সালোয়ার কামিজ ওড়না তো পরেই না। নাইলনের ব্লাউজ পরা যায় না। ভ্যানিটি ব্যাগেরও ওর দরকার নেই! তুমি এগুলো বরং তোমার আপাকে দিয়ে দিও!
আপার জন্য তো এনেছি। মিন্টু কিছুমাত্র বিচলিত না হয়েই বলল, সালোয়ার কামিজে কিন্তু ছবিকে বেশ মানাবে! মডার্ন গার্ল ভ্যানিটি ব্যাগ ব্যবহার করবে না কেন!
বৌদি একটু উষ্ণ হয়ে বললেন, সবাই করে না মিন্টু, সবাই ব্যবহার করে না বুঝলে, তাছাড়া তোমার জিনিস নেবেই বা কেন সে? এসব ভাবনা ছেড়ে লেখাপড়ায় মন দাওগে যাও!
আমার মনটা শান্ত হয়ে এসেছিল। মিন্টু বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকলে তার দিকে হাত বাড়িয়ে আমি বললাম, দেখি কি রকম জিনিস!
আমাকে চেনেনা, দেখেওনি কোনদিন, অনিচ্ছার সঙ্গে দিল প্যাকেটগুলো। সেই মুহূর্তে আমি ভাবি, একে অযথা গুরুত্ব দিয়ে লাভ নেই; বরং সহজভাবে গ্রহণ করলেই সব ল্যাঠা চুকে যাবে। আর ছোটবেলার বন্ধুত্বের দাবিতে বয়োসন্ধিকালে যদি কিছু বাচালতাও করে সেটা খুব বড় অপরাধ তো নয়? এক্ষেত্রে তার বেশি কিছু নেই বলেই আমার পর্যবেক্ষণ। তাই, ব্যাপারটাকে জটিলতামুক্ত করবার জন্য জিনিসগুলো খুলে ধরে আনন্দিত-স্বরে আমি বলে উঠি, দেখুন বৌদি! সত্যই সুন্দর জিনিস! ছবিকে বেশ মানাবে।
আমার ব্যবহারে বৌদি একটু আশ্চর্য হলেন। মিন্টু সহানুভূতি পেয়ে বলল, দেখুন না, আমি কি মিথ্যে বলেছিলাম?
না, না কিছুতেই না। আমি উচ্চকণ্ঠে ডাক দিই, ছবি! ছবি! দেখে যাও, কি সুন্দর জিনিস এনেছে তোমার জন্য!
মিন্টুর মুখটা নিরীহ সরল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সে বলল, ছবি আছে নাকি?
আছে, ঘুমিয়ে পড়েছে বোধ হয়! আমি উঠে গিয়ে দেখি ছবি সত্যি নোটনকে কোলের কাছে রেখে চৌকির ধারে শুয়ে চোখ বুজে আছে। ওর হাত ধরে টেনে তুলে নিয়ে এলাম। টেবিলটা দেখিয়ে বললাম, তোমার জন্য কি সুন্দর জিনিস এনেছে মিন্টু, দ্যাখ।
ঘুমের ভান করে পড়ে ছিল, আসলে ও সব কথা শুনেছে। তার চেহারা থেকে সম্পূর্ণ কেটে গেছে ক্লিষ্টতার মেঘ। আমার চোখে চেয়ে হাল একটুখানি, এরপর সেগুলো হাতে নিয়ে দেখতে থাকে। বৌদির মুখেও হাসি ফুটেছে। মিন্টুর দিকে চেয়ে বলল, কিছু মনে করোনা, ভাই। এদ্দিন পরে এসেছ, তোমাকে একটু যাচাই করে নিলাম।
মিন্টু দাঁত বের করে বোকার মতো নিঃশব্দে হাসতে থাকে। বাড়ির বারান্দা থেকে দেখতে পাওয়া টুকরো নীল আকাশজুড়ে এখন অনেক পাখির মেলা।
০৬. আকাশে পাখির মেলা
আকাশে পাখির মেলা, কিন্তু বর্ষাকাল মাত্র। বর্ষার পরে শরৎ, শরতের পরে হেমন্ত এবং তারও পরে বসন্ত। সে অনেক দিন প্রায় তিন যুগেরই সমান। হাতজোড় করে বললাম, একটু দয়া করুন, বৌদি। এত দেরি কেন। আগে হলে তো কোনো ক্ষতি নেই!
