্ছিস কেন? শিল্পী জাহেদ! আর এ হচ্ছে আমার বন্ধু পান্না।
ও আচ্ছা আদাব!
পান্নাও বলল, আদাব।
তাহলে আর কি করব, চলে যাই? ছবির দিকে চেয়েই বলে উঠলাম, বাঃ! চমৎকার তো!
ও খানিকটা অপ্রস্তুতের মতো উচ্চারণ করল, কী?
শিশুকোলে ওর বসার মধ্যে কুমারীমাতা ও ছেলের অপূর্ব ভঙ্গি ফুটে উঠেছিল। আমি ওর কথার সরাসরি জবাব দিলাম না। ব্যস্তভাবে কাগজ, তুলি টেনে নিয়ে বললাম, এভাবেই একটু প্লিজ!
পান্নার দিকে অর্থপূর্ণ সহাস্য মুখে একবার চেয়ে ছবি স্থির হয়ে বসে। ব্রাশ লাইনে ওয়াটারকালার করছি। যদি ভালো হয়ে যায় পরে তেলরঙে নেওয়া কঠিন হবে না। মডেলের প্রাণের রামধনু আমার মনের আকাশে সপ্তরঙের সমারোহ সৃষ্টি করেছে, কাজেই প্রতিটা রেখা একেবারে আমার আত্মার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে সূক্ষ্ম রাগিণীর মতো। ক্রমে আমি আত্মহারা হয়ে পড়েছি।
কিন্তু সব পণ্ড হয়ে গেল। ছেলেটা হঠাৎ এমন কান্না জুড়ে দিল, ওর মায়ের সক্রিয় হওয়া ছাড়া উপায় রইলো না।
যাঃ। কাজটা করতে পারলাম না।
একেবারে দস্যি ছেলে। পান্না ওকে দোলাতে দোলাতে বাইরে নিয়ে গেল।
ছবি তেমনিভাবে বসেছিল। সে যেন অতলান্ত ভাবনার গভীরে ডুবে গেছে। ওর তন্ময় চোখে কিসের স্বপ্ন?
আরও একদিন আমার মনে এই প্রশ্ন জাগল। ফালগুনে যেতে হয়নি, বহু পীড়াপীড়ির ফলে শরতেই তাকে পেয়েছি, গভীর নীল আকাশের মতোই কানায় কানায় ভরে আছে আমার মন। বিস্ময়ের পর বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে যাই, একি সত্যি?
ছবি আমার সহধর্মিণী? জীবন সঙ্গিনী শাদা কথায়, বৌ? ভাবতে অবাক লাগে। ছোটবেলা থেকেই একটা কঠিন সংকল্প ছিল বড় হবো। বিয়েশাদি ব্যাপারটার কথা কখনো চিন্তা করিনি। এমনকি বড় হয়েও ওসব পথের ত্রিসীমানাও মাড়াইনি। অথচ আশ্চর্য আমি প্রেমে পড়লাম এবং যাকে ভালোবেসেছি তাকে বিয়েও করলাম। এযে অবিশ্বাস্য, অলৌকিক।
বৌদিকে বেশ উদার মনে করেছিলাম, আসলে তা নয়। বিয়েরপর পোয়রা দিন ছবিকে নিজের কাছেই রেখে দিলেন।
কিন্তু বাসাটা সম্পূর্ণ গুছানো হয়ে গেলে প্রায় জোর করেই ওকে নিয়ে এলাম। বৌদি বললেন, দেখ ভাই এত উৎসাহ ভালো নয়।
বললাম, বৌদি, আপনিও ভুলে যাবেন না, পাকা লোকেরাই পাকামি করে বেশি।
বাসাটা ছোটো। তবু আমাদের দুজনের পক্ষে খুব ভালো। দুতালা বাড়ির নিচের দুটো কামরা। লাইট কল আছে। উপরন্তু দেয়ালের বাইরে একটা বড় পুকুর, তার পাড় ঘেঁষে নারকেল গাছের সারি, আকাশের অনেকখানি-এগুলো নিঃসন্দেহে বাড়তি পাওনা। ওপর তলা সস্ত্রীক একজন অধ্যাপক থাকেন।
একটি কামরায় আমার স্টুডিও ও বৈঠকখানা, অন্য কামরাটি শোবার। বাসাটা ছবি খুব পছন্দ করল, আমি বিশেষ খুশি হলাম সেজন্য।
অপূর্ব রাত আজ। রূপকথারই মতো। গভীর আকাশের হালকা শাদামেঘে পূর্ণিমার চাঁদ রুপোর কাঠির মায়া বুলিয়ে নিচের বসুন্ধরাকে করেছে সুন্দরী। নারকেল গাছের পাতাগুলো নড়ছে মৃদুমন্দ হাওয়ায়। পুকুরের জলে আলোর ঝিলিমিলি। আমাদের ঘরে ফুলদানিতে মরশুমি ফুল, মিষ্টি গন্ধ নাকে এসে লাগছে। অনেক বিদ্রি আকাক্ষার রাত পেরিয়ে আজকে এলো জীবনের পরম লগ্ন।
জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে চেয়ে আছে ছবি, কী দেখছে সে? কী দেখছে? কোমল কোরকের মধ্যে পদ্মের মতো ওর নিটোল দেহখানি নিবিড় সৌরভে ঘেরা। সামান্য আভরণ, তাই বেনারসী শাড়ির আড়ালে ঝিমি করছে।
আমিও বসে আমি বিছানার ধারে, একটা সিগারেট ফুঁকছি। পরিপূর্ণ অনুভূতির নিঃশব্দ গভীরতা এসে আমাকে পরতে পরতে ঘিরে ফেলেছে। এমনো যে হয় ত জানি না। শরীরের আক্ষেপের বদলে স্থৈর্য। চাঞ্চল্যের বদলে স্তব্ধতা।
সিগারেটের শেষাংশটুকু ছুঁড়ে ফেলে দিই জানালা দিয়ে। আস্তে আস্তে কাছে গেলাম ওর। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস্ করে ডাকি, ছবি!