ক্ষতি নেই! শিল্পীর বিয়ে ফালগুন মাসেই হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি!
কিন্তু বৌদি, এ যুগের শিল্পী তো সে-যুগের সভাসদ নয়, সে মূলত ট্র্যাজেডিরই কবি। তাই বর্ষাকালটাই তার বিবাহের উপযুক্ত সময় নয় কি?
যাই বল, বর্ষাকালটা বিরহেরই কাল! বৌদি হেসে বলল, পূর্বরাগটা একটু বেশি সময়ই চলুক না! এর মধ্যে সব গুছিয়ে নাও।
হাল্কাভাবে বললেও কথাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গতিহীন পাত্রের হাতে অভিভাবক মেয়ে তুলে দেবেন না, এ স্বাভাবিক এবং এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। গুছিয়ে নেবার চেষ্টায় আছি বৈ কি। কপাল ভালো, ব্যবস্থা হয়েও গেছে একটা। স্কুলের একজন। টিচার বৃত্তি নিয়ে জাপান যাচ্ছেন দু’বছরের জন্য, তার জায়গায় কাজ করব আমি। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথাবার্তা হয়ে গেছে। কাজটা অবশ্য অস্থায়ী, কিন্তু দু’বৎসর সময় তো নেহাৎ কম নয়? এর মধ্যে সুবিধে একটা হবে। এমনকি, স্কুলেও লেকচারারের পদ পেয়ে যেতে পারি। সিলেবাসের বিস্তৃতির সম্ভাবনা এবং সে-জন্য নতুন লোকের দরকার।
কিন্তু যার কারণে এত সাধনা, তার থেকে যে ক্রমেই দূরে সরে পড়ছি। দেখা হয়, তবু ব্যবধানটুকু বজায় থাকে। বৌদি কথা দিয়েছেন, দাদা মৌন, এখন ওর অভিমতটা জানতে পারলে মন্দ লাগত না।
সেদিন সুযোগ মিলল। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল, বাসার কাছে যেতেই ঝমঝম্ বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। দৌড়ে গিয়ে উঠলাম বারান্দায়। বিকেল বেলা, অথচ ছোটদের সাড়াশব্দ নেই। বড় ঘরটা ফাঁকা। ওরা বাইরে বেরিয়েছেন নিশ্চয়ই! কিন্তু বাসা খালি রেখে তো যেতে পারেন না?
স্টুডিও ঘরটাও শূন্য। জামিল ভাই একটা কাজে হাত দিয়েছেন, ক্যানভাস ইজেলে সাঁটানো।
হঠাৎ শিশুর কান্না শুনতে পেয়ে রান্নাঘরের দিকে যাই। একধারে পেছন ফিরে পিড়িতে বসে আছে ছবি। তার কোলে, মনে হলো, একটি ছোট্ট ছেলে। ছোট্ট পা দুটো ছুঁড়ে ঊআঁ আঁ করছে।
পাশ ফিরে আমাকে দেখতেই ছবি লজ্জায় আরক্তিম হয়ে গেল। বলল, একি! তুমি!
হ্যাঁ, আমি। বাচ্চাদের দিকে তোমার বড় টান দেখছি।
পান্নার ছেলে! এতটুকুন, কিন্তু ভারি দুষ্টু! ছবি বলল, আচ্ছা, তুমি এলে কি করে? গেট বন্ধ ছিল না?
কই না তো?
কত যে ভুল হচ্ছে আমার! বৌদিরা বাইরে গেছেন! ছবি একটু ইতস্তত করে বলল, তুমি এখন চলে যাও না?
আমি ওর কাছে গিয়ে বললাম, কেন? কেন একথা বলছ?
তুমি আর আমি এ-বাড়িতে একলা, লোকে কি ভাববে! তাছাড়া আমার বড় ভয় করে।
ভয়! ভয় কিসের? কাঁধের ওপর শুইয়ে বাঁহাতে ও ছেলেটাকে ধরে রেখেছে, শরীরে একটু দোলা জাগিয়ে ডানহাতে মাঝে মাঝে ওর পিঠে চাপড় মারছে, আমি সেই হাতটা এনে নিয়ে আলতোভাবে ধরে আদর করতে থাকি। আপনা থেকেই আমার কণ্ঠস্বর গাঢ় হয়ে এলো। বললাম, শুনেছ তো?
